প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: আহারে হেফাজত! এখন হেফাজত কেনো, ইন্ডিয়ার টিকা নিয়ে লেখেন না?

দীপক চৌধুরী: হেফাজতের তাণ্ডব-ত্রাস, হত্যা-লুণ্ঠন, উগ্রবাদের কথাগুলো ভুলে গিয়ে যারা হেফাজত ‘গেলো গেলো’ বলে চিৎকার করছেন তারা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের শত্রু। নির্বাচিত সরকারকে যারা উৎখাতের হুমকি দিয়েছিল সেই হেফাজতীদের ক্ষমতার উৎস কী শুধু ধর্মীয় মিথ্যাচার? না, তাদের সঙ্গে যুক্ত এদেশের একাধিক রাজনৈতিক দল। যারা একদা ক্ষমতায় ছিল এবং পুনরায় এই স্বাধীন বাংলাদেশকে পাকিস্তানের আদর্শে নিয়ে যেতে সাম্প্রদায়িক হেফাজত নেতাদের উল্লাসকে সমর্থন দিয়েছিল তাদের আমরা চিনি। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে, ফেসবুকেও চলাচল করেছে হেফাজত নেতা মামুনুল হকের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য। ধর্মের অস্ত্র ব্যবহার যেখানে হেফাজতীদের প্রধান কৌশল সেখানে কী কোনো গ্যারান্টি আছে যে, সেই হেফাজতীরা আবার অশান্ত করে তুলবে না অদম্য বাংলাদেশকে। সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো এক জোট হয়ে এখন দাঁতেদাঁত চেপে আছে। সুযোগ পেলেই রাক্ষুসে কামড় বসাবে। ইদানিং পরিচিতদের অনেকেই অভিযোগ আকারে আমাকে বলে থাকেন, ‘লেখক হিসেবে বলতে চাই যে, আপনি এখনো শুধু হেফাজত নিয়েই পড়ে আছেন। হেফাজত তো শেষ। এখন ওরা কলেরা-নিমুনিয়ায় আক্রান্ত।’

‘মানে?’ আমি অবাক চোখে তাকাই।
‘দেখতেছেন না?’
আমার চোখ-মুখ ও শক্তচোয়াল দেখে তারা নরম কণ্ঠে উচ্চারণ করেন, ‘আপনি তো সবই বোঝেন? আহারে হেফাজত, হেফাজতের ছায়াগুলো!

হেফাজতী বিষয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখায় তারা যে তীব্র মনোকষ্টে আছেন তা বুঝি। আমি বিস্মিত হই, বলছে কী? কাউকে কাউকে জবাব দিই, ‘মোটেও কথা সত্য নয়। হেফাজত এখন খোঁস-পাঁচড়ায় আক্রান্ত। কাঁচা হলুদ আর নিমপাতায় এটা সারে। কাঁচা হলুদ আর গুঁড় খেলেই উপকার হয়।’ পাল্টা প্রশ্ন তাদের, ‘কী যে বলেন? ইন্ডিয়ায় করোনার টিকা (ভ্যাকসিন) দিচ্ছে না- এটা নিয়ে কিছু লিখেন, আমরা তো শেষ হয়ে যাচ্ছি।’ আমি বিস্মিত হই, কারণ ওদের ভালো করেই চিনি। যাঁর ভাষণে জেগে উঠেছিল বাঙালি সেই জাতির পিতার ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলেছিল। হেফাজতের পথ্য ও প্রস্তুত প্রণালি বাংলাদেশের মানুষ বহুবার দেখেছে। ওরা যে কতটা সাম্প্রদায়িক। একসময় মানে কয়েকমাস আগেও ওরা প্রশ্ন তুলেছিল, ‘সরকার ইন্ডিয়ান টিকা আনবে নাকি? ইন্ডিয়া টিকার ভিতর কী থেকে কী দিয়া দেয় আমাদেরকে?’
সম্ভবত এখন আমরা যারা বুঝি তারা অনেকেই আর বিস্মিত হই না। কারণ, ২০১৩ সালের ৫ মে অর্থাৎ আট বছর আগে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ-সহিংসতায় ব্যাপক আলোচনায় এসেছিল হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সড়কের আইল্যান্ডে বা ডিভাইডারে থাকা গাছগুলো তছনছ করেছিল। মতিঝিল-দিলকুশায় যেন ‘উন্মত্ত ধর্ষণ’ চলেছিল। কর্তব্যরত পুলিশ ছিল অসহায়। তখন লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ ছিল। এরমধ্যে বিএনপি-জাপার সমর্থন। কী এক দুঃসহ দিন-রাত ছিল সেটি। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদেরও প্রাণ গেছে। পুলিশ-র‌্যাবকে জীবনবাজি রেখে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। বর্তমান আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ তখন ঢাকার পুলিশ কমিশনার ছিলেন। অসাধারণ মেধাবী মানুষ। তিনি, ডিএমপি সদস্য, গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা শেষপর্যন্ত একযোগে অপারেশন চালান। সেই ভয়ংকর তাণ্ডব-ত্রাস সরাতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ সফল হয়। এরপর আমরা দেখলাম গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাতে হুঙ্কারদাতা, ত্রাসসৃষ্টিকারীদের ব্যাপক ধরপাকড়। এদের গ্রেপ্তার। পুলিশ রিমান্ড। হেফাজত নেতা জুনায়েদ বাবুনগরী দফায় দফায় রিমান্ডে ছিলেন। তিনি হেফাজতের অপকর্ম-উদ্দেশ্যসহ সবকিছু স্বীকার করেন পুলিশের কাছে। এরপর কেউ কি ভেবেছিল যে, হেফাজত আবার ত্রাস-তাণ্ডব সৃষ্টি পারে? কিন্তু আট বছর পর গত ২৬ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত কিনা হয়ে গেলো দেশে!

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী , স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের কথাবার্তায় এখন প্রায় পরিষ্কার যে, কওমি মাদ্রাসা এবং হেফাজতকে নিয়ন্ত্রণ করবে না সরকার। সাম্প্রতিক কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, এটা সরকারের অবস্থান। অন্যদিকে গ্রেপ্তার আর পৃুলিশ রিমান্ডে একশ্রেণির হেফাজত নেতার ঘৃণ্যকাজের ফিরিস্তি প্রকাশ হচ্ছে। নারীকে পণ্যের মতো সীমিত পরিসরে বিয়ে করতে দেখছি। নারী ধর্ষণ, ব্ল্যাকমেইল মামলায় গ্রেপ্তার হচ্ছে হেফাজত নেতা। এখন সুন্দর আর ভালো কথা বলে হেফাজত যে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে না এটা কেউ কী বলতে পারে? কওমি মাদ্রাসায় কোনো রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠন থাকতে পারবে না- এটা কী আমরা নিশ্চিত হতে পারি!
কয়েকদিন আগে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেছেন, মতিঝিলে শাপলা চত্বরে হেফাজতের তাণ্ডব ‘অনেক বড় ঘটনা’, সে কারণে তদন্তে সময় লাগছে তাদের। আরেক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, কোনো ছাড় নেই। দেশকে অস্থিতিশীল করতে হাটহাজারীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হেফাজতে ইসলাম সহিংসতা চালিয়েছে। এর সঙ্গে জড়িতদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না- সম্প্রতি এমনটাই বলেছেন চট্টাগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) এস এম রশিদুল হক। কিন্তু এটা সত্য, মানুষ এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে। সুতরাং আমরা কথায় নয় কাজে বড় দেখতে চাই। কবি কুসুমকুমারী দাশের মতো বলতে চাই, “আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।”

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, দেশবিরোধী সব রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করবে। এক অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, মুজিব শতবর্ষ পালন করছি, তখন ২৬ থেকে ২৮ মার্চ সারা দেশে হেফাজতের ব্যানারে তাণ্ডব চালানো হলেও এতে অংশগ্রহণ ছিল বিএনপি-জামায়াতের। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে মাঝেমধ্যে তারা দেখা করেন। কিন্তু দেখাসাক্ষাতের কারণে দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ব্যাহত হবে না। কারণ, দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা বদ্ধপরিকর।’ আওয়ামী লীগনেতার এমন কথার ওপর মানুষের বিশ^াস আরো সুদৃঢ় হবে যখন কাজে আর বাস্তবতায় মিল থাকবে। এ মুহূর্তে মামলা, গ্রেপ্তার এবং সরকারি মহলের নানামুখী চাপে বেশ কোণঠাসা অবস্থায় পড়েছে হেফাজতে ইসলাম- আজ যারা এমন কথা বলেন তারা কারা এটাও জানা দরকার। কমিটি বিলুপ্তির পর সংগঠনের কার্যক্রম বন্ধ বলা হচ্ছে। এটাও কতখানি ঠিক? শোনা যায়, গোপনে কাজ চলছে। হেফাজতের নেতৃত্ব এবং এর ভবিষ্যৎ কী, তা নিয়ে নানা রকম আলোচনা ও বিশ্লেষণ চলাচ্ছেন একশ্রেণির সুবিধাবাদীরা।

হেফাজত অদূর ভবিষ্যতে থামবে না যদি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার স্যদস্যরা কঠিন না হন। কারণ, এটা কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ধর্মীয় গোষ্ঠীর তৎপরতা। ইতিহাস বলছে যে, বা ধারণা পাওয়া যায়, হেফাজত থেমে গেলে ভবিষ্যতে নতুন কোনো ইস্যুতে অন্য নামে সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বলে রাখা চাই, হেফাজত কখনো চরিত্র বদলায়নি।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত