প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ডা. লেলিন চৌধুরী: সাংবাদিক হেনস্তা, হাতকড়া এবং গণপ্রত্যাশা

ডা. লেলিন চৌধুরী: ঢাকার আদালতপাড়ার একটি দৃশ্য। একজন ‘আসামি’কে বিচারকের আদালতের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তার হাতে হাতকড়া, পেছনে শতাধিক সশস্ত্র পুলিশ। চারপাশের উৎসুক জনতা। কেউ কেউ উঁকি দিয়ে, আবার একটু উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখার চেষ্টা করছে এই ‘ভয়ংকর আসামি’কে। অবশেষে দেখা গেলো তার চেহারা। অত্যন্ত সজ্জন অবয়বের মানুষ। লিঙ্গ পরিচয়ে তিনি নারী। এদেশের প্রথমশ্রেণির একটি বাংলা দৈনিক প্রথম আলোর সিনিয়র রিপোর্টার।

গত কিছুদিন যাবৎ তিনি স্বাস্থ্য বিভাগের দুর্নীতি নিয়ে বেশ কয়েকটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেন। সে রিপোর্টগুলো পড়ে দেশের মানুষের পিলে চমকে যায়। সে-সব রিপোর্টে উল্লেখিত তথ্য-উপাত্তের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ তথ্যভিত্তিক কোনো প্রতিবাদে করেননি। ১৭ মে দুপুরবেলা পেশাগত কাজে তিনি সচিবালয়ে যান। স্বাস্থ্য সচিবালয়ে রোজিনা অতি পরিচিত মুখ। তখন ঘড়ির কাঁটা তিনটার ঘর অতিক্রম করেছে। তিনি স্বাস্থ্যসচিবের কক্ষের সম্মুখে যান। সেসময় সচিব কক্ষে ছিলেন না। সচিবের স্টাফগণ রোজিনাকে সচিবের কক্ষে বসার ব্যবস্থা করেন। কয়েক মিনিট পর বেশ কয়েকজন স্টাফ কক্ষে প্রবেশ করে রোজিনাকে আটক করে। অভিযোগ করা হয় রোজিনা রাষ্ট্রীয় গোপনীয় কিছু নথি চুরি করেছে এবং কিছু নথির ছবি তুলেছে। এরপর তারা রোজিনা ইসলামকে পাঁচঘণ্টার বেশি সময় সচিবের ব্যক্তিগত সহকারীর কক্ষে আটকে রাখে। সেখানে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। রোজিনা অসুস্থ হয়ে পড়েন।

রাত আটটায় হাসপাতালে পাঠানোর নাম করে তাকে শাহবাগ থানায় পাঠানো হয়। সেসময় একজন উপসচিবের স্বাক্ষর করা ফরোয়ার্ডিং লেটার পুলিশকে দেওয়া হয়। শাহবাগ থানায় রোজিনাকে আটক রাখা হয়। রাত বারোটার দিকে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষকে রোজিনার বিরুদ্ধে মামলা করার কথা জানানো হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, রোজিনা ইসলামকে শারীরিকভাবে নির্যাতন বা হেনস্তা করা হয়নি। এদিকে ফেসবুকসহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রোজিনাকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করার ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটি ছবিতে দেখা যায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন নারী কর্মকর্তা একহাতে রোজিনার গলা চেপে ধরেছে। রিপোর্টারের দুচোখ ভরা আতঙ্ক, তিনি পেছনে সরে গিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। ‘মস্তিষ্ক-বন্ধক’ রাখা মানুষ ব্যতীত কেউ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথায় আস্থা স্থাপন করেনি।

নানা সংবাদমাধ্যম সূত্রে আমরা জেনেছি, রোজিনার মোবাইলে করোনার টিকা নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে সরকারের করা চুক্তির ছবি পাওয়া গিয়েছে। এরকম একটি চুক্তিতে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার কিছু থাকে কি ? সাধারণত এ ধরনের চুক্তির বিস্তারিত সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়ে থাকে। এপ্রসঙ্গে প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক সাজ্জাদ শরীফ বিবিসিকে জানিয়েছেন, ‘সম্প্রতি রোজিনা ইসলাম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন নিয়োগ, টিকা নিয়ে অব্যবস্থাপনা এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে, সে প্রতিবেদনগুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছিলো। সেই আক্রোশ থেকে তাকে সচিবালয়ে ৫ ঘণ্টার বেশি আটকে রেখে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’ দুপুর তিনটার পর রোজিনাকে স্বাস্থ্যসচিবের স্টাফরা আটকে করে এবং পুলিশের হাতে তুলে দেয় রাত আটটার পরে। মাঝখানের পাঁচ ঘণ্টাধিক সময়কাল কোনো আইনি অধিকারে তাকে আটক রাখা হয়, নির্যাতন করা হয়? এসব বিষয় বিবেচনা করে সাধারণ মানুষের অধিকাংশই জনাব সাজ্জাদ শরীফের সঙ্গে একমত পোষণ করে।
রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে (১৮৬০সালে প্রণীত) দণ্ডবিধির ৩৭৯ ও ৪১১ ধারায় এবং ১৯২৩ সালে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ৩ ও ৫ ধারায় রাষ্ট্রীয় গোপন নথি সরানো ও অনুমতি না নিয়ে ছবি তোলার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। বাংলাদেশের সমস্ত আইনের উৎস হচ্ছে দেশের সংবিধান। এজন্য ব্রিটিশ আমলে প্রণীত দণ্ডবিধির চলমান ধারাগুলোর ব্যাখ্যা হতে হবে আমাদের সংবিধানভিত্তিক। এই মৌলিক বিষয়টি এখনো অনেকে অনুধাবন করতে অসমর্থ। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি খোলাসা করা এখন সময়ের দাবি।

বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রের অপরিহার্য অঙ্গ হচ্ছে গণমাধ্যম। গণমাধ্যমকর্মীরা হচ্ছে দেশের নাগরিকদের চোখ ও কান। নাগরিকদের হয়ে এই ‘চোখ এবং কান’-গণ দেশ ও বিশ্বের প্রণিধানযোগ্য বিষয়গুলো তুলে এনে সংবাদ হিসাবে পরিবেশন করে। তাই এদের হাতে হাতকড়া লাগানোর ঘটনা জনমনে প্রবল অভিঘাত তৈরি করে। বিশেষ করে অভিযোগটি যদি ‘আক্রোশজাত অথবা ষড়যন্ত্রমূলক’ বলে সাধারণ মানুষের মনে হয় তাহলে বিষয়টি আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠে। আমরা প্রায়ই দেখি আমলাদের অপকর্মজনিত কাদা রাজনৈতিক সরকারের গায়ে লাগানোর চেষ্টা করা হয়। এক্ষেত্রে দেশের নাগরিকদের প্রত্যাশা সরকার গণপ্রত্যাশার কথা বিবেচনায় রেখেই একজন গণমাধ্যমকর্মীকে হাতকড়া পরানোর বিষয়টিকে আমলে নিবে। পুরো ব্যাপারটিতে অসদ্দুদ্দেশ্যে দেশবাসীর স্বার্থবিরোধী কাজকর্ম যারা করেছে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা জরুরি।

রোজিনা ইসলামের বেশ কয়েকটি প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সংগঠিত অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির বিষয় উঠে এসেছে। এগুলো তদন্ত হওয়া দরকার। তাই গণপ্রত্যাশা হচ্ছে- একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে এইসব দুর্নীতির তদন্ত করা হোক এবং তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের নিশ্চয়তা বিধান করা হোক। কেবলমাত্র ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই অন্যায়ের চূড়ান্ত প্রতিকার সাধিত হয়।
লেখক : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত