প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

গৌতম রায় : প্রসঙ্গ ৩৫ বছরে একদিনও ছুটি না নেওয়ার বিষয়টি গ্রোরিফাই করা কতোটুকু যুক্তিযুক্ত?

গৌতম রায় : বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘আলস্যের জয়গান’ (বাংলায় অনুবাদকৃত) বইটি পড়ার সময়েই চিন্তাটি ঢুকে যে একজন চাকরিজীবী মানুষের বছরে ঠিক কতোদিন ছুটি দরকার। যদি ভুল না করি, রাসেল দেখিয়েছিলেন এই পৃথিবীতে এতো মানুষ যে, সবাইকে সমানভাবে কাজ ভাগ করে দেওয়া হলে এবং প্রত্যেকে যদি দিনে চার ঘণ্টা করে কাজ করে, তাহলে দিনের বাকি অংশ আর কিছু করতে হয় না। রাসেল এসব কথা বলেছিলেন বহুদিন আগে। এখন পৃথিবীতে মানুষ বেড়েছে। রাসেলের মতো আমারও মনে হয় কাজের সমবণ্টনের মতো কোনো ব্যবস্থা থাকলে দিনে তিন থেকে চার ঘণ্টার বেশি কাজ হয়তো মানুষকে করতে হতো না। পৃথিবী সেই অবস্থানে নেই এবং যাবেও না। ফলে এসব চিন্তা করে লাভ নেই। কিন্তু চাকরিজীবী মানুষের ঠিক কতোদিন ছুটি দরকার বছরে। এই প্রশ্নটির উত্তর তাড়া করে ফিরেছি দীর্ঘদিন। নেট ঘেঁটে একসময় কিছুটা পড়ালেখা করে বোঝার চেষ্টা করেছিলাম কোনো নির্দিষ্ট উত্তর আছে কিনা। হয়তো আছে, কিন্তু আমি পাইনি। কিন্তু এরকম অনেক প্রবন্ধ আছে যে, যেখানে দেখানো হয়েছে মানুষের ছুটি দরকার।

সাপ্তাহিক যেসব ছুটি আমরা ভোগ করি, সেগুলোর পাশাপাশি সময়ে-অসময়ে ছুটি দরকার হয় মানুষের। কেবল পরিবারকে সময় দেওয়া, পরিবারের কারো অসুস্থতাজনিত কারণে বা অন্য কোনো কারণে ছুটি নেওয়াই যথেষ্ট নয়, মানুষের ছুটি নিতে হয় নিজের জন্যই। সপ্তাহান্তের দুদিন ছুটি কাটিয়ে দুদিন কাজ করার পর বছরের কোনো একসময় হঠাৎ কারো মনে হতেই পারে, তার একদিনের জন্য ব্রেক দরকার। এরকম হুটহাট ছুটিই হোক বা পরিকল্পনা করে নেওয়া ছুটিই হোক, এগুলো মানুষকে কাজের রসদ জোগায় আসলে। চাকরির শর্তাবলীতে ছুটির প্রসঙ্গটি থাকে, কারণ ছুটি আসলে চাকরিরই একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ছুটি গুরুত্বপূর্ণ না হলে কোনো অফিস তার কর্মীদের ছুটি দিতো? ইউরোপে শুনেছি, প্রতিটি অফিসই তাদের কর্মীদের ছুটি নিতে উৎসাহিত করে। এই উৎসাহিত করার সংস্কৃতি প্রাচ্যে বোধহয় নেই বা থাকলেও খুব কম। এই চিন্তাগুলো আবার এলো সম্প্রতি সময়ে একটি খবর পড়ার পর।

একজন শিক্ষক ৩৫ বছরের শিক্ষকতা জীবনে একদিনও ছুটি নেননি বলে খবর বেরিয়েছে। খবরটি পড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়াই হলো আসলে। প্রথমেই যে প্রশ্নটি নিজের মনে জেগেছে, ছুটি না নেওয়ার বিষয়টিকে কি গ্রোরিফাই করা যায়? খবরে ও ফেসবুকে বিভিন্নজন যেভাবে গ্রোরিফাই করেছেন, আমার কাছে মনে হচ্ছে এ ধরনের গ্রোরিফাই অপ্রয়োজনীয়। ছুটিতে মানুষ তো পরিবারকে সময় দেয়, নিজেকে সময় দেয়, ক্ষেত্রেবিশেষে সমাজ ও রাষ্ট্রকেও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের বাইরে সময় দেয়। শিক্ষক মহোদয় কর্মক্ষেত্রে যোগদান করে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তিনি কোনোদিন ছুটি নেবেন না। তিনি সেই কথা রেখেছেন। বিয়ের অর্ধেক কাজ সেরে বিদ্যালয়ে গিয়ে সেখানকার কাজ সেরে পরে বাকি অর্ধেক কাজ সেরেছেন। মৃত বাবাকে রেখে তিনি বিদ্যালয়ের কাজ সেরে এসে সৎকার করেছেন। এমনকি তিনি অসুস্থবোধ করার পরও বিদ্যালয়ে কাজ করেছেন। বিষয়টি কী এভাবে দেখা যায় যে, শিক্ষকের নিজের বিয়ে বা পিতার সৎকার এগুলো তার নিজের মানসিক শান্তির জন্য প্রয়োজনীয় ছিলো কিন্তু সেই শান্তিকে উপেক্ষা করেছেন তিনি।

আমার খুব জানতে ইচ্ছে হয়, এই দুইদিন তিনি বিদ্যালয়ে কি ঠিকমতো পড়াতে পেরেছিলেন? মৃত বাবাকে রেখে তিনি কি আক্ষরিক অর্থেই কোয়ালিটি টিচিং দিতে পেরেছিলেন? যেদিন ক্লাস শুরুর আগে তিনি মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন, সেদিন কি তিনি ঠিকমতো ক্লাস নিতে পেরেছিলেন? না পারলে বিদ্যালয়ে শুধু শুধু উপস্থিত থাকা আর ছুটি নেওয়ার মধ্যে পার্থক্য কী? শুধু শারীরিক উপস্থিতি কি কিছু প্রমাণ করে? কিংবা এভাবেও কি দেখা যায় বিষয়টিকে যে, ছুটি নেওয়াও আসলে তার কাজের অংশ, চাকরির অংশ? তিনি তার কাজের এই অংশটিকে কেন উপেক্ষা করলেন? বুঝতে পারি, তিনি প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে চেয়েছেন। শিক্ষকের প্রতিজ্ঞা রক্ষার যে সততা, সেটি খবরে এসেছে। একজন মানুষ তার নিজ সিদ্ধান্তের প্রতি দৃঢ় অবিচল, এটি প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু সত্যিকার অর্থেই এই ধরনের প্রতিজ্ঞা করা এবং জীবনবাজি রেখে সেটি রক্ষা করার উপযোগিতা কতোখানি?

একজন শিক্ষক নিবেদিত শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি। তিনি ছুটি না নিয়ে বছরের প্রতিটি দিন তার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে পড়াতে পেরেছেন, এই দাবি কি তিনি করতে পারবেন? শিক্ষকতা একটি চাকরি, একটি পেশা। নানাভাবে এই পেশাটিকে গ্রোরিফাই করা হয়। শিক্ষক ও শিক্ষকতাকে গ্রোরিফাই করার মাধ্যমে আসলে পেশাটির ক্ষতি করা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। করার বদলে বরং দেশের প্রতিটি পর্যায়ের প্রতিটি শিক্ষককের দক্ষতা, যোগ্যতা, বেতন, জবাবদিহিতা ইত্যাদি নিশ্চিত করা গেলে এই দেশের শিক্ষার উন্নতি হতো। ফেসবুকে আমার পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ অনেক মানুষ এই খবরটি পড়ে আনন্দিত হয়েছেন, শিক্ষকের প্রশংসা করেছেন, তরুণ প্রজন্মকে এই শিক্ষকের আদর্শ ধারণ করতে বলেছেন। তাদের উদ্দেশ্যে করজোড়ে নেবেন, আমার ভাবনাটি পড়ে আপনারা আহত হবেন না প্লিজ এবং এও মনে করবেন না যে, উক্ত শিক্ষকের প্রতি আমার কোনো ধরনের অশ্রদ্ধা বা বিরূপ মনোভাব আছে। পৃথিবীতে অনেক ব্যতিক্রমী মানুষ থাকেন, আমি ধারণা করি তিনি তাদেরই একজন। কারণ কঠোর ও দৃঢ় আত্মসংকল্প ছাড়া এমন একটি সিদ্ধান্ত ৩৫ বছর ধরে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

আমি তার এই গুণটিকে শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু তার এই কাজটিকে যেভাবে গ্রোরিফাই করা হচ্ছে, মিডিয়া বা মানুষের এই মনোভাবের বিরুদ্ধে আমি। কারণ একেবারই গুটিকতক ব্যতিক্রম ছাড়া বাদবাকি মানুষ এই দৃঢ় আত্মসংকল্প ধারণ করতে পারবেন না বা করার প্রয়োজন নেই। ফলে যখন তাদের সামনে এই ঘটনাটি গ্রোরিফাই করা হবে, তখন বাদবাকি মানুষের সংকল্পকে টলে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে পরোক্ষভাবেই। তাছাড়া ছুটি না নেওয়া মহৎ কিছু নয় আমাদের বর্তমান চাকরিকাঠামোতে। বরং কীভাবে প্রতিটি মানুষ তার দায়িত্ব ও কর্তব্য কার্যক্ষেত্রে সঠিকভাবে পালন করতে পারেন এবং এমন কেউ যদি থাকেন তিনি প্রতিদিনই তার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে কর্তব্যকর্ম করেছেন, সেসব ঘটনাই বরং গেরিফাই করা উচিত। এমনকি আমাদের এই শিক্ষকও যদি একদিনও ছুটি না নিয়ে প্রতিদিনই তার সর্বোচ্চটুকু দিতে পেরেছেন এমন দাবি পাওয়া যায়, তাহলে সেই কৌশলটি শিখে রাখাই হবে তাকে সম্মান জানানোর মূল প্রয়াস।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত