প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: পদ্মা সেতু নিয়ে বিতর্কের অবসান সেতুর অর্থনৈতিক উপযোগিতা ও সুনামের স্বার্থেই হওয়া উচিত

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: পদ্মা সেতু সার্বিকভাবে আমাদের অর্থনীতিতে যে বিরাট অবদান রাখবে, এটা দুই তিন দশক আগে থেকেই বলা হচ্ছে। নতুন করে বারবার বলার দরকার পড়ে না। সাম্প্রতিকে পদ্মা সেতু নিয়ে আলোচনায় তিনটি বিতর্কিত বিষয় রয়েছে, [১] পদ্মা সেতু বানানোর খরচ। কারণ পদ্মা সেতু জাতীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখবে এ নিরীখে এটি একটি বড় বিনিয়োগ। এ জাতীয় বিনিয়োগের সাথে ভাবাবেগে আপ্লুত হওয়ার সাথে এ সেতুর অর্থনৈতিক উপযোগিতা অর্জনের বিষয়টির নিবিড় সম্পর্কে রয়েছে। যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে, যে উপলক্ষে এই বিশাল বিনিয়োগ তার রেট অব রিটার্নের যথার্থতা ও যৌক্তিকতা নির্ভর করবে সেতু বানানোর ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়ার ওপর। পাঁচ টাকা দিয়ে যে সেতু বানানো যেতো সেটা যদি পনের টাকায় বানানো হয়, তাহলে সেতুর ইকোনোমিক ভায়াবিলিটি হ্রাস পাবেই, জনগণের মধ্যে (যাদের টাকায়, যাদের জন্য সেতু নির্মিত হচ্ছে) এ মর্মে একটা সংশয় সৃষ্টি হতেই পারে। সুতরাং কতো টাকায় এটি বানানো হচ্ছে এবং কতো টাকায় এটি শেষ করা যাচ্ছে বা যাবে, কোথা থেকে কীভাবে সে টাকার সংস্থান হয়েছে এটা দেখার ও বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু হয়ে যাচ্ছে বা হয়ে যাবে এটা বাংলাদেশের আত্মবিশ^াসের বিজয়। সেই বিজয়ের আনন্দকে অর্থবহ করতে গেলে পদ্মা সেতু বানানোর ব্যয়, অর্থায়ন এবং নির্মাণ প্রক্রিয়াকে গণজ্ঞাতার্থে তুলে ধরে বিবিধ গুজব ও কুট সমালোচনার অবসান ঘটানো আবশ্যক হবে।

২০০৭ সালের প্রাক্কলিত ব্যয় তিন দফায় তিনগুণের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ার যৌক্তিক কারণ (ইনফ্লেশন, কস্ট অব ম্যাটিরিয়ালসের দাম বৃদ্ধি ইত্যাদি) নিশ্চয়ই আছে। এখানে স্বচ্ছতার কোনো ঘাটতি নেই এটা স্পষ্টিকরণ হলে সেতুর অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটির ক্রমহ্রাসমান পরিস্থতির ব্যাখ্যা মিলবে।

