ঈদুল আজহার আগের রাতেও রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী গাবতলী হাটে কোরবানির পশুর পর্যাপ্ত জোগান আছে। হাটের মূল অংশে জায়গা না থাকায় রাস্তায় দাঁড়িয়েও গরু বিক্রি করতে দেখা গেছে ব্যবসায়ীদের। তবে, হাটে নেই ক্রেতা। এমন পরিস্থিতিতে বেচাকেনায় ক্রেতারা সন্তুষ্ট থাকলেও মন খারাপ ব্যবসায়ী এবং গরু লালন-পালনকারী কৃষকদের। বাড়তি লাভের আশায় যারা আগে গরু বিক্রি করেননি এখন তারা বেকায়দায় পড়েছেন।
ঈদের আগের দিন বুধবার (২৭ মে) রাত ১১টার পর ব্যবসায়ী এবং কৃষকদের মধ্যে হতাশা ফুটে উঠে। অনেককে বলতে শোনা যায়, আর গরু নিয়ে গাবতলী হাটে আসবো না।
এদিন সন্ধ্যায় ব্যবসায়ীদের মন চাঙ্গা দেখালেও রাত যত বাড়তে থাকে ব্যবসয়ীদের হতাশাও তত বেশি ঘিরে ধরে। তুবও কম দামে অনেকেই গরু বিক্রি করতে চাইছেন না। অপেক্ষা করতে চান কাল সকাল পর্যন্ত। তবে, অনেকেই কম দামে গরু বিক্রি করছেন। যারা আগে বেশি দামে গরু বিক্রি করেছেন তারা কম দামে বাকি গরুগুলো বিক্রি করে হাট ছাড়তে চাইছেন।
যারা বেশি দামের আশায় আগে গরু বিক্রি করেননি তাদের অনেককেই দেখা গেছে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে। আবার কেউ ক্রেতা দেখলেই কম দামে দেওয়া হবে বলে অনুরোধ করছেন। এই চিত্র দেখা গেছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছোট গরু বিক্রি করা ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইরের পূর্ব ভাকুম গ্রাম থেকে আসা শেখ আরশাদ আলী বলেন, “রোজার এক মাস আগে দুই লাখ টাকায় গরু কিনেছিলাম। কসাইয়ের হিসেবে এখন গরুটির দাম হবে দেড় লাখ টাকা। তবে, দাম বলছে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। বাজার ভালো থাকলে এক লাখ ৬০ হাজার টাকায় গরুটি বিক্রি করতে পারতাম। চার মাস ফাও খেটেছি। আমার চার মাসের বেতন, গরুর পেছনে খরচ সব ফাও। বাজার পড়ে গেছে, গরু বিক্রি করবো না। রাতটা অপেক্ষা করে দেখি।”
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর গরু পালনকারী কৃষক মানুন বলেন, “দুই-চার হাজার লাভ পেলেই গরু বেচে দেবো। বেশি লাভের আশায় সোমবার থেকে গরু বিক্রি করার চেষ্টা করেছি, পারিনি। এখন দাম বলছে এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা। দুদিন আগে এই গরুর দাম উঠেছিলো দুই লাখ পাঁচ হাজার টাকা। বিক্রি না করে ভুল করেছি। এখন বাড়ি নিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। বাজার আর একটু ভালো হলে এক লাখ ৯০ হাজার টাকায় বেচতে পারতাম। রাতের মধ্যে বিক্রি না হলে বাড়ি নিয়ে যেতে হবে।”
নিজের আরেকটি গরু দেখিয়ে মামুন বলেন, “দেড় লাখ টাকা দিয়ে কিনেছিলাম ছয় মাস আগে।” আরেকটি গরু দেখিয়ে তিনি বলেন, “এটি কিনেছিলাম এক লাখ ৪০ হাজার টাকা দিয়ে। এখন যে দাম উঠছে তাতে একেকটি গরুতে ৫০ হাজার করে কমে বিক্রি করতে হবে। অথচ, সঠিক দাম পেলে ৫০ হাজার টাকা লাভ করতে পারতাম।”
মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের বাবুল ইসলাম বলেন, “মঙ্গলবার গরু নিয়ে এসেছি। একটা কিনেছিলাম ৪৫ হাজার, আরেকটি ৭০ হাজার টাকায়। ৪৫ হাজার টাকায় কেনাটি বিক্রি করেছি ৬৫ হাজারে। ৬০ হাজার টাকায় কেনা গরুটি বিক্রি করতে পারিনি। এখন দাম উঠছে ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকায়। বাজার ঠিক থাকলে দাম হতো ৯০ হাজার টাকা। আগে বিক্রি না করে ভুল করেছি। এখন যেভাবেই হোক গরুটি বিক্রি করে বাড়ি চলে যাবো।”
গরু ফেরত নিলে এর পেছনে খরচ কত হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সেডের ভাড়া তিন হাজার। একটি গরু আনতে খরচ হয়েছে দেড় হাজার। আর আমার খরচ হয়েছে।”
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর যাদবপুর গ্রামের খলিল শেখ গরু এনেছিলেন ১৫টি। তিনি বলেন, “৯টি গরু ভালো দামে বিক্রি হয়েছে। আর পাঁচটি বিক্রি হয়েছে দুই লাখ ৩০ হাজার লোকসানে। আর একটি গরু আছে। বিক্রি না হলে ফেরত নিয়ে চলে যাবো। যা সর্বনাশ তা তো হয়েছে। আর গাবতলীতে গরু নিয়ে আসবো না।”
কুষ্টিয়ার মিরপুরের মজনু শেখ বড় গরুটি বিক্রি করতে পারেনি। এক লাখ ৯০ হাজার টাকায় দাম উঠলেও তিনি আর বেশি লাভের জন্য ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু, রাতে দাম উঠছে এক লাখ ২৫ হাজার। তিনি বলেন, “চার জন মিলে ১৯টি গরু এনেছিলাম। আর ছয়টা গরু আছে। দাম কম বলায় বিক্রি করতে পারছি না। ৭৫ হাজার টাকা খুঁটির ভাড়া গাড়ি ভাড়া ৩০ হাজার। আগেরগুলো বেচেছি সীমিত লাভে। এখন এই ছয়টি গরুর দাম যা উঠছে তা মিলিয়ে দেখছি লসের খাতায় আছি।”