প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিপ্লব পাল: মহিষাসুর এবং হিন্দু পুরাণের বক্তব্য!

বিপ্লব পাল: অসুর মানেই পুরাণে দৈত্য, বদমাইশ, ভিলেন এমনটি কিন্তু নয়! ইনফ্যাক্ট ঋকবেদের যুগে অসুর মানে ওয়ার লর্ড-যুদ্ধে নিপুণ সর্দার। অসুর বা অসুরা ইন্দোইউরোপিয়ান। যেখানেই এই ইন্দোইউরোপিয়ান সভ্যতা ছড়িয়েছে-পারস্য এবং ইউরোপেও অসুরা তাদের পুরাণে আছেন। ইউরোপে খ্রিস্টান ধর্মের আগমন এবং পারস্যে ইসলামের উদয় হওয়ায়, আসুরেরা নিত্যদিনের সংস্কৃতিতে আর নেই। কারণ ইন্দোইউরোপিয়ানদের সেই প্যাগান ধর্মটাই অনেকদিন আগে বিলুপ্ত! কিন্ত জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, ভাইকিং, রাশিয়া যেখানে যেখানে ইন্দোইউরোপিয়ান সভ্যতা ছড়িয়েছে সর্বত্রই অসুর মানে ওয়ারলর্ড। যারা দক্ষযোদ্ধা হিসেবে হয়তো সেকালে নাম করেছিলেন। হিন্দু পুরাণ রাজনীতির অমোঘ দর্শন! যারা যুদ্ধ করে ক্ষমতা দখল করে, তারা চিরকালই ক্ষমতার অপব্যবহার করে অত্যাচারী হয়। সেই ট্রাডিশন কী গণতন্ত্র, কী কমিনিউস্ট বিপ্লব সর্বত্রই এক! আর ভারতের পুরাণ এই রাজনৈতিক সত্যকেই হিরন্যকশিপু থেকে মহিষাসুরের গল্পের মাধ্যমে তুলে এনেছে। পুরাণ এবং মহাভারত ঘাঁটলে পরিষ্কার ভারতের সমস্ত হিন্দুসাহিত্যের রাজনৈতিক শিক্ষা একটাই! ক্ষমতা রাজাকে অত্যাচারী করে এবং সেই শাসক যতোই নিজেকে ইনভিন্সিবল মনে করুন না কেন, মানুষের হাতে তার একদিন পরাজয় হবেই! তাই হিরন্যক্ষ থেকে হিরন্যকশিপু এবং মহিষাসুরের গল্প এক।

তারা দৈববলে অপারেজেয় শক্তির অধিকারী হয়ে ত্রিলোকে অত্যাচারী শাসক হয়ে ওঠে। ফলে তাদের হটাতে দেবতা এবং মানুষদের কোয়ালিশন ‘প্রতিরোধ শক্তি’ গড়ে তোলে! তাই দুর্গোৎসব, অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদের গল্প! পুরানে অসুরেরা সবাই ব্রহ্মার মানসপুত্র মরিচির ছেলে কাশ্যপের সন্তান বা নাতিপুতি। অর্থাৎ দেবতাদের জ্ঞাতিভাই। ক্যাশ্যপের অনেক স্ত্রী ছিলেন তার মধ্যে দিতির পুত্ররা অসুর, আর অদিতির পুত্ররা দেবতা। অদিতি এবং দিতি দুই বোন। যক্ষকন্যা। দু’জনই ঋষি ক্যাশ্যপের স্ত্রী। ছোটবেলা থেকেই দুই বোনে রেষারেষি। অদিতি তপস্যা করে পিতামহ ব্রহ্মাকে সন্তুষ্ট করে সন্তান চাইলেন। এমন সন্তান যিনি পারফেক্ট হবেন কী রূপে, কী জ্ঞানে, কী শক্তিতে! সেই সন্তান হচ্ছেন ইন্দ্র! ইন্দ্রের জন্মে ঈর্ষান্বিত হলেন দিতি। তিনিও তপস্যা শুরু করলেন তার দরকার এমন পুত্রযারা এতো ক্ষমতাবান হবে, যারা যুদ্ধে ইন্দ্রকে হারাতে পারবে। ফলে তার গর্ভে এলো হিরাণাক্ষ্য এবং হিরনাকশিপু। পুরাণ অনুযায়ী দিতির ঈর্ষান্বিত কামনার ফলে অসুরকুলের জন্ম! অর্থাৎ অসুর মানে অনার্য দ্রাভিদ্গোষ্ঠীর লোক এটা সম্পূর্ণ ভুল। অসুরেরা আর্য গোষ্ঠীরই যুদ্ধবাজ নৃপতি। এরিয়ান ওয়ারলর্ড। ঋকবেদে আর্যরা যাদের হারিয়ে বনজঙ্গল থেকে নিজেদের রাজত্ব বানাচ্ছিলেন তাদের বলে ‘রাক্ষস’। রাক্ষস এবং অসুর সম্পূর্ণ আলাদা।

রাক্ষসরা দ্রাভিদিয়ান আদিবাসী। আসুরেরা নয়। গত কয়েক বছর ধরে গুটিকয় বামেরা প্রমাণ করার চেষ্টা করে চলেছেন মহিষাসুর স্থানীয় দ্রাবিডিয়ান আদিবাসী রাজাÑযাকে আর্যবর্ত্তের কন্যা দুর্গা হত্যা করেন। এগুলো সব ভুলভাল। দেবতা এবং অসুরÑ উভয় আর্য ওয়ারলর্ড। পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। মহাভারতে বা রামায়ণে যারা রাক্ষস বলে খচিত তারাই স্থানীয় আদিবাসী বা দ্রাভিদিয়ান। তারা পুরাণ অনুযায়ী অসুর নন। ঋকবেদ থেকে মহাভারতের যুগের উত্তোরণে অসুরেরা সম্পূর্ণ ভিলেন হয়ে গেছেন! কিন্তু গীতা এবং উপনিষদে দেখা যাচ্ছে সুর এবং অসুর মানুষের দুই ভিন্ন প্রকৃতি। সুর অসুরের দ্বন্দ প্রতিটা মানুষের মনেই চেতন এবং অবচেতন মনের দ্বন্দ। যেখানে অবচেতন মনের অন্ধকার ইচ্ছাগুলোকে, আমাদের চেতনা জগতের শুভচিন্তা সবসময় পরাজিত করে। আর না করলে মানুষই অসুর হয়ে ওঠে! ভারতীয় দর্শনে অসুরের প্রভাব অসীম-কারণ, যে যুগের ঋষিরা বুঝেছিলেন আমাদের সবার অবচেতন মনেই এক অসুর বাস করেন! যে আসুর ক্ষমতার স্বাদ পেলেই অত্যাচারী হয়ে ওঠে! সে আর কেউ নন- আমরা নিজেরাই! ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত