প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: নারীবিদ্বেষী তালেবান

দীপক চৌধুরী: দেশের ভেতরে নারী নিপীড়ন, জনমত দমন, ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করে আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শারগোল তোলার মতো বৈশিষ্ট্যের অধিকারী তালেবান। আন্তর্জাতিক মহলে গড়ে ওঠা তালেবানদের সন্ত্রাসী পরিচিতি ঘোচানো কঠিন। সাম্প্রতিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চীন যতোই লাফালাফি করুক বা আনন্দিত হোক না কেনো যখনই উইঘুর মুসলমানদের ভয়ংকর নির্যাতন নিপীড়নের কথা উঠবে তখন তালেবানদের বড় একটা অংশ কোনোভাবেই নীরব থাকবে না। বিশ্বাবাসী জানে, তালেবানরা বর্বর ও পশ্চাৎপদ হিসেবে অভিযুক্ত। আধুনিক চিন্তার মানুষ ও আধুনিক বিজ্ঞানের এ সময়ে তালেবানের এমন উত্থানে বিশ্বের নেতারাও চিন্তিত। অস্ত্রবাজির উল্লাস ছিলো তালেবানের পুঁজি। আফগানের একশ্রণির কর্মকর্তার সীমাহীন দুর্নীতিই তালেবানদের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

এখন তালিকা ধরে ধরে আফগানদের খোঁজা হচ্ছে। তালেবানযোদ্ধাদের এমন আচরণে আফগানরা বিস্মিত নন। কারণ, এটাই তাদের চরিত্র। তাদের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে নারীবিদ্বেষ। আফগান নারী ও কিশোরীদের নিয়ে; তাদের শিক্ষা, চাকরি ও চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন বিশে^র বিভিন্ন দেশ। আফগানিস্তানজুড়ে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের ও কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও আলবেনিয়া, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, চিলি, কলম্বিয়া, কোস্টারিকা, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, হন্ডুরাস, গুয়েতেমালা, উত্তর মেসিডোনিয়া, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, প্যারাগুয়ে, সেনেগাল ও সুইজারল্যান্ড। একটা বিষয় পরিষ্কারভাবে তারা কিন্তু বলেছে, ‘যেকোনো ধরনের বৈষম্য ও নির্যাতন প্রতিরোধ করা দরকার।’ তালেবানরা সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে যেভাবে ক্ষমা করে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে এর বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে না। তালেবানেরা বিশ্বাস অর্জনের জন্য বহুমুখী চেষ্টা চালাচ্ছে।

কাবুলের আকাশে মার্কিন সশস্ত্র যুদ্ধবিমানের চক্কর দিচ্ছে। মার্কিন যুদ্ধবিমান কাবুল শহরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন গত বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানায়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়। আফগানিস্তান থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের যে অভিযান অব্যাহত আছে, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই কাবুলের আকাশে মার্কিন যুদ্ধবিমান উড়ছে বলে পেন্টাগনের পক্ষ থেকে জানানো হয়। পেন্টাগনের মুখপাত্র জন কিরবি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো কাবুল শহরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। কিরবি বলেন, আমরা তালেবানের কাছে এ বিষয় একদম স্পষ্ট করে দিয়েছি যে বিমানবন্দরে আমাদের অভিযানকে ঘিরে আমাদের লোকজনের ওপর কোনো হামলা হলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

তালেবান নৃশংসতার উদ্বেগে নারীরা। নারী রাজনীতিক, সংস্কৃতকর্মী, নারী শিল্পী, নারী ফুটবলার, সাধারণ নারী, শিশু ও সংখ্যালঘুরা জানেন কী ভয়ংকর পরিণতি অপেক্ষা করছে সামনে। আতঙ্ক আর উদ্বেগ সর্বত্র। আফগানিস্তানের মানুষের হয়েছে উভয়সংকট দশা। অনেকেই আতঙ্কিত এ কারণে যে দেশটার দখল নিল তালেবান! তারা কি শান্তিতে থাকতে দেবে? এমন প্রশ্নই বেশি। নব্বইয়ের দশকে তালেবান যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, তখন নানাভাবে মানুষের ওপর নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। বিশেষত নারীদের তো তারা মানুষই গণ্য করেনি। তালেবান শাসনের ভীতিকর সেসব স্মৃতি এখন আফগানদের অন্তরে। আফগানিস্তানের মানুষের ভয়, আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে তা গত ১৫ আগস্ট দেখা গেল, কাবুল বিমানবন্দরে। সেদিন হাজারো মানুষ জড়ো হয়েছিল। রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম রিয়া নোভাস্তির একটি ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, হঠাৎ ছিটকে পড়ে গেলেন দু’জন উড়ন্ত বিমান থেকে। তারা মারা গিয়েছিলেন, এক ফুটবলার বিমানের চাকায় গলে গেছেন।

বিমানবন্দরের আশপাশে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে লেগে গেল যানজট।কেউ জানালা দিয়ে, কেউ বা বিমানের চাকা ধরে। সবাই ছুটছে বিমানবন্দরে। দেশ ছেড়ে পালাতে চায় তারা। নিজের দেশ ছেড়ে কেউ এভাবে পালায়। মানুষ যখন ভাবে এদেশ নিরোপদ নয় তখনই প্রাণ নিয়ে পালায়। যে যেভাবে পারছে, পালাচ্ছে। পাকিস্তান সীমান্তে তৈরি হয়েছে অদ্ভুত অবস্থা। হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত পথে চাইছেন দেশ ছাড়তে। গোটা আফগানিস্তানে চরম বিশৃঙ্খলা। এমন পরিস্থিতিতে কেমন আছেন সেখানকার আফগান লেখক–-কবি–সাহিত্যিক-–শিল্পীরা? কবি ও ইতিহাসবিদ আবদুল্লাহ আতেফির কী অপরাধ ছিল, কেউ তা জানে না। তিনি কবিতা লিখতেন, ইতিহাসচর্চা করতেন, শিল্প–সাহিত্যের কথা বলতেন, সৌন্দর্যের কথা বলতেন। তালেবানদের পছন্দ হয়নি। সুতরাং হত্যা। গত ২৮ জুলাই তারা ফজল মোহাম্মদ নামের এক কৌতুকাভিনেতাকে হত্যা করেছে। এক ভিডিও ক্লিপ থেকে এটা জানা গেল। একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছিল, তালেবান পাশবিক প্রহার চালাচ্ছে ফজল মোহাম্মদের ওপর। হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে তালেবান। ফজল মোহাম্মদ ছিলেন আফগান পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বাস করতেন কান্দাহারে। আফগান সংবাদমাধ্যম গান্ধারা বলছে, প্রায় ১২টি জেলায় সমাজকর্মী, কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক ও শিল্পীকে হত্যা করেছে তালেবান। কান্দাহারের এক বাসিন্দা নাম বাসিন্দা শিক্ষক আবদুল। তিনি বাড়ি থেকে শিল্প–সাহিত্যের সব বই লুকিয়ে ফেলেছেন।

দেয়াল থেকে নামিয়ে ফেলেছেন শিল্পকর্মগুলো। ঘরের ভেতর এসব দেখামাত্র তারা আমার পরিবারের সবাইকে গুলি করে মেরে ফেলতে পারে। কাবুলে মার্কিন দূতাবাস খোলা রাখার আহ্বান জানিয়েছে আফগান আমেরিকান আর্টিস্ট অ্যান্ড রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন। ১৩ আগস্ট সংগঠনটির ওয়েবসাইটে বলা হয়, আফগানিস্তানের লেখক, শিল্পী, কবি ও সাংবাদিকেরা নিজ দেশে নিরাপদ নন। সংগঠনটির কর্মীরা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি শিল্পী–সাহিত্যিকদের জন্য ‘আর্টিস্ট ভিসা’ চালু করারও আহ্বান জানিয়েছেন। এ ছাড়া নারী, শিশু, আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্যও আলাদা ভিসা চালু করার অনুরোধ করেছেন তারা।সে দেশের বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সাহরা কারিমি। তিনি সুপরিচিত তাই এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।

দ্য ইকোনমিস্ট, গান্ধারা, হাইপার অ্যালার্জিক ও আওয়া ওয়েবসাইটসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য তেকে জানা যায়, সবশেষে নিরাপত্তা ইস্যু। তালেবানের বিজয় নিয়ে প্রায় সব নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞই প্রচণ্ড উদ্বেগ ব্যক্ত করেছেন। তাদের এ উদ্বেগ যুক্তিসংগত। কারণ, তালেবানদের অতীত আদর্শের সঙ্গে বর্তমানের তফাৎ কী আছে। আফগানিস্তানের মানুষ কোনোভাবেই আশ্বস্ত হচ্ছে না। দেশ ও সরকার চালাতে তালেবানদের প্রয়োজন অর্থ। অন্য দেশ থেকে বৈদেশিক অর্থ সাহায্য পাওয়াও কঠিন এখন। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তালেবান মূলত অপরাধমূলক ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থায়ন করে থাকে। এর মধ্যে আছে মাদক চোরাচালান, আফিম উৎপাদন ও বিক্রি, চাঁদাবাজি ও অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়। বিশ্বের আফিম উৎপাদনের ৮০ শতাংশই করে থাকে আফগানিস্তান। এভাবে বছরে ৩০০ মিলিয়ন থেকে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আয় করে থাকতো তালেবান। অর্থ উপার্জনের উৎস কোথায়। যুক্তরাষ্ট্র তো তাদের হাত গুটিয়ে নিয়েছে। এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে আয় করা অর্থ দিয়ে এখন তালেবান কী দেশ চালাতে পারবে নাকি? আসলে উভয় সংকটে রয়েছে তালেবানও।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

সর্বাধিক পঠিত