প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খান আসাদ: জ্ঞান মুক্ত হোক ধর্মান্ধতা ও ক্ষমতা চর্চা থেকে

খান আসাদ: সরস্বতী পূজা। বিদ্যার দেবী সরস্বতীর কাছ থেকে বর নেওয়া, কিংবা বাচ্চাদের হাতে খড়ির উপলক্ষ্য এ নিবেদন। শৈশবে আমার অভিজ্ঞতায় এটি ‘হিন্দু’ পূজা ছিলো না। ছিলো ‘স্কুলের অনুষ্ঠান’। এক প্রতীকী নারীর কাছে, বিদ্যা অর্জনের সক্ষমতার আবেদন।

স্কুলের এ অনুষ্ঠানটি আমার কাছে কোনো ‘ধর্মীয়’ অনুষ্ঠান মনে হয়নি। ছাত্রদের অনুষ্ঠান মনে হতো। কেন ‘ধর্মীয়’ মনে হয়নি? কারণ সম্ভবত আমার নিজের হাতে খড়ি, বাংলা ও আরবি বর্ণমালা শেখা আমার মায়ের কাছেই। ফলে নারীরাই যে বিদ্যা শিক্ষার দায়িত্বে আছেন, সরস্বতীর মূর্তি দেখে তা খুব স্বাভাবিক মনে হয়েছে। অলৌকিক কিছু নয়। সরস্বতী দেবী শুধু লৌকিক থেকে অলৌকিক হয়ে ওঠেননি। এ উপমহাদেশে তাকে নিয়ে বেশুমার রাজনীতিও হচ্ছে।

যেমন, এ বছর, ২০২১ সালের বাংলাদেশে, সিলেট শহরে সরস্বতী পূজায় মাইক ভাড়া না দিতে পুলিশের নির্দেশ আছে (SYLHETTODAY24.NEWS)। মাইক বাজলে মুসলমানদের ধর্মানুভ‚তিতে আঘাত লাগবে। এ মুসলমানদের পেছনে ১৩৩টি জঙ্গি দল আছে। এ জঙ্গিদের রাগানো ঠিক হবে না। ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে, শান্তি রক্ষার জন্য পুলিশ আর কিই বা করতে পারে? এ সব জঙ্গি ও তাদের সমর্থকদের শান্তির পথে আনার জন্য প্রতি উপজেলায় স্পেশাল মসজিদ তৈরি করা হবে, ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে। এভাবে আওয়ামী লীগ সরকার ও রাষ্ট্র ‘ইসলাম’  শিক্ষা দিয়ে সা¤প্রদায়িকতা মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের মোকাবেলা করবে।

তবে অদূর ভবিষ্যতে ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে হিজাব যেমন ‘স্বাভাবিক’, ওয়াজ যেমন ‘স্বাভাবিক’, তেমনি বিধর্মীদের ধর্মীয় উৎসব বন্ধ করাও ‘স্বাভাবিক’  হয়ে যাবে বলেই মনে হয়। ভারতে বিজেপি সরকারও সরস্বতী দেবীকে নিয়ে রাজনীতি করছে। একটি রাজনৈতিক প্রকল্প হয়েছে ২০১৫ সালে। ‘হরিয়ানা সরস্বতী ডেভেলপমেন্ট বোর্ড’। ৫০ কোটি টাকা দিয়ে একটি মরে যাওয়া নদী উদ্ধারের চেষ্টা। গণ্ডগোলও হচ্ছে। কারণ অনেক আগে হারিয়ে যাওয়া একটি নদী আবার খননের জন্য কৃষকেরা তাদের ফসলের জমি দিতে রাজি নয়। বিজেপির মতে, সরস্বতী একটি বিশাল নদী ছিলো। যদিও ভ‚তত্ত¡বিদেরা মনে করে খ্রিস্টপূর্ব ১১০০০ বছর আগে, বর্ষা মৌসুমে একটি জলধারা ছিলো, যার অবশেষ আজ কয়েক মিটার মাটির নিচে। বিজেপির কাছে এটি ধর্মীয় সমাবেশিকরনের হাতিয়ার, ভোটের প্রয়োজনে।

ফিরে আসি বিদ্যার দেবীর আলোচনায়। দাবি করা হচ্ছে, সরস্বতী বৈদিক দেবী। আসলে কী তাই? ‘দেবী’ব্যাপারটা স্তেপ ও ইরানের দিক থেকে আসা আর্যদের সঙ্গে তেমন যায় না। তারা কেবল দেবতা(পুরুষ) দের ভালো পায়। ফলে, হতে পারে এটি আদি ভারতীয় প্রকৃতি পূজারী আদিবাসীদের নদী ‘সরস্বতী’  পূজার বিবর্তিত রূপ যা আর্যদের দ্বারা আত্মিকরণকৃত। অন্যদিকে আদিবাসী সাঁওতালদের সৃষ্টি উপকথায় হাঁস হচ্ছে মানুষের জন্মের পেছনে, এবং সরস্বতীর বাহনও হাঁস। আর্য হিন্দু মিথলজিও ভারতীয় অনার্য আদিবাসীদের সৃষ্টিতত্ত্বের থেকে যে অনেক ধার নেওয়া, সেটাও অস্বীকার করা মুশকিল।

হয়তো এটি আদিবাসীদের সামাজিক অনুষ্ঠান ছিলো, আদিতে। উপলক্ষ্য হতে পারে শ্রুতিধর বা স্বরস্মৃতি বহনকারী লোকদের প্রতি সম্মান জানানো। বিদ্যা বা জ্ঞানের প্রতি আদিবাসীদের বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার উপলক্ষ্য। কৃষিজীবী আদিবাসীদের কাছে নারীরাই ছিলো জ্ঞান পরাম্পরা রক্ষার প্রধান ব্যক্তি। ফলে জ্ঞানী নারীর প্রতি সম্মান জানানোটা খুবই লৌকিক। সরস্বতী সেকারণে একজন নারী। বহু ঈশ্বরবাদ দেব-দেবী পূজা ও একেশ^রবাদ (আব্রাহামিক ধর্ম), তারপর ধর্ম নিয়ে রাজনীতি (চার্চ), উপনিবেশ, ক্রুসেড, জ্বিহাদ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, এরপর লিখিত ইতিহাস, ইত্যাদির কারণে মৌখিক ইতিহাস বা আদিবাসী ইতিহাসের সত্য চাপা পরে গেছে, বেদখল হয়ে গেছে, আত্মিকরণ হয়েছে ও হারিয়ে গেছে।

আদিবাসীদের মানুষ ও সমাজের উদ্ভব নিয়ে যে গল্প বা রূপকথা, যেগুলো আমরা মিথ বলে অবজ্ঞা করি, সেগুলোকে নতুন করে বোঝা ও ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। যখন প্রতিস্টানিক ধর্মান্ধতা ও ক্ষমতার রাজনীতি ইতিহাসের ‘সত্য’ নির্ধারণ করে দিতে চায়, এ সময়ে আদিবাসী স্রুতিধর দের কাহিনী আরও বেশি দরকার। জ্ঞান মুক্ত হোক ধর্মান্ধতা ও ক্ষমতাচর্চা থেকে। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত