প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মীর শাহনেওয়াজ: বউয়াভাত বা লাতাভাজা

মীর শাহনেওয়াজ: মুন্সিগঞ্জ জেলার অনেক পছন্দের বিখ্যাত একটা খাবার হচ্ছে ‘বউয়াভাত’। মুন্সিগঞ্জে বউয়াভাতকে ‘ভাকা’ও বলে। খাবারটা ‘খুদের ভাত’, ‘বউখুদি’, ‘বউভাত’ নামেও পরিচিত। এই খাবারকে আবার অনেক এলাকায় ‘গরিবের পোলাও’ বলা হয়ে থাকে। নাম যাই হোক না কেন খেতে কিন্তু দারুণ স্বাদ! সুস্বাদু ও মজাদার এ খাবারটা খাঁটি ঘি সহযোগে বিভিন্ন প্রকার ঝাল জাতীয় ভর্তা, চচ্চড়ি, ডিম ভাজি, মাংস কিংবা মাংসের ঝোল দিয়ে খাওয়া হয়। ভর্তার মধ্যে সাধারণত থাকেÑ চিংড়ি ভর্তা, মরিচ ভর্তা, আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা, ডাল ভর্তা, কালিজিরা ভর্তা, পটল ভর্তা, বাদাম ভর্তা, ধনেপাতা ভর্তা ইত্যাদি। এই বউয়াভাত অনেকে ডাল ছাড়াই রান্না করেন। আবার অনেকে মুগ ডাল দেন, নারিকেল দেন; যার ফলে স্বাদ কিছুটা তো বেড়ে যায়ই। শীতের সকাল হোক কিংবা বাড়িতে নতুন অতিথির আগমন হোক, সকালের নাস্তায় গরম গরম ধোঁয়া ওঠা বউয়াভাত আর ভর্তা থাকবেই মুন্সিগঞ্জবাসীদের পাতে। এই একটি খাবারই মুন্সিগঞ্জের ধনী-গরিব সবার ঘরেই আনন্দ করে খাওয়া হয়। বিক্রমপুর তথা বর্তমানকালের মুন্সিগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী এই খাবারটার প্রচলন ছিল অনেককাল আগে থেকেই। পরবর্তী সময়ে পাশর্^বর্তী জেলাসমূহে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় খাবারটা ছড়িয়ে পড়ে। আর দূরবর্তী এলাকা বা জেলাসমূহে খাবারটা বৈবাহিক ও আত্মীয়তার সূত্রে ছড়িয়ে যায়।

প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখছি বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দীনেশ গুপ্ত (বিবাদী) নামে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী তিন অসম সাহসী স্বনামধন্য বাঙালি বিপ্লবীর জন্মস্থান ছিল কিন্তু এই মুন্সীগঞ্জ। স্বনামধন্য ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম মহিলা সভাপতি এবং উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের রাজ্যপাল সরোজিনী নাইডুর পৈতৃক বাড়িও ছিল এই মুন্সীগঞ্জ।
ঢাকা জেলার দোহার ও নবাবগঞ্জ ও ধামরাইবাসীরা বাহারি রকমের ভর্তা দিয়ে এ খাবার খেতে খুব পছন্দ করেন। বরিশাল জেলায় এটাকে বলা হয় ‘লাতাভাজা’, আবার গোপালগঞ্জ জেলায় এটাকে ‘খুদ ফোটানো’ বলে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাতে শুটকি ভর্তা দিয়ে জনপ্রিয় এ খাবারটা খাওয়া হয়। দূরবর্তী দিনাজপুর জেলাতেও এই খাবারটা বেশ জনপ্রিয়। টাঙ্গাইলে এই খাবারটা ‘বউখুদ’ নামে পরিচিত। আর আমার নিজের জেলা শেরপুরে এটাকে ‘বউখুদ’ ও ‘খুদবিরানি’ দুটোই বলে। যদিও আমার শিকড় মুন্সিগঞ্জে অর্থাৎ কিনা বিক্রমপুরে। শেরপুরে অনেকে আবার পাকা কাঁঠাল দিয়ে বউখুদ খেতে পছন্দ করেন। এলাকাভেদে নামের ভিন্নতা থাকলেও সকলের রান্নার রেসিপি প্রায় একইরকম।

কাহানি খুদ কি : ঢেঁকিতে চাল ভাঙানোর সময় কিংবা ইদানিংকালের মেশিনে চাল প্রক্রিয়াজাত করার সময় একপ্রকার ভাঙা ও ছোট ছোট দানাদার চাল পাওয়া যায়, যা খুদ নামে পরিচিত। কেনা চাল পরিষ্কার করার জন্য ঝাড়তে গেলেও খুদ পাওয়া যায়। রান্নার সময় তাৎক্ষণিকভাবে না পাওয়া গেলে চালকে গ্রাইন্ড করেও আপনি খুদের চাল বানিয়ে নিতে পারেন।
কথিত আছে, অতীতকালে গৃহকর্তা বাজার থেকে আতপ চাল কিনে আনার পর বাড়ির গৃহিণীরা অনেক যত্ন করে কুলা দিয়ে ঝেড়ে চালের ভেতর থেকে ভাঙা ও ছোট ছোট দানাদার এই চাল বা খুদ বাছাই করতেন। তারপর সে খুদের যেন অপচয় না হয়, তাই সেগুলোকে তেল-মশলা দিয়ে খিচুড়ি মতো একটা মজার খাবার রান্না করতেন তারা। সেখান থেকেই ‘বউয়াভাত’ বা ‘বউখুদি’ নামের খাবারটার উৎপত্তি। খাবারটা খুব সাদামাটা হলেও এর স্বাদ কোনো অংশেই কম নয়। এখনকার এই ‘মিনিকেট’ চালের যুগে এখন খুদের চাল পাওয়াটাও যেমন দুষ্কর, তেমনি তা দিয়ে বউয়াভাত রান্না করে খেয়ে জাতকুল হারানোর জো হবার আশঙ্কায় অনেকে খেতে আগ্রহী হন না! কিন্তু সময়ের বিবর্তনে আজ শহুরে জীবনে এই খাবারই অনেকটা স্পেশাল আইটেম হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।

এবার জেনে নেয়া যাক মজাদার বউয়াভাত রান্নার রেসিপি। যা যা লাগবে। বউয়াভাত রান্নার উপকরণসমূহ : খুদের চাল- ২ কাপ, সরিষা তেল- ৩ টেবিল চামচ, ফ্রেশ পেঁয়াজ কুচি- ৩ টেবিল চামচ, পেঁয়াজ পাতা- অল্প পরিমাণ (সংগ্রহ করা সম্ভব হলে), কাঁচা মরিচ- ৪টা, আদা বাটা- ১ চা চামচ, রসুন বাটা- ১/২ চা চামচ, তেজপাতা- ২টা, এলাচি- ৪ টা, দারুচিনি- ৩ টা, কালোজিরা- ১/৪ চা চামচ, শুকনো মরিচ- ৩ টা, লবণ- স্বাদ মাফিক, পানি- ৩ কাপ। ঝাল কম খেতে চাইলে মরিচ কম দিতে পারেন, তবে ঝাল বেশি হলেই খেতে ভালো লাগে।

যেভাবে রান্না করবেন। রান্নার প্রণালী : আমরা যেভাবে পোলাও রান্না করি অনেকটা সেইভাবে ঝরঝরে করে রান্না করা হয় এই বউয়াভাত, তবে মশলাটা একটু কম ব্যবহার করে এই যা। কেউ কেউ অবশ্য সামান্য হলুদের গুঁড়ো ব্যবহার করে থাকেন। এতে করে বউয়াভাতের রঙটা সাদা না হয়ে হলদেটে হয়ে যায়। প্রথমে খুদের চাল ভালভাবে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন। এবার একটা হাঁড়িতে বা সসপ্যানে সরিষা তেলটুকু দিন। তাতে একে একে পেঁয়াজ কুচি, পেঁয়াজ পাতা, কাঁচা মরিচ, আদা বাটা, রসুন বাটা দিন। একটু নাড়া দিয়ে তেজপাতা, এলাচি, দারুচিনি, কালোজিরা, শুকনো মরিচ দিন। এগুলো একসঙ্গে মিশিয়ে স্বাদ মাফিক লবণ দিয়ে ভাল করে নাড়ুন। এবার পানিটুকু ঢেলে চুলায় চাপিয়ে দিয়ে ঢেকে দিন। পানি ফোটা শুরু করা মাত্রই চুলার আঁচ কমিয়ে দিন। আধা ঘণ্টা বা চাল সিদ্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত মৃদু আঁচে রেখে নামিয়ে ফেলুন। ব্যস রান্না হয়ে গেলো ‘বউয়াভাত’ বা ‘লাতাভাজা’।

পুনশ্চ : মুন্সিগঞ্জ জেলার আলু খুবই বিখ্যাত। তাই সেখানে এই বিখ্যাত আলুর কুচি, খুদ, তেল এবং মশলার মিশ্রণে এই খাবারটার আরেকটি সংস্করণ রান্না করা হয়, যার নাম ‘আলুর বউয়া’। শ্বশুরবাড়ি গেলে জামাইকে ‘বউয়াভাত’-এর এই সংস্করণটা দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়ে থাকে।Mir Shahnewaz-র ফেসবুক ওয়ালে লেখাটি পড়ুন।

সর্বাধিক পঠিত