প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্বপ্না রেজা: অভিনব কায়দায় সয়লাব মাদক এবং বিপন্ন তরুণ সমাজ

স্বপ্না রেজা: আজকের লেখাটি কটি ঘটনা দিয়ে শুরু করছি। ঘটনাগুলো বলে দিবে যে, কতটা ভয়ংকর পরিস্থিতিতে সমাজ এগুচ্ছে, সমাজের প্রকৃত চিত্রটাইবা কী। আমরা কতটা সফল কিংবা ব্যর্থ।

এক.
ওরা পাঁচজন হাসছিলো। হাতকড়া পরা। অথচ বিকার নেই। লজ্জা নেই। সব ছাপিয়ে সুদর্শন ও পরিপাটি। রূপ সচেতনই লেগেছে। বুক চওড়া করে ওরা হাঁটছিলো। পুলিশের পিকভ্যানে বসা ওদেরকে দেখে মনে হচ্ছিলো ওরা কোন ভ্রমনে বের হয়েছে। কিংবা যে ঘটনাটি ঘটে গেছে তার জন্য তারা যেন প্রস্তুতই ছিলো। ক্যামেরার সামনে ঠোঁটমাখা হাসিতে তারা যেন নতুন কোন বস্তুর সন্ধান দিয়েছে মানুষকে। বস্তুটির নাম এলএসডি। এই মাদক অনেকের কাছে নতুন শোনা। যারা জানতো না, তারা জেনে গেছে এক ধরনের মাদক আছে যার নাম এলএসডি। মিলিগ্রাম সেবন করলেই এর প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। চিন্তাশক্তি বাড়ায়। ঘুমালেও নাকি সেবনকারীরা অনেককিছু দেখতে পায়। অন্য মাদকের মতন এই মাদক সেবনকারীদের অগোছালো করে না। বরং শক্তি যোগায়। সম্ভবত সেই কারণে ক্যামেরার সামনে নায়কোচিত অভিব্যক্তি ছিলো তাদের। এলএসডি মাদকাসক্ত ও মাদক ব্যবসায়ের কারণে তাদের আটক করা হয়। জানা গেছে একটি প্রাইভেট বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও অভিজাত পরিবারের সন্তান ওরা। ওদের অভিব্যক্তি দেখে সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছিলেন, মাদক ব্যবহারের কারণে ওরা বেপরোয়া। বোধশক্তিহীন ও নির্লজ্জ্ব। সমাজের জন্য যা অশনি সংকেত। ওরা হাসছিলো ও কোনো বিকার ছিলো না বলেই হয়তো এমন কথা সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা বলছিলেন।

দুই.
এলএসডি পরপরই আরেক ধরনের মাদকের নাম শোনা গেলো। মাদকের নাম আইস। এখানেও অভিজাত পরিবারের সন্তানদের নাম উচ্চারিত হলো। ওরা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপিঠ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ও দামী বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। অভিজাত পরিবারের সন্তান তো বটেই। আইস সেবন ও ব্যবসার সাথে ওরা জড়িত।

তিন.
লাশবাহী এম্বুলেন্স। এ রকম পরিবহন রাস্তায় দেখলে জীবিতদের বুক কেঁপে ওঠে। মৃত্যুর ভয় জেগে ওঠে। এই রকম একটি লাশবাহী এম্বুলেন্সে মাদক বহন করা হচ্ছিলো। মরদেহ আকৃতির ভেতর ছিলো এই মাদক। কাফনে জড়িয়ে লাশের মতন করে মাদক বহন করা হচ্ছিলো লাশবাহী এম্বুলেন্সে। কারোর বুঝবার উপায় নেই যে, কাফনের ভেতর লাশ নয়, থরে থরে মাদক শুয়ে আছে।

চার.
ধানমন্ডির একটি রেস্তরার আড়ালে চলে সীসা বারের কার্যক্রম। একদিন সন্ধ্যারাতে আইন শৃংখলারক্ষাকারী বাহিনীর লোকদের দেখা গেলো বেশ কটি মাইক্রোবাস করে সীসা সেবনকারী ও রেস্তরার লোকদের ধরে নিয়ে যেতে। হুক্কার মতন বস্তু ধরা কারোর কারোর হাতে। সেবনকারীরা বয়সে তরুণ নরনারী। পোশাকআশাকে তারা অভিজাত পরিবারের। ঢাকা শহরের অভিজাত এলাকায় এ রকম বেশ কটি রেস্তরা আছে যেখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সীসা সেবন চলে।

পাঁচ.
বাসাবাড়ির আসবাবপত্র নিয়ে রাস্তায় ছুটছে ট্রাক। পুলিশ থামায়। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আলমারির পেছনের দিককার অংশ খুলে দেখে থরে থরে গাঁজার বান্ডেল। একজন নারী ও একজন পুরুষকে আটক করে পুলিশ। সম্প্রতি তেল বহনকারী লরীতে তেলের পরিবর্তে বস্তা বস্তা গাঁজা পরিবহন করা হচ্ছিলো। কারোর পক্ষে বিশ^াস করা সম্ভব নয় যে, এমন একটি পরিবহনে বস্তা বস্তা গাঁজা কেউ বহন করতে পারে। মাদক ব্যবসায়ীদের অভিনব চিন্তার এখানেই শেষ নয়। প্রাইভেট কারের গ্যাস সিলিন্ডারে হাজার হাজার ইয়াবা, মানুষের পেটে ইয়াবা এরকম অনেক ঘটনা প্রায় প্রত্যহ ঘটছে। হয়তো মাদক বহনের আরও অনেক অবিশ^াস্য কৌশল ভবিষ্যতে প্রকাশ পাবে।

উপরের ঘটনাগুলো বলে দেয় যে, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান জিরো টলারেন্স হয়তো তার ডিজিট পরিবর্তন করেছে বা শিথিল হয়েছে। কিংবা অভিযান টলারেন্স হয়েছে অথবা জিরো-তে দাঁড়িয়েছে। উঠতি বয়সের ছেলেমেয়ে, তরুণতরুণী এবং অভিজাত পরিবারের সন্তানেরা এলএসডি, আইস, সীসার মতন মাদকে আসক্ত হচ্ছে বেশি। আধুনিক মাদকের প্রবেশ ঘটছে দেশে এবং তা অভিনব কায়দা ও কৌশলে পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করেছে এই মাদক অবলীলায়। এইসব মাদক বাংলাদেশে তৈরি হয় না, আবাদও নয়। এসব আসে সীমান্ত দিয়ে। সীমান্তে দায়িত্বপ্রাপ্তরা আছেন এসব রোধ করবার জন্য এবং দেশকে সুরক্ষিত করবার জন্য। কিন্ত তারপরও মাদক ঢুকছে। হয় তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে নতুবা তাদেরকে ম্যানেজ করে এইসব মাদকের প্রবেশ ঘটে। আৎকে উঠতে হয় এই ভেবে যে, ঘটনা ঘটবার পর জানতে হচ্ছে কী সব ভয়ংকর মাদক তরুণ সমাজকে গ্রাস করছে। মেধাবী ছেলেমেয়েদের জীবন লন্ডভন্ড হচ্ছে কেবল নয়, দেশের ভবিষ্যত রুগ্ন হচ্ছে। কোথাও আগুন লাগলে, ভবন ধসে পড়লে আমরা যতটা আতংকিত হই তারচেয়েও কিন্তু ভয়াবহ আতংকের বিষয় এই মাদক। অথচ সত্য হলো, সমাজ আতংকিত হচ্ছে না। রাষ্ট্রের ঘুম হারাম হচ্ছে না। কী করে সীমান্ত দিয়ে এই সব মাদক প্রবেশ করছে, তার কোন জবাবদিহিতা নেই। দায় নেই। দায়িত্বপালনে ব্যর্থতার শাস্তি নেই। শুধু অভিযান আছে মাদক সেবনকারীর বিরুদ্ধে, ব্যবসার বিরুদ্ধে। যদিও এই অভিযান কতটা কার্যকর হতে পারছে তা নিয়ে জনমনে সংশয় আছে। কেননা এমনও দৃষ্টান্ত আছে যে, দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যের কেউ কেউ মাদক সেবনে ও ব্যবসায়ে জড়িত হয়ে পড়েছেন।

একটা সময়ে অভিযোগ ছিলো বস্তিতে মাদক সেবন, মাদক ব্যবসা হয়। অসামাজিক কার্যকলাপের আখড়া বস্তি। যেখানে নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস। এই অজুহাতে বস্তি উচ্ছেদ করা হতো, হচ্ছে। যা এখনো অব্যাহত। অথচ অভিজাত এলাকার এপার্টমেন্ট, হোটেল রেস্তরা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠান সয়লাব আধুনিক এই মাদকে। দৃশপট বলে যে, সমাজের কোন অংশই আর বাদ থাকছে না মাদকের ছোবল থেকে। বরং মাদক নিয়ন্ত্রণ এখন উচ্চবিত্তে, উচ্চ এবং প্রভাবশালী মহলে। আশংকা হয়, এক সময় হয়ত মাদক ব্যবহার ও ব্যবসার জন্য লাইসেন্স প্রদানের দাবী উঠবে। অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে বলে যুক্তিও দাঁড় করানো হবে। এটা সত্যি যে, যদি এমন ঘটনা কেউ দেখাতেন কিংবা এমন গল্প কেউ বলতেন যে, শত অভিযান ও চেষ্টা করেও মাদক উদ্ধার হয়নি, মাদকসেবনকারীকে পাওয়া যায়নি, তাহলে স্বস্তি পাওয়া যেত এই ভেবে যে, মাদকমুক্ত হচ্ছে সমাজ, মাদকমুক্ত হচ্ছে তরুণ সমাজ।

দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলে একটা অধিদপ্তর আছে। কোথাও মাদকের চালান ধরা পড়লে আইন শৃংখলারক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য শুনি, অধিপ্তরের কথা শুনতে পাই না। মাদক ‘নিয়ন্ত্রণ’ এ তাদের সফলতা, ব্যর্থতা কিংবা সুপারিশ দৃশ্যমান হতে দেখি না। যে মাদক অস্ত্রের চাইতেও বেশি ধারালো ও ধ্বংসকারী এবং একজন নয়, সমষ্টিকে ধ্বংস করে একজোটে, তাকে সহজলভ্য করে রাখা, সচল রাখা চরম আত্মঘাতী কিনা গোটা জাতির জন্য ভাবা দরকার। একটা জাতিকে ধ্বংস করবার জন্য অত্যাধুনিক অস্ত্র নয়, অত্যাধূনিক মাদক ও তার সরবরাহকারীরাই যথেষ্ট। আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি এদেরই পাওয়ার দরকার।
সম্প্রতি একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলছিলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি মাদক সেবনকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তার উদ্দেশ্যে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, যে ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়ায় মাদক তরুণ সমাজে পৌঁছে তাদের জীবনকে বিপন্ন করলো, এতে তো তাদের চরম শাস্তি হলো। হাতকড়া পড়িয়ে দ্বিতীয়বার শাস্তি দেবার চিন্তা কেনো ? বরং মাদক সরবরাহকারী, দায়িত্বপালনে ব্যর্থতাকারীদের ধরুন, যেন মাদক না পৌঁছায় তরুণ সমাজে !

স্বপ্না রেজা: কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত