প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: শিক্ষকতা পেশাকে যতোদিন আদরনীয় করা না হবে ততোদিন কোন টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: আমরা সবাই জানি আমাদের সেরা শিক্ষার্থী এবং তাদের বাবা-মায়েরা দুঃস্বপ্নেও শিক্ষক হওয়া দেখেন না। তারা কী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন, আর কেন দেখেন আমরা সবাই জানি। তারা সেই স্বপ্নই দেখেন, যা হলে পরে বেতনের চেয়ে বেশি প্রচুর উপরি অর্থ আর সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতা প্রাপ্তি হয়। খুব কি বেশি আগের কথা? আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন বোর্ডে স্ট্যান্ড করা শিক্ষার্থীরা শিক্ষক গবেষক হতে চাইতো। গত ৩০-৩৫ বছরে এর পরিবর্তন হতে হতে এখন চিত্র সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। আমি খুব খেয়াল করে দেখেছি। প্রতিবার বিসিএস ফল প্রকাশের পর যারা বিভিন্ন ক্যাডারে চাকরি পায় তাদের অভিনন্দনে কী ব্যাপক বৈষম্য। বিসিএস শিক্ষক ক্যাডারে কেউ চাকরি পেলে বুক ফুলিয়ে কেউ সহজে জানায়ও না আর কেউ মনে ভরে অভিনন্দনও দেয় না। বিসিএস শিক্ষা পেশাটা সবচেয়ে কম কাক্সিক্ষত। কারণ এই পেশার প্রমোশন বদলি ইত্যাদি সব কিছু তাদেরই মতো আরেক ক্যাডারের ওপর নির্ভশীল। তারা প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপ পায় না।

সরকার ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে জনপ্রশাসনে দক্ষতা বৃদ্ধিকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় প্রতিবছর প্রায় ৫০ জন সরকারি কর্মকর্তাদের জনগণের ট্যাক্স থেকে একেকজনকে কয়েক কোটি টাকার প্রধানমন্ত্রী ফেলোশিপ দিয়ে বিদেশে মাস্টার্স ও পিএইচডি করতে পাঠানো হয়। প্রথমত নিজের দেশের টাকায় অন্য দেশে এরকম গণহারে পিএইচডি করতে পাঠানো অনুচিত। তার বদলে এই টাকা দিয়ে নিজ দেশে শক্তিশালী পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু করা অধিকতর সাশ্রয়ী এবং দেশের জন্য মঙ্গলজনক। আর যদি পাঠাতেই হয় কাদের পাঠালে দেশ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে? শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকদের। বাংলাদেশের প্রায় সব সরকারি কলেজে এখন অনার্স-মাস্টার্স আছে যেখানে মাস্টার্স পাস শিক্ষকরা অনার্স-মাস্টার্স পড়াচ্ছে, যা একদম উচিত নয়। এই শিক্ষকরা পিএইচডি করলে এরা সেই পিএইচডি সর্বোচ্চ রিটার্ন দিতে পারবে। কারণ একজন পিএইচডিধারী ক্লাসে পড়ালে শত শত শিক্ষার্থী ৩০ বছর যাবৎ উপকৃত হবে।
টেকসই উন্নয়নের জন্য যদি পিএইচডি ডিগ্রিধারী সরকারি কর্মকর্তা দরকার হয় তাহলে বর্তমান বাংলাদেশের প্রচুর শিক্ষার্থী আছে যা বিদেশি ফেলোশিপের অধীনে পিএইচডি করেছে। তাদের সরাসরি নিয়োগের জন্য স্পেশাল বিসিএসের আয়োজন কেন করা হয় না? একই কথা খাটে শিক্ষা ক্যাডারের জন্য। আমাদের মেধাবীরা যারা নিজ যোগ্যতা প্রমাণ সাপেক্ষে বিদেশি ফেলোশিপ পেয়ে বিদেশে ভালো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেছে তাদের নিয়োগের বিশেষ ব্যবস্থা নিন। এর ফলে ব্রেইন ড্রেইনের পরিবর্তে ব্রেইন গেইন হবে। বিনা বিনিয়োগে দেশ পিএইচডি ডিগ্রীধারি শিক্ষক আমলা পাবে।

আমাদের সরকার কি দেখছে যে প্রতিবছর কতো শত শত ছেলেমেয়ে দেশের বাইরে নিজ যোগ্যতায় পিএইচডি করতে যাচ্ছে? তাদের অনেকেই দেশে ফিরে আসছে না এই ভয়ে যে দেশে আসলে চাকরি পাবে না। যাদের কেউ কেউ ফিরে আসলেও চাকরি না পায়ে আবার বিদেশে চলে যাচ্ছে নতুবা দেশে frustrated জীবন কাটাচ্ছে। ফলে অন্য যারা তাদের কথা জানে তারা আর ফিরে আসার কথা ভাবে না। আমাদের দেশের ট্যাক্সের টাকায় আমাদের তৈরি গ্রাজুয়েট হয়ে ইউরোপ আমেরিকা বিনা বিনিয়োগে এই মেধাবীদের পাচ্ছে। কী অপূরণীয় ক্ষতি কেউ কি বুঝতে পারছে? মনে রাখতে হবে যে শিক্ষকতা পেশাকে যতোদিন আদরনীয় করা না হবে ততোদিন কোন টেকসই উন্নয়ন সম্ভব না। লেখক : শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বাধিক পঠিত