প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর এখনই সময়!

একবার কল্পনা করুন তো আপনার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, দমবন্ধ হয়ে আসছে, মৃত্যু আসন্ন। তাই নিকটতম কোন হাসপাতালে আপনি চিকিৎসা নিতে গেলেন, হাসপাতালও আপনাকে চিকিৎসা দিতে প্রস্তুত, কিন্তু কোন চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী বা ষ্টাফ হাসপাতালে নেই। কারণ তাদের অনেকেই ইতিমধ্যে মারা গিয়েছেন, বাকীরা সবাই করোনা আক্রান্ত কিংবা জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। এখন আপনি কি করবেন? কল্পনার এই সত্যিটা আসলেই নির্মম। আমরা প্রত্যেকেই কি শ্বাসরুদ্ধকর এই নির্মম সত্যের দিকেই হাঁটছি না!

আমি যখন এই লেখাটা লিখছি তখন পর্যন্ত ১৫০ জন চিকিৎসক মৃত্যুবরণ করলেন, প্রতিদিনই মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। মানহীন সুরক্ষা সামগ্রী তাঁদের বাঁচাবে না তাঁরা জানতেন। তারপরেও গতবছর নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তারা সেবা দিয়ে গেছেন। আর আমরা তাঁদের পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো পিটিয়েই মেরে ফেলেছি কিংবা কমিটমেন্ট নিয়ে প্রশ্ন তুলছি। কি অকৃতজ্ঞ জাতি আমরা! তাই তাঁদের কমিটমেন্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে নিজেকে তাঁদের জায়গায় দাঁড়ানোর অনুরোধ রইল। স্বাস্থ্যকমীরা বেঁচে না থাকলে বাকী সব আয়োজনই যে মূল্যহীন। আপনি টাকা থাকলেই হয়ত চিকিৎসার সমস্ত আয়োজনই করতে পারবেন কিন্তু যারা মৃত্যুবরণ করলেন তাদের শূন্যতা পূরণ হবার নয় বা রাতারাতি চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করা অসম্ভব।

কোন একদিন এই মহামারীর শেষ দেখবে এই পৃথিবী। কিন্তু স্বাস্থ্যকর্মীদের স্বীকৃতি দিতে কিংবা চিকিৎসার নামে প্রহসনের মানদণ্ডে আমরা অবশ্যই সারা পৃথিবীতে প্রথম স্থান অধিকার করে নিব এটা নিশ্চিত।

যেখানে অনান্য দেশে এই স্বাস্থ্যকমীরা বীরের মর্যাদা পাচ্ছেন আর গত একবছরেও আমরা কার্যত তাদের কোন স্বীকৃতই দিলাম না। নানাভাবে হয়রানি তো স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কি নির্মম মৃত্যু! কি নিদারুণ অবহেলায় আমাদের চিকিৎসকেরা গতবার মারা গেলেন। তাদের এই যন্ত্রণা নিজেকে প্রতি মুহূর্তে দগ্ধ করেছিল, যা কোনভাবেই মেনে নেয়ার মত নয়।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে অসহায় মানুষটি হল স্বাস্থ্যকর্মীরাই। কারণ যেখানে নূন্যতম স্বীকৃতি পাওয়াটা দুঃস্বপ্নের মত সেখানে নিজের আরাধ্য জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে, সাথে পরিবার-পরিজনদের মৃত্যুর ঝুঁকি আছে জেনেও অব্যাহত সেবা দিয়ে যাওয়া অনেক বড় যোগ্যতা। কারণ গত একবছরে প্রচন্ড মানসিক চাপ নিয়ে সেবা দেয়ার বিনিময়ে কার্যত প্রহসন ছাড়া ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিটুকুও দিতে পারিনি।

তাই অবিলম্বে অনান্য দেশের মত সকল স্বাস্থ্যকমীদের ভিভিআইপি হিসেবে গণ্য করে তাদের পর্যাপ্ত সুরক্ষায় ও চিকিৎসা নিশ্চিতের আহ্বান জানাই। চিকিৎসারত সকলের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার আর কোন বিকল্প নেই। ইতিমধ্যে চিকিৎসাসেবা দিতে দিতে গিয়ে অনেকেই তাদের জীবন দিয়েছেন ,স্বজন হারিয়েছেন যা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়।আর নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও লড়াইয়ে নামা সামনের সারির যোদ্ধাদের চায়নিজ বিশেষজ্ঞরাও স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন। তাই পর্দার আড়ালে থাকা সেই সব সুপারহিরোদের স্যালুট জানাই। নষ্ট সময় আপনাদের মর্যাদা দিতে পারেনি। কিন্তু ইতিহাস আপনাদের বীর হিসেবেই চিনবে।

একটা ভঙ্গুর, ফাঁকাবুলির উপর দাঁড়িয়ে থাকা স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতার সমস্ত দায় আপনি ঢালাওভাবে ডাক্তারদের দিতে পারেন না। কারণ চিকিৎসা আপনার মৌলিক অধিকার যা নিশ্চিত করবে রাষ্ট্র, স্বাস্থ্যকর্মীরা না। আর ডাক্তার বনাম সাধারণ জনগণের এই খেলায় দিনশেষে আপনি বা ডাক্তার দুজনেই ভিকটিম। আপনার চিকিৎসা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের, সেই দাবিতে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাই। কেন একটা বৈশ্বিক মহামারী চলমান অবস্থায় গত এক বছরেও যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হলো না তার জন্য সোচ্চার হোন। নিজের জীবনের প্রয়োজনে হলেও নিজের অধিকারের ব্যপারে সচেতন হউন, সোচ্চার হউন।

নতুবা নিজের কিংবা প্রিয়জনের আসন্ন মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হোন। এটাই যে এই মুহূর্তের নির্মম বাস্তবতা!

এই যুদ্ধে আপনি একা বেঁচে যাবেন? এটা অসম্ভব। এই অন্তিম মুহূর্তে আপনার প্রাণভোমরা, আপনার জীবন রক্ষার মূল যুদ্ধটা করবেন স্বাস্থ্যকর্মীরাই। তাই ভালোবাসা নিয়ে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশে দাঁড়ান। আপনার এ সামান্যতম চেষ্টায় অসামান্য কিছু ঘটে যেতে পারে।কারণ দিনশেষে ভালবাসা জিতে যায়।আপনার অন্তিম শয্যায় যারা আপনার পাশে থাকবেন সর্বস্ব নিয়েই তাদের পাশে দাঁড়ান। আর এতদিন তাঁরাই আপনার বিপদে আপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন, কোন না কোনভাবে আপনার আজকের বেঁচে থাকার পেছনে যাদের নূন্যতম অবদান রয়েছে স্বজনভেবে তাদের নিয়মিত খোঁজ নিন, পাশে দাঁড়ান, এখনই সময়! আর এটাই যথার্থ মানুষের ধর্ম।

শুধু মানুষ হয়ে জন্ম নেয়াটা শেষ কথা না, সময়ে মানুষের মত কাজই হল এ জন্মের সার্থকতা। তাই অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যুর আগে বিবেকের কাছে মরে যাবেন নাকি শুধু বেঁচে থাকবেন? পৃথিবীর কাছে এ বেঁচে থাকাটা মূল্যহীন। সুবর্ণ জয়ন্তী পালনের বছরে দাঁড়িয়ে উন্নয়নের হিমালয় অতিক্রম করার পরেও কেন চিকিৎসায় আমরা নূন্যতম সক্ষমতা অর্জন করতে পারলাম না এই দীর্ঘশ্বাস নিয়েই মরতে চান ? সিদ্ধান্তটা একান্তই আপনার। মহামারী শেষে বিবেকের আয়নায় আপনি নিজেকে কোথায় দেখতে চান কিংবা মরে গেলেই সৃষ্টিকর্তার কাছে এর কি উওর দিবেন ভেবেছেন কি? তাই একটু ভাববার অনুরোধ রইল।

৭১ এ আমরা দেখিয়ে ছিলাম কিভাবে একসাথে মনোবল ধরে রেখে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। এজন্য অনেক মূল্য দিতে হবে এটা নিশ্চিত, তবে এবারেও আমরা জিতব। তাই আমাদের যোদ্ধাদের মনোবল ধরে রাখার দায়িত্বটা আমাদের সবাইকে নিতে হবে, একসাথে কাঁধে কাধ মিলিয়ে। আমি আশাবাদী জয় আমাদের হবেই, আলো আসবেই।

অতনু পাল রাজ
অ্যাসিস্ট্যান্ট কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট
টিএআই সোশ্যাল ফাউন্ডেশন
উখিয়া, কক্সবাজার

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত