শিরোনাম

প্রকাশিত : ২১ ডিসেম্বর, ২০২১, ০৩:৫৯ রাত
আপডেট : ২১ ডিসেম্বর, ২০২১, ০৩:৫৯ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

জান্নাতুন নাঈম প্রীতি: ‘গোল্লায় যাওয়া প্রজন্ম’!

জান্নাতুন নাঈম প্রীতি: মানুষজন তীর্থস্থানে উপাসনা করতে গিয়ে যেরকম আবেগে থাকে, আমার বইপড়ার স্মৃতি বিজড়িত ভিক্টর হুগোর ‘দ্য হাঞ্চব্যাক অফ নটরডেম’ উপন্যাসের কুঁজো লোকটার কথা পড়ার বহু পরে নটরডেম গির্জা দেখে তেমন আবেগায়িত হয়েছিলাম। সেটা পেরিয়ে আরও আবেগে ছিলাম ‘শেক্সপীয়ার অ্যান্ড কোম্পানি’তে গিয়ে। একশো বছর ধরে তারা কেবল বই-ই বিক্রি করছে। এর মধ্যে বিশ্বযুদ্ধ হয়েছে, মালিকানা বদলেছে, কিন্তু তাদের বই বিক্রি থামেনি। এমনকি একদিন রাতের বেলায় এই দোকানের সামনে গিয়ে দেখি লাইন দিয়ে লোকে বই কিনছে। একশো বছর ধরে বই বিক্রির রেকর্ড কি বাংলাদেশের কোথাও আছে? আমার প্রিয় লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তখন একদম নাদান। তিনি লেখালিখি করেন না, বই কেনার টাকা নেই। কিন্তু শেক্সপিয়ার অ্যান্ড কোম্পানি নামের বইয়ের দোকানে গিয়ে আড্ডা দেন আজকের দিনের বড় বড় লেখকদের সঙ্গে। তলস্তয়, তুর্গেনেভদের লেখা পড়ে তাঁরা স্বপ্ন দেখেন নতুন কিছু লিখবেন। একদিন গারট্রুড স্টাইন তাদের বললেন, ণড়ঁ ধষষ ধৎব ধ ষড়ংঃ মবহবৎধঃরড়হ. মানে হচ্ছে, তোমরা সবাই একটা গোল্লায় যাওয়া প্রজন্ম।

এই বাণী দেওয়ার দুই যুগের মধ্যে দেখা গেলো, তিনি যাদের গোল্লায় যাওয়া প্রজন্ম বললেন, তাঁরা সবাই একেকজন নোবেল বিজয়ী বড় লেখক, হেমিংওয়ে তো নোবেল আর পুলিৎজার দুটোই পেয়েছেন। গোল্লায় যাওয়া সেই প্রজন্মের মধ্যে আছেন স্কট ফিটজেরাল্ড, এজরা পাউন্ড, স্যামুয়েল বেকেট, জেমস জয়েসসহ বিশ্বসাহিত্যের মাঠ কাঁপানো লেখকেরা। যখন তাঁরা শেক্সপিয়ার অ্যান্ড কোম্পানিতে গিয়ে আড্ডা দিতেন, তখন এজরা ছাড়া কেউই লেখক হননি। হেমিংওয়ে কেবল লুকিয়ে লুকিয়ে ‘আ মুভেবল ফিস্ট’ লেখা শুরু করেছেন।

জেমস জয়েস শতাব্দীর সেরা ক্লাসিকগুলোর একটা ‘ইউলিসিস’ লেখার পর প্রকাশক খুঁজছেন। কেউ এই বিশাল সাইজের বই ছাপতে রাজি হচ্ছে না- এমনই তথৈবচ টাইপের অবস্থা! অবশ্য আমাদের দেশেও, এই প্রজন্মকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না বলার লোকের সংখ্যা কম না। তাঁরা কিছু একটা ঘটলেই হবে না, হচ্ছে না বলা শুরু করে দেন। এই ব্যক্তিরা ভাবেন সমস্ত ট্যালেন্ট ছিলো তাদের জেনারেশানে। আমরা হচ্ছি তাদের ভাষায় ‘গোল্লায় যাওয়া প্রজন্ম!’
আমি নিশ্চিত বাংলাদেশ থেকে কেউ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেও বাংলা একাডেমির ধামাধরা এক গ্রুপ বলবেÑ অমুক আবার লিখতে পারে নাকি? শেক্সপীয়ার অ্যান্ড কোম্পানির আরেকটা দারুণ ব্যাপার হলো, তারা নিজেরা সাহিত্য পুরস্কার দেয় এবং এখনো মানুষকে বই পড়তে দেয়। প্রায় হীরার খনি আবিষ্কারের আনন্দ পেলাম যখন সারি সারি বইয়ের তাকের একপাশে দেখি বীট জেনারেশনের লেখকদের বই। যারা বীট জেনারেশনের ব্যাপারে কিছুই জানেন না তাদের বলি- প্রচলিত সমাজের নিয়মনীতি তীব্রভাবে অস্বীকার করাই ছিলো বীট জেনারেশনের কাজ, যেখান থেকে পরবর্তী সময়ে অনুপ্রেরণা পেয়ে কলকাতায় গড়ে উঠেছিলো ‘হাংরি আন্দোলন’। খুঁজে বের করলাম আমাদের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বন্ধু মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘সেপ্টেম্বর ইন যশোর রোড’ লেখা কিংবদন্তি এলেন গিন্সবার্গ, জ্যাক কেরুয়াক, গ্রেগরি কার্সোর বই। প্যারিসের সবচেয়ে দারুণ বিষয় হলো এর লাইব্রেরি আর বইয়ের হাজার হাজার দোকান, সেইন নদীর ধারে নতুন পুরাতন বইয়ের যে সারিবদ্ধ দোকান সেগুলোকে আমি আদর করে ডাকি ‘প্যারিসের নীলক্ষেত’ আর প্যারিসিয়ানরা ডাকে- বুকিনিস্ট নামে।
আমি যেহেতু আর্টিস্ট আর লেখক হিসেবে স্কলারশিপের সঙ্গে বিশেষ কিছু সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে এসেছি সেজন্য নির্দিষ্ট বইয়ের দোকান, আর্টস্টোর আর কফিশপেও বিশেষ ডিসকাউন্ট পাই। গর্বিত হই না, কেবল আনন্দিত হই এই ভেবে যখন দেশে থাকতে আমাকে জিজ্ঞেস করা হতো, আপনি কি করেন? আমি উত্তরে বলতাম, আমি একজন লেখক ও শিল্পী। লোকজন জিজ্ঞেস করতো, আর কী করেন? আমি বুঝাতেই পারতাম না, লেখক আর শিল্পী হিসেবে জীবন কাটানো যায়।

প্যারিস জান্নাতুন নাঈম প্রীতি নামের একজন অভাজন লেখক ও শিল্পীকে প্রায় সমস্ত মিউজিয়াম দেখা ফ্রি করে দিয়ে, আর্টস্টোর, বুকস্টোর আর কফিশপে নানান আকারের ডিসকাউন্ট দিয়ে যে সম্মান দিয়েছে তা কি কখনো ভুলতে পারবো? কখনো ভুলতে পারবো পথের ধারে পিয়ানো আর বেহালা বাজানো সেই ভিখিরিদের, যাদের কারণে প্যারিস আমার কাছে সবসময়ই হয়ে উঠেছে শৈল্পিক যাতে চোখ ভিজে যায়, মনে হাহাকার নিয়ে ক্ষুধাকেও গদ্যময় লাগে আর জীবনানন্দের কবিতার মতো বলতে ইচ্ছা করেÑ কারা কবে কথা বলেছিলো/ভালোবেসে এসেছিলো কাছে/তারা নেই, তাদের প্রতীক হয়ে তবু, প্রাচীন কয়েকটি গাছ আছে...। ফেসবুক থেকে

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়