প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মরুভূমিতে ফল উদ্যান !

ডেস্ক রিপোর্ট:  ‘সংগ্রাম’ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কালজয়ী চিত্রকর্ম। ওই চিত্রকর্মটি চোখে ভাসলে মনে আঁকা হয়ে যায় বর্ষায় লাল মাটির সড়কে গরু-মহিষের গাড়ি ঠেলার সেই চেনা ছবি। বরেন্দ্রর বাঁকে বাঁকে এখনো কালেভদ্রে দেখা মেলে সেই চিত্রকর্মের প্রতিচ্ছবি। তবে গেল এক যুগে বরেন্দ্র জনপদের সব কিছুই যেন হয়ে উঠেছে সাতরঙা। লাল মাটির সড়কগুলো হয়েছে পিচের কালো প্রলেপে পাকা, আর কৃষিজমিতে ফলছে ‘সোনা’। একসময়ে পানি সংকটে ভুগতে থাকা অসমতল ভূমি এখন ফলফলাদির নাচনে জেগে উঠেছে; খাঁ খাঁ করা বরেন্দ্র জনপদে তৈরি হয়েছে ফল চাষের নতুন মঞ্চ। সড়ক দিয়ে যাওয়ার পথে চোখ ফেললেই উঁচু-নিচু টিলার মতো ভূমিগুলোকে মনে হবে সবুজের ফাঁকে ফাঁকে লাল-হলুদের রোশনি। সেখানে ফলছে আম, লিচু, মাল্টা, ড্রাগন, পেয়ারা, কমলা, আতা, বরইসহ হরেক ফল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক ফল উৎপাদনে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বরেন্দ্রর ফল এরই মধ্যে ফেলেছে আলোর রেখা। কালের কণ্ঠ

আশার খবর হলো, বিশ্বে ফল উৎপাদন বাড়ার সর্বোচ্চ হারের রেকর্ড এখন বাংলাদেশের। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাবে বাংলাদেশে দেড় যুগ ধরে সাড়ে ১২ শতাংশ হারে ফল উৎপাদন বাড়ছে। এরই মধ্যে বিশ্বে বাংলাদেশ আম উৎপাদনে সপ্তম, কাঁঠালে দ্বিতীয় ও পেয়ারায় অষ্টম স্থানে উঠে এসেছে।

বরেন্দ্র জনপদে চাষের রূপ পাল্টে যাওয়া নিয়ে ২০০৩ সালে গবেষণা শুরু করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এন কে নোমান। এই অঞ্চলের কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি ও মানুষের জীবন-জীবিকা নিয়ে তিনি ৮-১০টি গবেষণা করেছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফসলের দাম তুলনামূলক কমে যাওয়া, দুর্বল সেচ ব্যবস্থাপনা, শ্রমিক সংকট ও মজুরি বাড়ার কারণে বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষ ধান ছেড়ে ফল চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। গভীর নলকূপ দিয়ে যে সেচব্যবস্থা আছে, তা ঠিকমতো কাজ করে না। অনেক জায়গায় পানি উঠছে না। ফলে বিকল্প উপায়ে সেচ খরচ বেড়ে গেছে। আর ফল চাষে পানি যেমন কম লাগে, এর ব্যবস্থাপনাও তুলনামূলক সহজ। অনেকেই বাগান করে লিজ দিচ্ছেন। এতে এককালীন মোটা অঙ্কের টাকা পাচ্ছেন।’

মরুভূমি থেকে মরূদ্যান : ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বরেন্দ্রর প্রায় ৪২ শতাংশ এলাকায় বনভূমি ছিল। ১৮৪৯ সালের ভূমি জরিপের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বরেন্দ্রর প্রায় ৫৫ শতাংশ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল বনভূমি। তবে ১৯৭৪ সালে দেখা যায়, প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা কৃষি জমিতে রূপান্তর হয়েছে। এত কম সময়ের মধ্যে ব্যাপকভাবে বনভূমি ধ্বংস করার কারণে বরেন্দ্র জনপদ শুষ্ক ভূমির রূপ পায়।

নওগাঁর সাপাহারের পিছলডাঙ্গা গ্রামের চাষি মমিনুল হক, দেলোয়ার হোসেন; জবই গ্রামের শাহজাহান আলী; মানিকুড়া গ্রামের দিনমজুর এনামুল হক; মহজিদপাড়ার তরুণ; সিঙ্গাহারের আব্দুল আলিম এক সুরেই বললেন, আগে বরেন্দ্র ভূমিতে কোনো নলকূপ বসত না। সুপেয় পানির প্রয়োজন মেটাতে হতো পুকুর, ডোবা আর কুয়ার পানি দিয়ে। ফলে চাষ করা খুবই কঠিন ছিল। সবার চোখ থাকত আকাশপানে। অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামলে আমন ধানের আবাদ হতো। আর বৃষ্টি কম হলে অনাবাদি থাকত মাঠের পর মাঠ। এ কারণে আশ্বিন-কার্তিক মাসকে মঙ্গা বলতেন প্রবীণরা।

