প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রংপুরে তিস্তার পানিতে ডুবে গেছে আবাদি জমি

আফরোজা সরকার : হামার আবাদি জমি পানিতে তলে গেইচে। এ্যলা তিস্তার পানিত ধান, আলু, শাকসবজি সোগ ডুবি আছে। হঠাৎ এদোন করি ভারত পানি ছাড়লে হামরা বাচমো ক্যামন করি? একে তো এবারের বানোত (বন্যা) হামার মেলা ক্ষয়ক্ষতি হইছে। তার ওপর এই অসময়ে ফির বান! নদীপাড়োত হামার সুখ শান্তি নাই।’

এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন কৃষক নাছিমুুদ্দী বকস। তিনি থাকেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার তিস্তা নদী তীরবর্তী লক্ষ্মীটারি ইউনিয়েনের কেল্লারহাট গ্রামে। উজানে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে অভিন্ন এই নদীর ভারতীয় অংশে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিস্তা ব্যারাজের ৬৫ কিলোমিটার উজানে ভারত গজলডোবা ব্যারেজের সব গেট খুলে দেওয়ায় ভাটি অঞ্চলখ্যাত বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে তিস্তা অববাহিকায় পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তিস্তাবেষ্টিত লালমনিরহাট ও নীলফামারী ছাড়াও রংপুরের গঙ্গাচড়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় দেখা দিয়েছে আকস্মিক বন্যা। পানি বেড়েছে কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার তিস্তা নদীসহ ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, ধরলাসহ ছোট নদনদীতে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিস্তার পানি দোয়ানি পয়েন্টে বিপৎসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা ব্যারাজের সড়কের ‌’ফ্লাট বাইপাস’ ভেঙে গেছে। ফলে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। অন্যদিকে পানিবৃদ্ধির কারণে ভারত থেকে গেট খুলে পানি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় ফ্লাট বাইপাস ভেঙে যাওয়ায় বড়খাতার বাইপাস সড়কের তালেব মোড় এলাকার সড়কটিতে পানি ছুঁইছুঁই করছে। এ ভাঙনের ফলে এরই মধ্যে ওই এলাকার ২০০টি ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। পানির তোড়ে ভেঙে গেছে নীলফামারীর ডিমলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের কালিগঞ্জ নামক স্থানের ৪০০ মিটার গ্রোয়েন বাঁধ। এতে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে ৪০০ পরিবারের ঘরবাড়ি।

এদিকে রংপুরের গঙ্গাচড়াতেও দেখা দিয়েছে নদী ভাঙন। আকস্মিক বন্যার পানির তোড়জোড়ে উপজেলার আলমবিদিতর, লক্ষ্মীটারি, কোলকোন্দ, নোহালী ও গজঘণ্টার নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে পড়েছে। অনেক পরিবার এখন পানিবন্দি হয়ে আছে। নদীর কোলঘেষা চরাঞ্চলসহ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় অনেকেই উঁচু জায়গাতে আশ্রয় নিতে চেষ্টা করছেন। লক্ষ্মীটারি ইউনিয়নের চরইশরকুল, ইছলি, পূর্ব ইছলি, পশ্চিম ইছলি ও শংকর, বাগেরহাট, কেল্লারহাটসহ বেশকিছু নিচু এলাকায় কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে আছে। পানিপ্রবাহ বেড়েছে শেখ হাসিনা তিস্তা সড়ক সেতুর মহিপুর পয়েন্টে।

লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের শংকরদহ গ্রামের কৃষক জয়নাল মিয়া বলেন ‌‌‘মহিপুর সেতুর কাছে চরোত একনা আগাম আলু আর মিষ্টি কুমড়া নাগাচু (চাষাবাদ করা)। শীতের সময় নয়া আলুর দাম বেশি পাওয়া যায়। কিন্তু কাল আইত থাকি হঠাৎ তিস্তাত পানি বাড়ছে। হু হু করি পানি ঢুকি আবাদসুবাদ সোগে তলে গেইচে। এ্যলা হামাক ঘরবাড়ি ছাড়ি উচা জাগাত যাওয়া নাগবে (লাগবে)। চেয়ারম্যান সাইব সকালে মাইকিং করি আশ্রয় কেন্দ্রোত যাবার কইছে। বাহে হামার গরীবের দুক্কো বারো মাস।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ্ আল হাদি আমাদের অর্থনীতিকে বলেন, কার্তিক মাসে নদীতে পানি থাকে না। অনেক জায়গায় চর জেগে উঠেছে। কৃষিনির্ভর নদী তীরবর্তী মানুষেরা চাষাবাদ শুরু করেছে। অনেকেই গেল বন্যার ধকল সামলে উঠতে আপ্রাণ চেষ্টায় ছিল। এরই মধ্যে হঠাৎ আবার বন্যা দেখা দিয়েছে। এখন অসময়ে তিস্তায় যে পানি বেড়েছে, তা ভারতের উজান থেকে আসা। মানুষের বাড়িঘর, আবাদি জমি, নিম্নাঞ্চল ডুবে গেছে। ভয়াবহ এ বন্যায় ইউনিয়নের কেল্লারপাড়, শংকরদহ, বাগেরহাটসহ বেশ কিছু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

তিস্তার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষজনকে নিরাপদস্থানে নিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, রাত থেকে পানি বাড়তে শুরু করেছে। ভোর থেকে নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষজনকে সতর্ক থেকে নিরাপদ স্থানসহ আশ্রয় কেন্দ্রে আসার আহ্বান জানিয়ে মাইকিং করেছি। বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবগত করেছি। এখন যে পরিস্থিতি, তাতে আর দু-একদিন এভাবে পানি বাড়তে থাকলে স্মরণকালের বন্যা হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, ভারি বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট পানির চাপ কমাতে সবগুলো জলকপাট খুলে দিয়েছে ভারত। এতে ভোর থেকে তিস্তার পানি বাড়তে শুরু করে। লালমনিরাহাটের হাতীবান্ধার দোয়ানী ব্যারেজ পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। সময়ের সাথে এটি আরো বাড়তে পারে।

বুধবার (২০ অক্টোবর) সকাল ৯টায় হাতীবান্ধার দোয়ানী ব্যারেজ পয়েন্টে তিস্তার পানি রেকর্ড করা হয় ৫৩.২০ সে.মি.। যা বিপৎসীমার ৬০ সেন্টিমিটার বেশি। অন্যদিকে, নীলফামারীতে ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৫০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে তিস্তার পানি।

পাউবোর ডালিয়া বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদ্দৌলা প্রিন্স বলেন, উজানে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তিস্তা পয়েন্টে এ মৌসুমের সর্বোচ্চ পানিপ্রবাহ। এ জন্য আমরা তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দিয়ে নদীর পানিপ্রবাহ অব্যাহত রেখেছি।

অন্যদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, দেশের উজানে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সিকিম, দার্জিলিং, জলপাইগুড়িতে ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে তিস্তা নদীর পানি সমতল বাংলাদেশে মঙ্গলবার (১৯ অক্টোবর) মধ্যরাত হতে বৃদ্ধি পাওয়া শুরু করেছে। বর্তমানে ডালিয়া পয়েন্টে ৫৩.২০ মি. লেভেল-এ, বিপদসীমার ৬০ সে.মি. উপর অবস্থান করছে। বিগত ১২ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি সমতল ডালিয়া পয়েন্টে প্রায় ২০০ সেমি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পানি বৃদ্ধি বুধবার (২০ অক্টোবর) সন্ধ্যা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। আরো ১০-১৫ সেমি. বৃদ্ধি পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। বৃহস্পতিবার (২১ অক্টোবর) ভোর নাগাদ এই পানি বিপদসীমার নিচে চলে আসতে পারে।

উল্লেখ্য, ভারতের উত্তরাখাণ্ড রাজ্যে ভারি বৃষ্টিপাত ও বন্যায় অন্তত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত পাঁচজন। নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। রাজ্যজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাড়িঘর, সেতু ও রাস্তাঘাট। ভূমিধসে রাস্তা আটকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে রাজ্যের নৈনিতাল, কালাঢুঙ্গি, হলদিবানি, ভবালিসহ আরো অনেক এলাকা। সৃষ্ট এ পানির চাপ কমাতেই ব্যারেজের গেইট খুলে দিয়েছে দেশটি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত