প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: এই স্যালাইন শিক্ষা জাতির ডায়রিয়া সারলেও পরিশেষে ক্যান্সারে আক্রান্ত করবে

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: ২০২৩ সাল থেকে নতুন পাঠ্যসূচিতে নবম ও দশম শ্রেণির নতুন কাররিকুলাম অনুসারে সব শিক্ষার্থীকে পর্যন্ত দশটি বিষয় পড়তে হবে। অর্থাৎ বিষয় পছন্দ হউক বা না হউক, বিষয় পারুক বা না পারুক সবাইকে ১০টি বিষয়ই পড়তে হবে। বর্তমান চলমান পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা কিছুটা অন্তত বাছাই করার সুযোগ পেত। যদি কেউ গণিত ও বিজ্ঞান বেশি পছন্দ সে তখন বিজ্ঞান বিভাগে যেতে পারে, কেউ গণিতে একটু দুর্বল বা অপছন্দ হলে সে মানবিক বা কলা বিভাগে যেতে পারে আর যারা নিশ্চিত ভিবিষ্যতে ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে পড়বে সে কমার্স বিভাগে যেতে পারে। এখন এই অপসনটুকু পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এখন ঘাড়ে ধরে সবাইকে এক বানানোর চেষ্টা। পৃথিবীর কেউই একরকম না। বৈচিত্র্যতাই পৃথিবীর সৌন্দর্য্য। নতুন নিয়ম এই বৈচিত্র্যতাকে কেড়ে নিয়ে সবাইকে এক বানানোর নিয়ম করেছে। এটা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সর্বনাশ করে ছাড়বে বলে দিচ্ছি। ওটুকুওও যেন শেষ না।

সঙ্গে আগের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অগুরুত্বপূর্ণ করে নতুন অনেক অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঢুকানো হয়েছে। যেই ১০ টা বিষয় নবম ও দশম শ্রেণিতে পড়ানো হবে সেগুলো হলো বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা, জীবন ও জীবিকা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ভালো থাকা, এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। তার মানে কি? এর মানে হলো বর্তমানের তিনটি আলাদা আলাদা বিষয়, যেমন পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান, এই ৩ বিষয় থেকে তিন ভাগের ১ ভাগ করে নিয়ে একটি বিষয় বানানো হবে। যার নাম হবে বিজ্ঞান। অথচ সারা পৃথিবীতে নবম শ্রেণি থেকেই মৌলিক বিজ্ঞানের এই ৩টি বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলাদা বিষয় হিসাবে পড়ানো হয়। কোথাও এর ব্যতিক্রম নেই। কোথাও না।

নতুন নিয়মে আর কি পরিবর্তন আনা হবে? সেখানে জীবন ও জীবিকা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ভালো থাকা, এবং শিল্প ও সংস্কৃতি নামে নতুন ৪টি বিষয় যোগ করা হয়েছে। মৌলিক বিজ্ঞানকে কেটেছেঁটে সেখানে জীবন ও জীবিকা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ভালো থাকা দিয়ে তালি দিয়ে যেই শিক্ষা হবে সেই শিক্ষা কি যুগোপযোগী হবে? জীবন ও জীবিকা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ভালো থাকা ইত্যাদি বিষয় পড়ানোর জন্য আমাদের আলাদা বোর্ড আছে। আমাদের কারিগরি বোর্ডের অধীনেই এসব পড়ানো হয় বা পড়ানো যায়। মজার ব্যাপার হলো এসব বিষয় পড়ানো হলেও এসব বিষয়ে পরীক্ষা হবে না। আমাদের শিক্ষা চাকরি ব্যবস্থা ফলাফল ও নম্বর ভিত্তিক।

পরীক্ষাই যদি না থাকে এসব বিষয়কে কেউ গুনবে? শুধু শুধু কেন তাহলে মৌলিক বিজ্ঞানের বিষয়গুলোকে অগুরুত্বপূর্ণ বানিয়ে ফেলা হলো? অন্যদিকে উচ্চ মাধ্যমিকের বিজ্ঞানের বিষয়গুলো কিন্তু অপরিবর্তিত আছে। এবার বলুন এই কম জানা শিক্ষার্থীরা যখন উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে উঠবে তখনতো তারা কুয়া থেকে একেবারে সমুদ্রে পরে যাবে। তারাতো কোনো কুল কিণারা পাবে না। একেবারে মাঠে মারা যাবে। এমনিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা যেই শিক্ষার্থীদের পাই তারা বিজ্ঞানে যথেষ্ট দুর্বল কারণ স্কুল কলেজে মানসম্পন্ন শিক্ষক দেওয়া হয় না। নতুন কাররিকুলাম পড়ে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে তাদের কি অবস্থা হবে আমিতো এখনই শঙ্কিত। প্রশ্ন হলো কাদের পরামর্শে, কাদের সঙ্গে কথা বলে এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে?

তারা কারা? এতো খারাপ একটা পরিবর্তন দেখেও দেশের অধিকাংশ শিক্ষক বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যাদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করা এবং মত প্রকাশের একটু হলেও স্বাধীনতা আছে। আমাদের স্কুল কলেজের শিক্ষকদেরতো সেটা নেই। তথাপি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আওয়াজ তুলছে না। কারণ রাজনীতি। এজন্যই সরকার আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনীতি ইঞ্জেক্ট করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যতোবেশি রাজনীতি থাকবে ততো বেশি দলকানা শিক্ষক হবে এবং তা হলে ওই শিক্ষকরা যদি কথা বলতেই হয় বলবে বাহ্ খুব ভালো হয়েছে। সহমত হওয়া ছাড়া তাদের অন্যকোনো অপশন নেই।

দল করেও সমালোচনা করলে দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ উঠবে। এভাবেই দেশটাকে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি এই নতুন পরিবর্তিত কাররিকুলাম কার্যকর হলে বাংলা মাধ্যমের কবর রচনা হবে। এই পরিবর্তন কার্যকর হলে শিক্ষার্থীরা দলে দলে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে যাবে। এটাই কি তাহলে আসল মতলব? ইংরেজি মাধ্যম আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া বাড়িয়ে তাদের মালিকদের ব্যবসা বাড়ানোর ধান্দা? না এর সঙ্গে আরও ধান্দা আছে। বই লেখা, বই ছাপানো, বিদেশে ট্রেনিং ইত্যাদি করে অনেকের পকেটে অনেক টাকা যাবে। বিনিময়ে দেশের শিক্ষাটার বারটা না শুধু ২৪টা বাজবে বলে দিলাম কিন্তু।

বিভাগ উঠিয়ে দিয়ে যা করা উচিত ছিলো সেটা হলো যতো ইচ্ছে বিষয় ঢুকান এবং সকল বিষয়কে ঐচ্ছিক করে দেওয়া। শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দ মতো বিষয় যতো সংখ্যক ইচ্ছে নির্বাচন করবে এবং সেটাই করা হয় ইংরেজি মাধ্যমসহ পৃথিবীর সকল উন্নত দেশে। কেউ যদি সংগীত, চারুকলা নিয়ে পড়তে চায় সেটাও যেন পড়তে পারে। বিভাগ উঠিয়ে দেওয়া মানে গলায় ফাঁস পড়ানো না। এক চিমটি পদার্থবিজ্ঞান, এক চিমটি রসায়ন ও এক চিমটি জীববিজ্ঞান দিয়ে এই স্যালাইন শিক্ষায় জাতির ডায়রিয়া সারলেও পরিশেষে ক্যান্সারে আক্রান্ত করবে। লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত