প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রভাষ আমিন: সচ্ছলতা কি সাংবাদিকদের অপরাধ?

প্রভাষ আমিন: শুধু রোজিনা বলে নয়, বাংলাদেশে সাংবাদিকদের আয়, জীবনযাপন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় বিভ্রান্তি রয়েছে। অনেকের ধারণা সাংবাদিক হতে কোনো যোগ্যতা লাগে না। অন্য কোনো চাকরি না পেলে মানুষ অনন্যোপায় হয়ে সাংবাদিকতা করেন। তারা নিয়মিত বেতন পান না। এখনো অনেকে ভাড়া দিতে পারবেন কিনা, এই ভয়ে সাংবাদিকদের বাড়ি ভাড়া দেন না। অনেকেই চান, সাংবাদিকরা খেয়ে না খেয়ে কোনো রকমে টিকে থাকবে। ময়লা পাঞ্জাবি, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ, পায়ে ছেঁড়া চটি পরে ঘুরবে। যাদের এই ধারণা তারা এখনো ষাটের দশকে বাস করেন। জমানা বদলে গেছে। ৫০ বছর বয়সী বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ। অন্য সব খাতের মতো গণমাধ্যম খাতেও ব্যাপক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সব গণমাধ্যমের আর্থিক সক্ষমতা একই রকম নয়। অনেক প্রতিষ্ঠানে বেতন কম এবং অনিয়মিত। কিন্তু বাংলাদেশে পত্রিকা, টিভি, অনলাইন মিলিয়ে অন্তত ৩০টি প্রতিষ্ঠান আছে; যারা সাংবাদিকদের নিয়মিত ও ভালো বেতন দেয়। এক লাখ টাকার ওপরে বেতন পান দেশে এমন সাংবাদিক আছেন কয়েকশ। বেতন এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে ১০ লাখ টাকার আর্থিক সুবিধা পান এমন সম্পাদক আছেন একাধিক। এই টাকা কিন্তু মালিক পক্ষ দয়া করে দেন না। সাংবাদিকদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জন করতে হয়। অন্য সব চাকরিতে নির্ধারিত অফিস সময় আছে। কিন্তু সাংবাদিকদের কাজ করতে হয় সময়ের হিসাব না করেই। ঝড়-ঝঞ্ঝা-হরতাল-সাইক্লোন-করোনা-লকডাউন-কারফিউ পরিস্থিতি যাই সাংবাদিকদের কিন্তু কাজ করতে হয়। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা, এমনকি ঈদের দিনেও সাংবাদিকদের বিশ্রাম নেই।

সাংবাদিকরা সত্যিকার অর্থেই অতন্দ্র প্রহরী। কয়েক দিন আগে আমার এক ফেসবুক বন্ধু মেসেঞ্জারে কল দিলেন। আমি তাকে বললাম, গাড়ি চালাচ্ছি, পরে ফোন করবো। আমি গাড়ি চালাচ্ছি শুনে তিনি এমন বিস্ময় প্রকাশ করলেন, যেন আমি ব্যাংক ডাকাতি করেছি। অথচ আমি ২০ বছর ধরেই অফিসের দেওয়া গাড়ি সুবিধা পেয়ে আসছি। আর এই সুবিধাটা প্রথম পেয়েছিলাম প্রথম আলোর চিফ রিপোর্টার থাকার সময়। বছর বিশেক আগে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা সিনিয়র সাংবাদিকদের গাড়ি সুবিধা দিয়েছিলো। জুনিয়র সহকর্মীদের দেওয়া হয়েছিলো মোটরসাইকেল। তখনও প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের এই সিদ্ধান্ত সমাজে চমক সৃষ্টি করেছিলো। শুধু গাড়ির সুবিধা নয়; চালক, মেইনটেনেন্স এবং জ্বালানি খরচও দেওয়া হয় অফিস থেকেই। শুধু তা-ই নয়, টানা পাঁচ বছর প্রতিষ্ঠানে থাকলে সেই গাড়িটি একেবারেই দিয়ে দেওয়া হতো এবং তাকে আরেকটি নতুন গাড়ি দেওয়া হতো। প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের দেখানো পথ ধরে পরে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান সাংবাদিকদের গাড়ি সুবিধা দিয়েছিলো। সাংবাদিকরা গাড়ি চালায়, এটা শুনে যারা আকাশ থেকে পড়েন, সমস্যাটা তাদের, সাংবাদিকদের নয়। কোনো সাংবাদিকের ফ্ল্যাট আছে শুনলেই সবাই ধরে নেন, তিনি নিশ্চয়ই অসৎ। ফেসবুকে একজন কানাডার বেগমপাড়ায় আমার বাড়ির খবরও লিখেছেন। শুনতে ভালোই লাগে, আহা জীবনে যদি একবার কানাডায় যেতে পারতাম।

প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আপনাদের বলি, সাংবাদিকদের ফ্ল্যাট আছে শুনলেই আকাশ থেকে পড়বেন না। তাতে আপনার পা ভাঙবে। সাংবাদিকদেরও সংসার আছে, তাদেরও মাথা গোজার ঠাঁই লাগে। তিনি পরিবার নিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে থাকেন না। আমার নেই বটে, কিন্তু আমার সমসাময়িক অনেক সাংবাদিকেরই ঢাকায় নিজের ফ্ল্যাট আছে। অনেকের ফ্ল্যাট কেনার পেছনের গল্প এবং হিসাব আমি জানি। ২৫/৩০ বছর ভালো প্রতিষ্ঠানে কাজ করলে, নিয়মিত বেতন পেলে এবং একটু হিসাবী ও সঞ্চয়ী হলে একটা ফ্ল্যাট কেনা কঠিন কাজ নয়। অনেক ব্যাংকই ফ্ল্যাট কেনার জন্য লোন দেয়। অনেককে চিনি যারা কয়েকজন মিলে প্রথমে জমি কিনেছেন। পরে নিজেদের উদ্যোগে সেখানে ফ্ল্যাট বানিয়েছেন। তাতে বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে তারা ফ্ল্যাটের মালিক হতে পেরেছেন। আমার এক সহকর্মী গ্রামের জমি বিক্রি করে ঢাকায় ফ্ল্যাট কেনার পরিকল্পনা করছেন। কিন্তু সেই সাংবাদিক ফ্ল্যাট কিনেছেন শুনলেও কিন্তু আপনার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে।

ভাইয়েরা দৃষ্টিভঙ্গিটা একটু বদলান। আমি নিজে অত হিসাবি নই। কিন্তু এই পড়ন্ত বেলায় এসে হিসাবের গুরুত্বটা বুঝতে পারছি। তাই আমার কোনো সহকর্মীর সন্তান হওয়ার খবর, সঙ্গে মিষ্টি নিয়ে আমার কাছে এলেই আমি তাকে অন্তত এক হাজার টাকার হলেও একটি ডিপিএস খোলার পরামর্শ দিই। অনেক সময় জোর করে, নিজে সঙ্গে গিয়ে ডিপিএস খুলে দিই। আমার বিশ্বাস, সঞ্চয়ের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে ২০ বছর পর সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় বিদেশ পাঠানোর প্রাথমিক টাকাটা পেয়ে যাবে। কিন্তু সাংবাদিকের ছেলে কানাডায় পড়ছে, শুনলেই তো আপনি চেয়ার থেকে পড়ে যাবেন। সাংবাদিকের সবাই তো আর দরিদ্র পরিবারের সন্তান নয়। গ্রাম থেকে অনেকের নানা আয় আসে। অনেকে অল্প কিছু পুঁজি নিয়ে শেয়ারবাজারে খাটিয়ে বাড়তি আয়ের চেষ্টা করেন সংসারে সচ্ছলতা আনতে। নাঈমুল ইসলাম খানের মতো অনেক সাংবাদিক কিন্তু চাইলে স্রেফ টকশো করেই মাসে লাখ টাকা উপার্জন করতে পারেন।

এছাড়া লেখালেখি, কনসালট্যান্সি করেও সংসারে সচ্ছলতা আনার চেষ্টা করেন। আর কিছু করার নেই বলে মানুষ সাংবাদিকতা করে, এই ধারণাটাও বদলানোর সময় এসেছে কিন্তু। তারকা সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীন কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণি পাওয়া শিক্ষার্থী। কিছু দিন প্রথম আলোতে সাফল্যের সঙ্গে চাকরি করার পর মায়ের চাপে তিনি বিসিএস পরীক্ষায় বসেছিলেন। অনায়াসে বিসিএসে-এর সোনার হরিণ ধরাও দিয়েছিলো তার হাতে। কিছু দিন ম্যাজিস্ট্রেসি করে আবার ফিরে এসেছিলেন সাংবাদিকতায়। মাঝে কিছু দিন উঁচু বেতনের করপোরেট চাকরি করে আবার ফিরে এসেছেন সাংবাদিকতায়। আসলে সাংবাদিকতাটা নেশার মতো। একবার নেশায় পেয়ে বসলে ছাড়া কঠিন। দুইবার ছেড়ে আবার ফিরে আসা খালেদ বাংলাদেশ কাঁপিয়ে এখন বিশ^ কাঁপাচ্ছেন। খালেদের মতো অনেক মেধাবী, প্রথম শ্রেণি পাওয়া শিক্ষার্থীরাও কিন্তু এখন সাংবাদিকতায় আকৃষ্ট হচ্ছেন। কিন্তু সাংবাদিকতা এখন অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ চাকরি। যোগ্য না হলে, দক্ষ না হলে, টেকনোলজির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকে মাল্টি টাস্কিং করে তুলতে না পারলে এখানে টিকে থাকাই মুশকিল। লেখক :  হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত