প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ম ইনামুল হক: মমতা ব্যানার্জির সামনে জরুরি কিছু কাজ

ইনামুল হক: আমার লেখা ‘বৃহত্তর বাংলার ইতিহাস পরিচয়’ শীর্ষক বইটি ২০০১ সালে যখন বের হয়, তখন সেই বইটির শেষের অংশে লিখেছিলাম, পশ্চিম বঙ্গের নেতা হিসেবে মমতা বন্দোপাধ্যায় উঠে আসছেন। মমতা তখন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী। কিন্তু মমতা নাকি একেবারেই সাধারণ ঘরের মেয়ে। ভারতীয় সমাজ এমন যে, এর উচ্চ স্তরের মানুষরা সাধারণ মানুষদের ব্যবহার করবে কিন্তু উঠতে দেবে না। ১৯৯১ সালে তিনি দক্ষিণ কলকাতা থেকে লোকসভা সদস্য হন। নরসিমহা রাও মন্ত্রী সভায় তিনি মানব সম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী হলেন, কিন্তু কংগ্রেস নেহেরু পরিবারের দখলে গেলে মমতা তার কাক্সিক্ষত মর্যাদা পেলেন না। ১৯৯৮ সালে তিনি তৃণমূল কংগ্রেস দল গড়লেন। সাধারণ মানুষদের এই দলে তার একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো। মমতা স্বভাবে চরিত্রে একজন সাম্যবাদী কিন্তু তিনি এরপর উচ্চাভিলাষী হলেন। ক্ষমতার রাজনীতিতে নীতি চলে না। মমতা সাম্প্রদায়িক বিজেপির সঙ্গে হাত মেলালেন এবং কেন্দ্রে রেলমন্ত্রী হলেন। ২০০১ সালে তিনি বিজেপি ছেড়ে আবার কংগ্রেসের সঙ্গে আঁতাত করলেন এবং পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন করলেন। ২০০৩ সালে তিনি আবার বিজেপির কাছে ফিরে গেলেন ও কেন্দ্রে কয়লামন্ত্রী হলেন। ২০০৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি জোট ক্ষমতা হারায়, কিন্তু মমতা দক্ষিণ কলকাতা কেন্দ্রটি ধরে রাখেন। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে মমতা আবার কংগ্রেসের সাথে জোট বাঁধেন এবং জিতে আবার কেন্দ্রে রেলমন্ত্রী হন। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা কংগ্রেসের সাথে জোট বেঁধে পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টির মধ্যে ১৮৫ টি আসন পান। মমতা মুখ্যমন্ত্রী হন।

২০১৬ সালের বিধান সভা নির্বাচনে মমতার দল একাই ২১১টি আসন পেয়ে জয়ী হয়। গুজরাটের দাঙ্গা অভিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িক দল বিজেপি ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হয় ও নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হন। ২০১৯ সালে তার নেতৃত্বে বিজেপি পুনরায় কেন্দ্রে জয়ী হয়। তবে ২০২০ নাগাদ বিজেপি অনেকগুলো রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে হেরে যায়। ক্ষমতায় টিকে থাকার লক্ষ্যে বিজেপি ২০২১ সালে বাংলার বিধান সভা নির্বাচনে জয়ী হবার কঠিন পরিকল্পনা করে। নির্বাচনে ভোটদান প্রক্রিয়াকে মার্চ-এপ্রিল মাসে ৮টি পর্যায়ে ভাগ করা হয়। নরেন্দ্র মোদী প্রায় প্রতিদিন সরকারি প্লেনে দিল্লি থেকে এসে কেন্দ্রীয় ও অন্য রাজ্যের মন্ত্রীদের নিয়ে নির্বাচনকে প্রভাবিত করেন। কিন্তু বিজেপি রাজ্যজয় করতে পারেনি। বিগত একশ বছর ধরে বাংলার ওপর কব্জা জমানোর লক্ষ্যে গুজরাটি, মারাঠি ও হিন্দুস্তানি শক্তিরা চেষ্টা চালিয়ে আসছে। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা বাঁধিয়ে তারা বাংলাকে পাকিস্তান হিন্দুস্তানের মধ্যে ভাগ করে নেয়। প্রায় একশ বছর পর যখন বাংলা তথা পূর্বদেশ অঞ্চলের মানুষ এই ত্রিমুখী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়িয়েছে তখন বাংলা থেকে মমতার মতো এক দৃঢ় চরিত্রের নেত্রীর প্রয়োজন ছিলো। মমতা এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলে এই নির্বাচন হয়ে গেলো মমতা এবং তৃণমূল বনাম এই তিন আগ্রাসী শক্তির লড়াই। মমতা ২০২১ সালের নির্বাচনে এক দারুণ কাজ করেছেন।

তিনি তার নিশ্চিত আসনে না দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েছেন নন্দীগ্রাম আসনে। যেখানে তিনি বিতর্কিত এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির তুখোড় পাণ্ডা শুভেন্দু অধিকারী। এদিকে বিজেপি আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে কমিউনিস্টদের ভোটে। এছাড়া তৃণমূলের মুসলিম ভোট কাটার লক্ষ্যে তারা বাংলায় কংগ্রেস ও আব্বাস ভাইজানের আইএসএফ সঙ্গে কমিউনিস্টদের জোট করে ও নন্দীগ্রামে মীনাক্ষী মুখার্জি নামে এক তরুণীকে কমউনিস্ট প্রার্থী দাঁড় করায়। কিন্তু এবারের নির্বাচনে কংগ্রেস ভোটাররা তৃণমূলে এবং কমউনিস্ট ভোটাররা বিজেপিকে ভোট দেয়। তৃণমূলের মুসলিম ভোটাররা দল ছাড়েনি। ফলে  তৃণমূল বিপুলভাবে জয়ী হয়েছে, কিন্তু কমউনিস্ট ও কংগ্রেস একটা সিটও পায়নি। মমতা আবার ক্ষমতায় এলেন তাই নয়, বাংলার আশা ভরসা হয়ে এলেন। একশ বছর পর অধিকাংশ হিন্দু মুসলিম বাঙালি সাম্প্রদায়িকতা ত্যাগ করে এবার এক হয়েছে। এই পরিবর্তন সাম্প্রদায়িক বাঙালিদের মন ঘোরাতে কাজ করবে।

এমুহূর্তে মমতার জরুরি কাজ হবে :

[১] বাংলার কমিউনিস্ট ও মূলনিবাসীরা এবার বিপুল সংখ্যক তরুণ তরুণীকে ভোটে দাঁড় করায়। তারা সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের চেয়ে কম হ্যান্ডসাম বা কম সুন্দরী নয়। তাদের মধ্যে বাংলার ভবিষ্যৎ নেতা-নেত্রী আছে। আপনি এখন বাংলার অভিভাবক। আপনি তাদের কাছে ডাকুন, তারা যে দলেই থাকুক উৎসাহ দিন। আব্বাস ভাইজানকে নয়। সে আপনাকে উৎখাত করতে চেয়েছিল। তাকে বরং ভবিষ্যৎ বিরোধী নেতা হয়ে আসতে দিন। শুভেন্দু সুবিধাবাদী।

[২] আপনি এখন বাংলার অভিভাবক। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিরও অভিভাবক। আপনি কলকাতায় হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় করতে চেয়েছেন। এর চেয়েও জরুরি বিহারের দ্বারবঙ্গে, ভাগলপুরে এবং ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় করা। বিহার ও ঝাড়খণ্ডের ৩০ শতাংশ বাঙালি অবহেলা ও হেনস্থায় নিষ্পেষিত। আপনি সম্ভব হলে বাংলার বাজেট নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ান।

[৩] ভারতের চারটি অঞ্চলের জন্য চারটি রাজধানী ঘোষণা করার আপনার প্রস্তাব আপনি চালিয়ে যান। এই চারটি রাজধানী দিল্লি, কলকাতা, বোম্বাই এবং বাঙ্গালোর। কলকাতাকে পূর্বদেশ অঞ্চলের সকল ভাষার, সকল জাতির, সকল ধর্মের মিলন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলুন।

[৪] বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার জল ব্যবহার চুক্তি সম্পাদন করুন। আপনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত জল টেনে নিয়ে ডাহুক নদে ছেড়ে দিচ্ছেন। আপনি বাংলাদেশের মানুষকে নায্যতা থেকে বঞ্চিত করে ফুলহার নদ দিয়ে সেই জল বিহারের মানুষকে দিচ্ছেন। অন্যায় হচ্ছে।

[৫] আসামের অভিবাসী বাঙালিদের পাশে দাঁড়ান। তারা দেশ ভাগের বলি। বাংলা বিহার আসাম থেকে ৮০ লাখ মুসলমান ও ৯০ লাখ হিন্দু দেশ ভাগের কারণে তাদের ভিটে ছাড়তে বাধ্য হয়। ভারতের বলবৎ আইনেই তাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন। লেখক : প্রকৌশলী, পূর্বদেশ প্রবক্তা ও আহবায়ক সর্বজন বিপ্লবী দল, ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত