প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবরা কে কোথায়?

ডেস্ক রিপোর্ট : ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবরা এখন ছড়িয়ে আছেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। একতরফা জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিল বিএনপি আর গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার প্রতিবাদে মাঠে নেমে প্রতিবাদে সোচ্চার ছিল আওয়ামী লীগ। চৌদ্দ বছর আগের সেই ঘটনার সূত্র ধরে ক্ষমতায় বসেছিল সেনা সমর্র্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। দুই বছরের রাজত্বে অনেক ঘটনার জন্ম দিয়ে শেষ পর্যন্ত সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হন তারা। দুই বছরের দুঃসহ শাসনের কুশীলবরা কে কোথায় আছে এবং কি করছে সেইসব তথ্য খুঁজে বের করেছে গোয়েন্দা সংস্থা।

গোয়েন্দা সংস্থার নথি থেকে জানা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবরা। শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া-দুই নেত্রীসহ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতার, ব্যবসায়ীদের হয়রানি করে অর্থ আদায়সহ নানা গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। তারা প্রায় সবাই আছেন বহাল তবিয়তে। নির্বিঘ্নে নিজেদের মতো করে জীবিকা নির্বাহ করে চলেছেন। বেশির ভাগই আছেন বিদেশে। এর মধ্যে প্রধান কুশীলব ফখরুদ্দীন আহমদ ও মইন ইউ আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে সেখানেই আছেন। সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারীও আছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে। থাইল্যান্ডে চিকিৎসারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী টানা ছয় বছর অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন শেষে এখন ঢাকায় অবসর যাপনের পাশাপাশি রেস্টুরেন্ট ব্যবসা করছেন। ওয়ান-ইলেভেনে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) পরিচালক হিসেবে দৌর্দণ্ড প্রতাপশালী মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন দুবাইয়ে চাকরি করছেন কয়েক বছর। তিনি ও ডিজিএফআইয়ের অপর ক্ষমতাধর কর্নেল (অব) সাঈদ জোয়ার্দার দুবাই-কানাডা যাওয়া আসার মধ্যে আছেন। চাকরিচ্যুত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারী আছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব ছেড়ে দেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ। আর প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। তৎকালীন সেনা কর্মকর্তাদের সমর্থনে ওই নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ জন্য এই সরকারকে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলা হয়। ২০০৬ সালের ২৮ নবেম্বর তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে প্রধান উপদেষ্টা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়। শুরু থেকেই এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আওয়ামী লীগ জোর আপত্তি জানায়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যেতে থাকলে সরকারের উপদেষ্টারা একে একে পদত্যাগ করতে থাকেন। এরই মধ্যে ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচনের ঘোষণা দেয়া হলে আওয়ামী লীগ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দেশে ব্যাপক গণআন্দোলনের সৃষ্টি হলে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় দেশে জরুরী অবস্থা জারি করা হয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভেঙ্গে দিয়ে জরুরী অবস্থা জারি করেন। তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ জরুরী অবস্থা জারির পর থেকে সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বহুল আলোচিত ফখরুদ্দীন আহমদের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবির্ভাব সেদিন। দেশের দুই নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপার্সন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের পর কারাগারে বন্দী করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার নীলনক্সা তৈরি হয়। দুই নেত্রীর দুই দলের শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবাইকেই গ্রেফতার করা হয়।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব ছেড়ে দেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ। আর প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদই এক অনুষ্ঠানে ১১ জানুয়ারির জরুরী অবস্থা জারির দিনটিকে ওয়ান-ইলেভেন বা এক-এগারো নামে আখ্যায়িত করেন।

ফখরুদ্দিন আহমদ ॥ গোয়েন্দা সংস্থার নথি থেকে জানা যায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ দেশ ত্যাগের পর আমেরিকায় বিশ্বব্যাংকের অধীনে চাকরি নেন। সাবেক সেনা প্রধান মঈন ইউ আহমেদ আমেরিকায় তার নিকটাত্মীয়ের বাসায় অবস্থান করছেন। তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন দেশ ছেড়ে যান যুক্তরাষ্ট্রে। অবশ্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন আগে থেকেই। এই দফায় দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্র গিয়ে বাড়ি কেনেন মেরিল্যান্ড স্টেটের পটোম্যাকে। সেখানে তার দুটি বাড়ির একটিতে থাকেন সস্ত্রীক ও অপরটিতে থাকে তার কন্যার পরিবার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই গবর্নর যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ায় ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ বিষয়ে ভিসিটিং স্কলার হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী পদমর্যাদায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের শিক্ষার্থীদের ‘উন্নয়নশীল দেশের গণতন্ত্রের বিকাশ’ সম্পর্কে শিক্ষা দেন। সেই সঙ্গে সামাজিক ব্যবসা ও ক্ষুদ্রঋণ বিষয়েও শিক্ষার্থীদের পড়ান। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশী বেশ কয়েকজন বিভিন্ন সময়ে কাজ করেছেন এবং এখনও করছেন।

মইন ইউ আহমদ ॥ সে সময়ের সেনা প্রধান মইন ইউ আহমেদ প্রথমে ফ্লোরিডায় ছোট ভাই ও ছেলের কাছে থাকতেন। পরে তার ক্যান্সার ধরা পড়লে চিকিৎসার জন্য নিউইয়র্কের কুইন্সে থাকা শুরু করেন। এর মধ্যেই তার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব হয় বা গ্রিনকার্ড পান। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে বিশেষ সুবিধায় নিউইয়র্কের হাসপাতালে ব্লাড ক্যান্সারের চিকিৎসা নেন। পরে দার স্পাইনাল কর্ডে ৫টি স্থানে ক্ষত হওয়ায় বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশনও করা হয়। কেমোথেরাপি দেয়া হয়। দীর্ঘ পাঁচ বছর লোকচক্ষুর আড়ালে থাকলেও ২০১৫ সালে ফ্লোরিডায় এক রবীন্দ্র সম্মেলনের মঞ্চে সরব উপস্থিতির মাধ্যমে সামনে আসেন জেনারেল মইন। এর মধ্যে ‘শান্তির পথে’ শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন ওয়ান-ইলেভেন সংশ্লিষ্ট কিছু কথা।

ইয়াজউদ্দিন আহমদ ॥ ওয়ান-ইলেভেনের সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে নানা কর্মকাণ্ডে বিতর্কিত হওয়া অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ চার বছর আগে মৃত্যুবরণ করেছেন। ২০১২ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি ৮১ বছর বয়সে থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। শেষ সময়ে তিনি বয়সের ভারে মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেছিলেন। কাটিয়েছেন গুলশানের বাসভবনে। রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক কোন অনুষ্ঠানেই যোগ দেননি।

ফজলুল বারী ॥ ব্রিগেডিয়ার (চাকরিচ্যুত) ফজলুল বারী আমেরিকায় এখন রমরমা পিৎজা ব্যবসা করছেন। নিউয়র্কের লং আইল্যান্ডের ভেলিস্ট্রিম শহরের ‘ডমোনিজ পিৎজা স্টোর’ নামক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্ব কিনে ব্যবসা করছেন তিনি। সিলেটের বিরানি বাজারের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ডমোনিজ পিৎজা স্টোরটির মালিকানার অংশীদারিত্ব কিনেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে তিনি ওয়াশিংটন ডিসির বাংলাদেশে দূতাবাসের সামরিক এ্যাটাচির চাকরি নিয়ে দেশ ত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে দেশে ফিরে আসার নির্দেশ দিলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আত্মগোপন করেন। সম্প্রতি তিনি নিউইয়র্কের বিএনপির সাবেক এক এমপির মালিকানাধীন সাপ্তাহিক পত্রিকায় সাক্ষাতকার দিয়ে তার উপস্থিতির কথা জানান দিয়েছেন।

এটিএন আমিন ॥ ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন ২০০৯ সালের ১৭ মে সব আর্থিক সুবিধাসহ সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। পরে একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয়ে দেশত্যাগ করেন। সর্বশেষ দুবাইয়ে অবস্থান করে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাকরি করছেন বলে জানা যায়। ওয়ান-ইলেভেনের আগে উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগ সরকার আসার পর জাতীয় সংসদে চরম সমালোচিত হয়ে ২০০৯ সালের ২ এপ্রিল পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি ঢাকায় ডিওএইচএসের বাসায় থাকেন। নিয়মিত হাঁটাহাঁটি ব্যায়াম করেন বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে। তত্ত্বাবাবধায়ক সরকারের দুই বছর প্রভাবশালী উপদেষ্টা থাকা মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিন ছিলেন সে সময়ের গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটিরও প্রধান। তিনি চট্টগ্রামে নিজ বাড়িতে বসবাস করে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল পরিচালনা করছেন।

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে অত্যধিক সক্রিয় ভূমিকায় থাকা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন পৈতৃক সম্পত্তি ভাগাভাগি করে দৈনিক ইত্তেফাক ছেড়ে দিয়ে নিজের আইন পেশায় ফেরেন। উচ্চ আদালতের বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের বিরুদ্ধে আকারে ইঙ্গিতে সরব ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে আগে বিভিন্ন টকশোতে উপস্থিত হতে দেখা যেত। এক মহিলার বিরুদ্ধে অশ্লীল বক্তব্য দিলে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন ওই মহিলা। মহিলার দায়ের করা মামলায় কিছুদিন জেলখেটে এখন অনেকটাই চুপচাপ। -জনকণ্ঠ

সর্বাধিক পঠিত