প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আলম খোরশেদ: বাংলাদেশ তার এক পরম সুহৃদকে হারালো

আলম খোরশেদ: বাংলাদেশ তার এক পরম সুহৃদকে হারালো। ম্যারি ফ্রান্সেস ডানহাম, যাঁর জন্মও হয়েছিল ঠিক বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের তারিখটিতেই, ১৯৩২ সালে, ফ্রান্সের এক পাড়াগাঁয়ে, গত পরশু ৮৯ বছর বয়সে নিউইয়র্কে, তাঁর দ্বিতীয় স্বদেশভূমিতে, শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। এর আগে, ১৯৬০ থেকে ৬৭, এই দীর্ঘ সাতটি বছর তিনি কাটিয়েছিলেন স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশ তথা ঢাকা শহরে, তাঁর জীবনসঙ্গী স্থপতি ড্যানিয়েল ডানহামের সঙ্গে। ড্যানিয়েল তখন তৎকালীন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপত্য বিভাগ চালু করা ও সেখানে শিক্ষাদানের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি নির্মীয়মাণ কমলাপুর রেলস্টেশনের অন্যতম স্থপতি হিসাবেও কাজ করছিলেন।

আর ম্যারি ব্যস্ত ছিলেন বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, সমাজ ও ইতিহাস অধ্যয়নের কাজে। এতটাই যে, কিছুদিনের মধ্যেই তিনি তখন ঢাকাবাসী আরও দুয়েকজন বিদেশিনীর সঙ্গে মিলে প্রকাশ করে ফেললেন ঢাকার ওপর লিখিত প্রথম গাইডবই ‘লিভিং ইন ঢাকা’। এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। বাংলাদেশের গ্রামীণ সংগীত, নাটক, সংস্কৃতির মাধুর্য ও শক্তিমত্তায় আকৃষ্ট হয়ে, সংগীত-নৃতত্ত্বে উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণ করে, তারই আলোকে রচনা করেন বাংলাদেশের জারিগান নিয়ে গবেষণামূলক একখানি মহাগ্রন্থ Jarigan: Muslim Epic Songs of Bangladesh, যেটির প্রকাশক বাংলাদেশের বনেদি প্রকাশনা সংস্থা ইউপিএল।

বাংলাদেশের দুই কীর্তিমান লেখক আহমদ ছফা ও সলিমুল্লাহ খানের সঙ্গেও তাঁর গভীর ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি ও সলিমুল্লাহ খান মিলে আহমদ ছফার অনন্য গ্রন্থ ‘পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’ ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। ঘটনাচক্রে তাঁর কন্যা ক্যাথরিন ডানহামের সৌজন্যে এর পাণ্ডুলিপিটি কয়েকবছর আগে আমার হাতে আসে। আমি সেটি ঢাকা ট্রিবিউন পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ও মেধাবী অনুবাদক রিফাত মুনিমের সহৃদয় সহযোগিতায় তার সম্পাদিত সাপ্তাহিক সাহিত্য সাময়িকীর পাতায় ধারাবাহিকভাগে প্রকাশের উদ্যোগ নিই। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য কয়েক কিস্তি ছাপানোর পরই সর্বগ্রাসী করোনার আগ্রাসনে সেটির প্রকাশ স্থগিত হয়ে যায়। আশা করি রিফাত মুনিম এই মহীয়সী নারীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এটি পুনঃপ্রকাশের উদ্যোগ নেবেন।

এখানে উল্লেখ্য, আহমদ ছফার সঙ্গে ম্যারি ফ্রান্সেসের চিঠিপত্র ও আনুষঙ্গিক আরও অনেক কাগজপত্রের বিশাল এক সংগ্রহ ছিল তাঁর কাছে। বন্ধুরা জেনে খুশি হবেন অনেক সাধ্যসাধনা করে, তাঁর গুণী কন্যার একনিষ্ঠ সহযোগিতার কল্যাণে, অবশেষে এই দুই সপ্তাহ আগে আমরা সেগুলোকে বাংলাদেশে আনাতে সক্ষম হয়েছি। এই মহামূল্যবান দলিলপত্রসমূহ এ-মুহূর্তে সলিমুল্লাহ খানের জিম্মায় তাঁর কর্মস্থল ইউনিভার্সিটি অভ লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে সংরক্ষিত রয়েছে।

ম্যারি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন তাঁর অবসরের দিনগুলোতে। সেটি হচ্ছে, তাঁর ঢাকাবাসের দিনগুলোর ওপর পাঁচখণ্ডের একটি অমূল্য স্মৃতিকথা Some Weep, Some Laugh: Memoirs of an American Family in Dhaka 1960 – 1967 রচনা করা। তাঁর কর্তব্যপরায়ণ কন্যা এটিকেও খুব যত্নসহকারে তাঁদের পারিবারিক ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এর সংরক্ষণ ও প্রচারণার কাজ করে আসছেন সাধ্যমতো। কিন্তু আমার মনে হয় গ্রন্থটির গুরুত্বের কথা ভেবে বাংলাদেশেরই কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রকাশনা সংস্থার এগিয়ে আসা উচিত আমাদের ইতিহাসের আকর এই গ্রন্থটির আশু প্রকাশনা এমনকি বাংলা অনুবাদের কাজে।
শুধু কথা নয়, কাজ দিয়েই আমাদের এই অকৃত্রিম বাংলাদেশ অনুরাগী মহীয়সী নারীর অপরিসীম ঋণপরিশোধের উদ্যোগ নিতে হবে। ম্যারি ফ্রান্সেস ডানহাম আপনি আমাদের আনত অভিবাদন গ্রহণ করুন।

সর্বাধিক পঠিত