অভাব-অনটনের ঘোরে আর টিকতে পারছিলেন না বরেন্দ্রর মানুষ। একে তো পানি সংকট, আরেক দিকে উৎপাদন খরচ অনুযায়ী ধানের দাম কম; তাতে নাভিশ্বাস উঠেছিল লোকজনের। বেঁচে থাকার তাগিদেই বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে টিকে থাকার উপায় খুঁজছিলেন তাঁরা। এরই মধ্যে অধিক ফলনশীল জাতের আম, মাল্টা, ড্রাগনের গাছ বাড়ির পাশে লাগিয়ে সফলতা পেতে শুরু করেন অনেকেই। এক-দুই বছরের মধ্যেই ফল আসায় অনেকেই মাঠেও আম চাষের চিন্তা শুরু করেন। হিসাব কষে দেখেন, জমিতে ফল উৎপাদন ধানের চেয়ে বেশি লাভজনক। গাছের ছায়ায় মাটি তেমন চৌচির না হওয়ায় তুলনামূলক পানিও লাগে কম। একে অন্যের দেখাদেখি মাঠগুলো ফল বাগানে ভরে ওঠে।

স্থানীয়রা বলছেন, আগে প্রতিবিঘা জমিতে কৃষক বড়জোর ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার ধান মাড়াই করতেন; এখন একই পরিমাণ জমিতে বছরে আম বিক্রি করে পাচ্ছেন লাখ টাকা। আমের কারণেই এখন ওই এলাকায় অভাব তেমন আর নেই। জমির মালিকরা যেমন বাগান করছেন, তেমনি ভূমিহীনরাও বর্গা নিয়ে বাগানে ঝুঁকছেন। আমের বিপণন বা আড়তকেন্দ্রিক নানা ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলের অনুর্বর জমিই হাজার হাজার মানুষের ‘ভাগ্যের চাকা’ হয়ে উঠেছে।

বর্গা নিয়ে হচ্ছে বড় বাগান : বরেন্দ্র জনপদে এখন কৃষি শ্রমিক পাওয়া মুশকিল। ছোট কৃষক বা ভূমিহীন লোকজনও ফল বাগানের উদ্যোক্তা হচ্ছেন। সাপাহার উপজেলা সদরসংলগ্ন মানিকুড়া গ্রামের দিনমজুর এনামুল হকের জমি ছিল না। ২০১৪ সালে অন্যের পাঁচ বিঘা জমি লিজ নেন তিনি। বছরে প্রতি বিঘা জমির লিজ মূল্য ছিল আট হাজার টাকা। ওই জমিতে আমবাগান করেন এনামুল। বছর দুয়েকের মধ্যেই লাভের মুখ দেখতে শুরু করেন তিনি। এরপর সাত বছরের ব্যবধানে মেধা আর শ্রম দিয়ে এনামুল তিন শ বিঘা বাগানের মালিক বনে গেছেন। বর্তমানে তাঁর বাগান থেকে ১২ হাজার মণ আম উৎপাদন হয়; যার বাজারদর প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা। এনামুলের মতো এমন সফল উদ্যোক্তার শত শত গল্প এখন বরেন্দ্র জনপদের সবার মুখে মুখে।

পানি সংকটের ‘সমাধান’ : ধানের চেয়ে ফল বাগানে যৎসামান্য পানি লাগলেও বরেন্দ্র এলাকায় পর্যাপ্ত গভীর নলকূপ নেই। আবার সব এলাকায় গভীর নলকূপ কিংবা শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে পানি ওঠে না। এ কারণে অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে পুকুর খনন করেছেন। এ ছাড়া অঞ্চলটিতে প্রচুর পরিমাণে খাস ও ব্যক্তিমালিকাধীন পুকুর আগে থেকেই ছিল। সেসব পুকুর থেকে শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে পানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

গোদাগাড়ী-সাপাহার সড়কের পাশে সাওর গ্রামে হুমায়ুন আলীর আমবাগানে গিয়ে জানা যায়, বাগানে পানি সেচের জন্য তিনি একটি গভীর টিউবওয়েল বসিয়েছেন। মোটর দিয়ে সেই টিউবওয়েল থেকে পানি তুলে কখনো কখনো পানি সেচ দেন।

চোখ যেদিকে, আমবাগান সেদিকে : রাজশাহীর গোদাগাড়ী থেকে নওগাঁর সাপাহারের সড়কপথের দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। সাপাহার, পোরশা, নাচোল এলাকার মানুষের চলাচলের জন্য গোদাগাড়ী পর্যন্ত চলে গেছে একটি আঞ্চলিক মহাসড়ক। সড়কটি ধরে ১০-১২ কিলোমিটার উত্তরে এগোতে থাকলেই চোখে ধরা দেবে রাস্তার দুই পাশে গড়ে ওঠা সারি সারি আমবাগান। কোথাও কয়েক বছর আগের বাগান, আবার কিছু এলাকায় সদ্য রোপিত হয়েছে আমের চারা। যেসব বাগানের বয়স দুই বা এক বছর পার হয়েছে সেসব বাগানের দিকে তাকালেই সবুজের ঢেউ যেন হাতছানি দেয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, নওগাঁর সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুরে সরেজমিনে ঘুরে মাঝে মাঝে মাল্টা ও ড্রাগনের বাগানও চোখে পড়ে। কোথাও কোথাও দেখা যায় মিশ্র ফলের বাগান।

আমের ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’র মুকুট এখন নওগাঁর : ‘নওগাঁয় উৎপাদিত আমের বেশির ভাগই চাষ হয় ভারত সীমান্তঘেঁষা সাপাহার ও পোরশায়। এ জেলায় উৎপাদিত আমের ৬০ শতাংশই আম্রপালি জাতের। বাকি ৪০ শতাংশ ফজলি, নাগফজলি, ন্যাংড়া, ক্ষীরশা, হিমসাগরসহ অন্য জাতের।’ বলছিলেন নওগাঁ কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শামসুল ওয়াদুদ ও অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. গোলাম ফারুক হোসেন। তাঁরা জানান, গেল মৌসুমে নওগাঁয় ২৪ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়। এতে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার আম বিক্রি হয়। জেলায় বড় আমবাজার গড়ে উঠেছে সাপাহারে। গত মৌসুমে সাপাহার আম ব্যবসায়ী সমিতি আয়োজিত এক সভায় নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার প্রকৌশলী আবদুল মান্নান নওগাঁ জেলাকে আমের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দেন।

সাপাহার আম ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি কার্তিক সাহা জানান, সাপাহার ও এর আশপাশে ব্যাপক হারে মিষ্টি আমের চাষাবাদ হওয়ায় এখানে বড়বাজার গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন উপজেলার আম চাষিরা এখানে আম বিক্রি করতে আসেন। একসময়ের আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকেও অসংখ্য ব্যবসায়ী এখানে আম কিনতে আসেন।

ড্রাগন-মাল্টায়ও সুবাস : সাপাহার উপজেলা সদর থেকে দক্ষিণ দিকে চার কিলোমিটার পথ পেরোলেই পড়বে ভাটপারুল গ্রাম। এই গ্রামেও আমবাগানের ছড়াছড়ি। তবে গ্রামের আধাপাকা সড়ক ধরে একটু এগোলেই চোখে পড়বে ড্রাগন ফলের বড় বাগান। বাঁশ দিয়ে তৈরি মাচার সঙ্গে ড্রাগন গাছগুলো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। এই ফল বিক্রি করেই প্রথম বছরেই অন্তত ১৫ লাখ টাকা আয় হবে বলে আশা করছেন বাগান মালিক মোখলেছুর রহমান। তিনিসহ ১০ বন্ধু মিলে একফসলি ধানি জমিতে গত ফেব্রুয়ারিতে বাগানটিতে ড্রাগন চাষ শুরু করেন। প্রায় ৫০ বিঘা আয়তনের এই বাগানের একটি অংশের কিছু জমিতে রয়েছে আম, কিছু জমিতে রয়েছে মেওয়া বা শরিফা জাতের ফলও।

সাপাহার উপজেলা কৃষি দপ্তর থেকে জানা গেছে, শুধু সাপাহারে বর্তমানে প্রায় ২৫০ বিঘা জমিতে মাল্টা, ২৫০ বিঘা জমিতে ড্রাগন ও ১০০ বিঘা জমিতে বরইয়ের আবাদ হয়েছে। এর বাইরে রয়েছে পেয়ারা, শরিফা, লিচুসহ অন্য ফলও।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের বাবু ডায়িং এলাকায় বাচ্চু নামে এক ব্যক্তি ১৭০ বিঘা জমি বন্ধক নিয়ে সেখানে মাল্টা, সৌদি আরবের খেজুর, আম ও কমলা চাষ করেছেন। এখান থেকে বছরে তাঁর অন্তত ৩০ লাখ টাকা আয় হচ্ছে।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামসুল হক বলেন, ‘ফল চাষ এখন অনেকটা লাভজনক। এ কারণে বরেন্দ্রর একফসলি জমিতে এখন নানা জাতের ফল চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা।’

আছে ঝুঁকি, আছে হয়রানি : শত বিঘার বড় বাগানের কয়েকজন উদ্যোক্তা কর কমিশনারদের হাতে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তবে তাঁদের কেউই নাম প্রকাশে কথা বলতে রাজি হননি। তাঁদের ভাষ্য, বরেন্দ্র অঞ্চলের বড় উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করে ইদানীং কর অফিস থেকে হয়রানি শুরু করেছে। উৎকাচ না দিলে মামলার ভয়ও দেখানো হচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের বাস্তবতায় অবিলম্বে ফল চাষ করমুক্ত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রণোদনা ও বীমা সুবিধা চান তাঁরা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত