প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জায়েদুল আহসান পিন্টু: আওয়ামী লীগ ও হেফাজত

জায়েদুল আহসান পিন্টু: আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনপ্রিয় অভিযোগ রয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া এই দলটি সরকারে থেকে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের কথা বলে হেফাজতের মত একটি মৌলবাদী সংগঠনকে দুধকলা দিয়ে পুষেছে। গত কয়েক বছরের কর্মকান্ড অবশ্য এই অভিযোগকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে হেফাজতের এই অলিখিত গোপন ও দুর্বল সমঝোতার পেছনে যেসব কারণ কাজ করেছে বলে মনে করা হয় সেগুলোও আলোচনায় আসা প্রয়োজন। ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে একের পর এক যেসব বিষয় আওয়ামী লীগকে মোকাবেলা করতে হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম: ১. বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফাঁসি কার্যকরের পর পলাতক খুনিদের অব্যাহত ষড়যন্ত্র। ২. বিডিআর বিদ্রোহ ৩. যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরুর পর জামাতিদের তান্ডব। ৪. বিএনপির পেট্রল বোমা আন্দোলন ও ৫. ৫মে’র শাপলা চত্বরে হেফাজতিদের তান্ডব।

আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরপরই একের পর এক প্রতিকূল অবস্থা মোকাবেলা করতে করতে যখন দেখে তাদের সামনে হেফাজতের মত আরেকটি সংগঠন দিনভর রাজধানীতে তান্ডব চালালো, আর সেখানে বিএনপি জাতীয় পার্টি ও জামাতে ইসলামী প্রত্যক্ষ সমর্থন দিল তখন তাদের নীতি নির্ধারকদের মধ্যে বিরাট পরিবর্তন আসলো। তারা মনে করল, যতদিন ক্ষমতায় থাকবে ততদিন বিএনপি, যুদ্ধাপরাধীদের দোসর, জামাত শিবির ও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মোকাবেলা করেই যেতে হবে। এর সঙ্গে হেফাজতিদের মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ তাদের কথায় লাখ লাখ নাদান বুঝে না বুঝে রাস্তায় নেমে যায়। তাই আওয়ামী লীগ নতুন উইন্ডো খুলতে দিতে রাজী নয়। তারা মনে করল বিএনপিকে পিটিয়ে ঘরে তুলে দিয়ে হেফাজতিদের সাথে একটা সমঝোতা করে তাদের শান্ত রাখাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

পাশাপাশি গত বেশ কছর ধরে দেশে মানুষের ইসলাম ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। নাইন ইলেভেন, ওয়ার অন টেরর বা অন্য যেসব কারণেই হোক না কেন বাস্তবতা হলো ইসলাম ধর্মের প্রতি ‘অনুভূতি’ প্রখর হয়েছে। আওয়ামী লীগ মনে করেছে ইসলামপন্থীদের একেবারে অগ্রাহ্য করা বোকামি হবে।
একারণেই আওয়ামী লীগ শাপলা চত্বরের দোষীদের বিচার করেনি, হেফাজতিদের জায়গা জমি দিয়েছে, কওমী মাদ্রাসা থেকে দেওয়া সর্বোচ্চ ডিগ্রিকে স্নাতকোত্তরের সমমর্যাদা দিয়েছে, তাদের দাবির মূখে পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন এনেছে। তারা মনে করেছে জামাতিদে বিকল্প হিসেবে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ইসলামপন্থিদের নেতৃত্ব দিবে আর আওয়ামী লীগ শান্তিতে থাকবে।

এ ধরনের সমঝোতায় দুপক্ষই উইন উইন সিচুয়েশন ভেবেছিল। কারণ ২০১৩ এরপর হেফাজতের কোন তান্ডব সরকারকে মোকাবেলা করতে হয়নি, আর হেফাজতও তাদের দাবি দাওয়াগুলোর কিছু কিছু আদায় করে নিতে পেরেছিল।

কিন্তু পাশা উল্টে যায় হেফাজতের আমির আহমদ শফির মৃত্যুতে। তার মৃত্যুর পর হেফাজতের ভেতর ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপরি বদলে যায়। তারা বিএনপি জামাতের দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে পড়ে। নতুন কমিটিতে বিএনপি জামাত ঘরানার লোকজনের আধিক্য বেড়ে যায়। ১৫১ সদস্যের কমিটিতে ৮৫ জন কোন না কোন রাজনৈতিক দলের নেতা। তাদের অধিকাংশই ২০ দলীয় জোটের অর্ন্তভুক্ত। এছাড়াও জামাতের ৮জন আছে কমিটিতে। আর নতুন আমির জুনায়েদ বাবুনগরীর সাথে জামাত-বিএনপির যোগাযোগ পুরানো। সব মিলিয়ে হেফাজতের বাতিল হওয়া ওই কমিটি ছিল মূলত ২০ দলীয় জোটের একরকম এক্সটেনশন। আর এ কারণেই দেখা গেছে বিএনপি মহাসচিব হেফাজতের ওপর ক্র্যাকডাউনে বাবুনগরীর আগেই ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। বিএনপির সাথে ইসলামী দলগুলোর সখ্যতাও অনেক পুরানো। ২০০৬ সালেই খালেদা জিয়া কওমীর সনদের স্বীকৃতি দিবেন বলেছিলেন। ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ায় বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি।
হেফাজতে ইসলামের উত্থানে বিএনপি সহায়তা করেছে ঠিকই কিন্তু আওয়ামী লীগ বিএনপির বলয় থেকে তাদের বের করে আনতে বা নিদেনপক্ষে নিউট্রাল করে রাখার জন্য মাথায় হাত বুলিয়েছে এটাও ঠিক। আওয়ামী লীগ হয়তো ভেবেছে ২০১৩’র পর তারা যখন জামাতকে পিটিয়ে ঘরে তুলে দিল তখন স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধীর অভিযোগমুক্ত একটি ইসলামী প্ল্যাটফরমকে পাশে রাখতে পারলে অনভূতিওয়ালারা কোন বিরক্ত করবে না।

কিন্তু সুযোগ পেলেই যে হেফাজত আবার আগের জায়গায় ফেরৎ যাবে সেটা হয়তো আওয়ামী লীগ হিসেবে ভুল করেছে বা বুঝে থাকলেও খেলা হাতের বাইরে চলে গিয়েছিল। কারণ যে উদ্দেশ্যেই হেফাজতে ইসলাম গঠন করা হোক না কেন, এটি আসলে একটি রাজনৈতিক দল রূপ নিয়েছে অনেকে আগেই। তাদের আচার আচরণ কর্মসূচী সবই রাজনৈতিক হবে এটা স্বাভাবিক।

আর যখনই হেফাজতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হলো তখন তাদের সুর নরম হতে থাকল, কেন্দ্রীয় কমিটি বাতিল করা হল, কওমী মাদ্রাসা রাজনীতিমুক্ত করার ঘোষণা এলো। হয়তো সরকারের চাপে হেফাজত পিঠ বাঁচাতে নতুন কমিটি করবে এবং সরকারকে বোঝাবে যে নতুন কমিটিতে রাজনীতির সাথে যুক্ত কাউকে রাখা হবে না।

আওয়ামী লীগ কি হেফাজতের নতুন কৌশলে সন্তুষ্ট হয়ে যাবে? তারা কি ১৪-১৫ হাজার মাদ্রাসার ১৪-১৫ লাখ শিক্ষার্থীর কথা ভেবে আবার পুরানো খেলা খেলবে? নাকি উদারনৈতিক মূল্যবোধ ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার ওপর আঘাতকারিদের রাজনৈতিক কর্মসূচী দিয়ে মোকাবেলা করবে? ক্ষমতাসীনদলের নীতিনির্ধারকরা কোন দিকে যাবেন?

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত