প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাতিন রহমান: হৃদয়ের ছোট্ট একটা নিষ্কলুষ অংশে গোপনে লুকিয়ে রাখা কিছু পুণ্য

রাতিন রহমান: জীবনের ওপার পর্যন্ত যেতে যেতে পাপের চেয়ে পুণ্যের পাল্লা ভারী হবে, এ আশা ছেড়ে দেওয়া অনেককেই দেখি আজকাল। পাপ-পুণ্যের সংজ্ঞাটাই কেমন যেন ধোঁয়াটে হয়ে গেছে এই দুরন্ত দুর্বার মুহূর্তে মুহূর্তে রঙ বদলানো দুনিয়ায়। তবু অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, অল্প করে হলেও পূণ্য জমাবার চেষ্টা করে কিছু মানুষ সুযোগ পেলেই। খুব সাবধানে, কেউ যেন টের না পায়, সেভাবে সকলের অগোচরে কিছু ভালো কাজ, কিছু পুণ্য কুড়িয়ে গোপন কোনো সঞ্চয়ে তুলে রাখে যক্ষের ধনের মতো। আপ্রাণ চেষ্টা করে হৃদয়ের কিছু অংশ শুভ্র নিষ্কলুষ রাখতে, সাবধানে আগলে রাখতে চায় বোধহয় আগের কোনো জন্মের সঞ্চিত কোনো মহার্ঘ্য পুণ্যথলি বা আশীর্বাদের বর। খুবই অদ্ভুত এক ব্যাপার। কেন এই বিচিত্র সঞ্চয়? প্রশ্নের জবাবে যে উত্তর আসে, সে যেন মানব মনের মতোই ব্যাখাতীত রহস্যময়। এই সঞ্চয় কিন্তু জীবনের শেষপ্রান্তে অসীম কোনো স্বর্গের আশায় না। তারা সাবধানে এই সঞ্চয় আগলে রাখে, যেন জরুরি দরকারে এই একটু একটু করে জমানো পুণ্য, হৃদয়ের নিষ্কলুষিত অংশটুকুর বিনিময়ে মানুষের উপকারে আসতে পারে তারা। যেন সঞ্চয়ের এই যৎসামান্য ঐর্শ্বযের বিনিময়ে পরম করুণাময় মঞ্জুর করেন তাদের প্রার্থনা। পাপী মানুষ তারা, প্রতিনিয়ত পাপ করে যাওয়াই যেন পরিণত হয়ে গেছে নিয়তিতে।

চাইলেও ফেরা হয় না, ফেরার পথও মুছে গেছে নানাবিধ রিপুর লোভনীয় চাকচিক্যে। তাই ফেরার আশা ছেড়ে দিয়েছে তারা, জানে ফিরেও তেমন একটা লাভ নেই। ফিরতি পথেই কোনো না কোনো রিপুর তাড়নায় আবারও পথ হারাবে, যেভাবে হারিয়ে আসছে অনাদিকাল ধরে। তাই পুণ্য জমিয়ে স্বর্গে যাবার প্রায় অসম্ভব লক্ষ্যে না ছুটে তারা নানা রিপুতে সার্বক্ষণিক ডুবে থেকেও খুব সাবধানে অনেক সময় নিজেকে ফাঁকি দিয়েই ছোট ছোট পুণ্য জমায় মানুষের জন্য। আপনজনদের জন্য। পরিচিত মানুষের জন্য। কখনও কখনও এমনকি পরম শত্রুর জন্যও। কে জানে, কখন দরকার হয়, কার জন্য দরকার হয়। জাগতিক সবকিছু জয় করে ফেলা মানুষও অসহায় হয়ে পড়ে মাঝে মাঝে, তার সাধ্য আর ক্ষমতার অকল্পনীয় দাপটের আলোর কাছাকাছি তীব্র গতিবেগও এক সময় গতি হারাতে হারাতে থেমে যায় কোনো এক সীমার এপাশে। এই মানুষগুলো পুণ্য জমায় ঠিক সেই সীমার ওপাশের জন্য, যদি কোনোভাবে বাঁচানো যায় একটা ফুল, ফেরানো যায় প্রায় হারিয়ে ফেলা প্রিয়জন, আবার আলোকচ্ছটায় উচ্ছ্বসিত করে তোলা যায় নিভে যাওয়া কোনো অনিন্দ্য হাসিমুখ। যদি কোনোভাবে। হুমায়ুনের ‘মধ্যাহ্ন’-এ ঋষি হরিচরণের মতো মানুষে মানুষে পার্থক্য ঘুচিয়ে সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠবার মতো চিরকল্যাণকর শুদ্ধতা নেই তাদের। পারবে না সেটাও তারা জানে।

কিন্তু তবুও তারা অজান্তেই হয়ে ওঠে জার্মান শিল্পপতি অস্কার শিন্ডলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে যেমন সে তথাকথিত অভিজাত পিশাচশ্রেণির একজন প্রতিনিধি হয়েও বাঁচিয়েছিলো ১১০০ মানুষের প্রাণ, ঠিক সেভাবে অতল পাপের গহ্বরে ডুবে গিয়েও অনন্ত গ্লানির শাস্তি অপেক্ষমাণ জেনেও তারা আনন্দলোকের মঙ্গলালোকে বিরাজমান সত্য সুন্দরকে সর্বশক্তিতে উচ্চে তুলে ধরে। জীবনের শেষ সম্বল, শেষ পুণ্যটুকু দিয়ে হলেও বাঁচাতে চায় আর একটা মানুষের জীবন, আরেকটা প্রাণ। আর যদি সেটুকুও না পারে, তবে জহিউরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের মতো, হিন্দুস্তানের সম্রাট পাদশাহ বাবরের ঐর্শ্বযমণ্ডিত সিংহাসন ছেড়ে সন্তানের মাথার চারপাশে ঘুরে পরম করুণাময়ের কাছ থেকে নিজের জীবনের বিনিময়ে নিজের সন্তানের জীবন ভিক্ষে চেয়ে নেওয়ার মতো তারাও নিজেকে উৎসর্গ করে যায় চুপচাপ, ওই যে হৃদয়ের সামান্য একটা অংশ খুব সাবধানে নিষ্কলুষ রাখা, তা দিয়েই সওদা করে আরেকটা প্রাণ। তার পচেগলে নষ্ট হয়ে যাওয়া হৃদয়ের কয়লা হয়ে যাওয়া প্রাণের বিনিময়ে আরেকটা নিষ্পাপ প্রাণ- ক্ষতি কী। এই দুর্লভ মানুষদের দেখে মাঝে মাঝে খুব পুণ্য জমাতে ইচ্ছে করে। ছোট ছোট পুণ্য। হৃদয়ের ছোট্ট একটা নিষ্কলুষ অংশে গোপনে লুকিয়ে রাখা সামান্য কিছু পুণ্য। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