[২] পদ্মা সেতু বানাতে যদি আরও বিলম্বিত হয় বা ইতোমধ্যে যে বিলম্ব হয়েছে সেটার ফলেও পদ্মা সেতুর উপযোগিতা কমে যাচ্ছে। কারণ ২০০৭ সালে প্রথম প্রকল্প পাস হওয়ার পরে এটা ২০১১ সালে শেষ যাওয়ার কথা ছিলো। অথবা ২০১০-১১ সালে যখন দ্বিতীয়বার প্রকল্প সংশোধন হয়েছে তখনও বলা হয়েছিলো ২০১৫ সালে হয়ে যাবে। ২০১১ সালে পদ্মা সেতু হয়ে গেলে গত নয় বছরে অর্থনীতি এর থেকে উপকার পেতো। পদ্মা সেতু ইকোনোমিতে বেশ অবদান রাখতো। ২০১৫ সালে হয়ে গেলেও অর্থনীতিতে বিগত পাঁচ বছর ধরে এর সুফল যোগ হতে পারতো। এখন দেখা যাচ্ছে সামনে আরও এক থেকে দুই বছর সময় লাগবে। এখনো অনেকগুলো ভাইটাল কাজ বাকি। যেমন; নদী শাসন, রেল সেতু বসানো, গ্যাস লাইন নেওয়াসহ আরও অনেক কাজ। রেলসহ পূর্ণাঙ্গ সেতু শুরু হতে যতো বিলম্ব হবে ততো এর উপযোগিতা কমে যাবে। আবার তড়িঘড়ি করে শুরু করতে হলে ব্যয় বাড়বে এবং কারিগরি ত্রুটি বিচ্যুতি হওয়ার বা ঘটার সম্ভাবনা থেকে যাবে।

[৩] নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রসঙ্গ। বাইরের শর্ত সাবুদ মেনে ধার কর্জ করে বানানোর পরিবর্তে নিজের নগদ টাকায় বানানোয় নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ক্রয় পদ্ধতি প্রয়োগজনিত যে সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা সেটি মিলেছে কিনা সেটা দেখার বিষয়। এমনটা হলে ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়ার কথা। বরং উলেটাটা হয়েছে কিনা এমনতর সংশয় সৃষ্টি হওয়াটা অমূলক নয়। বিষয়টি এখনই স্পষ্ট না হলে জাতীয় গর্বের সম্পদ পদ্মা সেতুর প্রতি গণআকাক্সক্ষা ও এর নির্মাণে সমর্থন সংহত হবে না। ব্যবহার যখন শুরু হবে, যখন টোল বসানো হবে তখন তার পরিমাণ বেশি হলে সেতুর ব্যবহার সমস্যা দেখা দেবে। কারণ সেতু বানাতে খরচ বেশি হয়ে গেছে, সরকারকে ঋণ নিতে হয়েছে। সত্যিই এটা নিজের টাকায় বানানো হয়েছে কিনা, এবং নিজের টাকায় বানালে যে সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা সেটা পাওয়ার প্রশ্ন ঊঠতে পারে।

জাতীয় পর্যায়ের বড় ধরনের বিনিয়োগে ও ব্যবহারে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে মানুষের সমর্থন, আস্থা প্রয়োজন। শুধু আবেগ দিয়েই হবে না, পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যয় তুলনা করার একটা ব্যাপার আছে। পদ্মা একটি প্রমত্তা নদী, কীর্তিনাশা এর অপর নাম, তলদেশে দুই স্তরের স্রোত প্রবাহমান, সেগুলো সামলিয়ে পদ্মায় টাস প্রকৃতির সেতু নির্মাণ সহজসাধ্য নয়, ঝুকিপূর্ণ। সে কারণে অন্য দেশ বা জায়গার শান্তশিষ্ট পরিবেশে বানানো সেতুর নির্মাণ ব্যয়ের সাথে পদ্মার ব্যয়ের তুলনা করা সমীচিন হয় না। তথাপি ব্যয়- ব্যাখ্যা পর্যালোচনার অবকাশ থাকতেই পারে। সেতু নির্মাণ শেষ হলে তার নিরিক্ষায় তা ধরা পড়তে পারে। প্রসংগত যে অনুদানে কোনো কিছু না পাওয়া গেলে ঋণ নিয়ে অবকাঠামো তৈরি করা হলেও ঋণ পরিশোধ করলে আমরা বলতে পারি যে এটা আমরা নির্মাণ করেছি। একেবারে অনুদানে পাওয়া গেলে সেটা ভিন্ন কথা, যেমন; মেঘনা গোমতি সেতু। এটা পুরোটা জাপান সরকার করে দিয়েছে। যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতু বা পদ্মায় লালন সেতু এগুলো আমরা বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে তৈরি করলেও ঋণ পরিশোধ করায় আমরা বলতে পারি এগুলো আমাদের টাকায় নির্মাণ করা হয়েছে। পদ্মা সেতুর বেলায়ও এমনটা হতো পারতো।

বিশ্বব্যাংক, জাপান, এডিবি যে টাকা দিতো তার সুদের হার হতো বড়জোর এক শতাংশ। এটি ত্রিশ বছরে শোধ করা যেত। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়-দায়িত্ব তাদের থাকতো। যেমন; যমুনা সেতুর কাজ তারা নির্দিষ্ট সময়ের আগেই শেষ করেছে। এখন দেখা যাচ্ছে ত্রিশ বছরের জন্য এক শতাংশ সুদে অন্যের কাছ থেকে টাকা না নিয়ে নিজের টাকা দিয়ে বানাচ্ছি বলে যদি বিদেশি ঠিকাদারের কাছ থেকে সাপলায়ার্স ক্রেডিট জাতীয় এরেঞ্জমেন্টে যদি যাওয়া হয় কিংবা এডিপির বরাদ্দ দিয়েও যদি নির্মাণ করা হয় , তাহলে ব্যাংক রেটে সুদ গুণতে হতে পারে। সরকারের রাজস্ব আয় দিয়ে রাজস্ব ব্যয় মেটাতে হিমসিম খেতে হয় সেখানে উন্নয়ন ব্যয়ে ব্যাংক ঋণ নিতেই হয়। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাস্তবে যা ঘটেছে তা সকলের কাছে পরিষ্কার করে রাখা ভালো , নইলে ভুল বোঝার বা বোঝাবার সুযোগ তৈরি হবে।
যেহেতু এখানে অনেক আবেগ জড়িয়ে আছে। পদ্মা সেতু নির্মাণে কতোটাকা খরচ হয়েছে এবং কোথা থেকে এই অর্থ নেওয়া হয়েছে এটা জনগণকে জানানো যেতে পারে, যাতে জনগণ ভুল বুঝতে না পারে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু ধারণা দিয়েছিলেন, ‘আমরা যদি (পাকিস্তানে) সরকার গঠন করতে পারি বা ক্ষমতায় আসতে পারি তাহলে সেরে আট আনা করে চাল খাওয়াবো’। এই কথাগুলো এমন জনগণের সামনে বলেছিলেন যাদের অর্থনীতি সম্পর্কে তখন তেমন কোনো জ্ঞান ছিলো না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে নানান কারণে, বিশেষ করে ১৯৭৩ সালে বিশ^ব্যাপী অয়েল শকের কারণে ১৯৭৪ সালে চালের দাম যখন প্রায় দশ টাকা হয়ে গেলো, তখন সরকারকে জনগণ ভুল বুঝেছিলো। স্বপ্নের সেতু পদ্মাকে নিয়ে এমন ধরনের ভুল বোঝার পরিবেশ সৃষ্টি হলে সেটা হবে দুঃখজনক। কেননা এই সেতু নির্মাণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকারের দৃঢ় অবস্থান ও অবদান অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য।

সবকিছু উপর এটি একটি জাতীয় প্রকল্প এবং অবকাঠামো, এর সঙ্গে অনেক আশা, আকাক্সক্ষা ও আবেগ জড়িত। এই প্রকল্প সম্পর্কে সমগ্র জাতিকে একটা ভাব বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে, সবাইকে আস্থাশীল রাখতে হবে। এই প্রকল্প নিয়ে কেউ যেন মিথ্যা তথ্য প্রচার করতে না পারে, কোনো ধরনের গুজব ছড়াতে না পারে সেজন্য সরকারকে সবাইকে সজাগ রাখতে হবে। পদ্মা সেতুতে টোল নির্ধারণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। কোনোভাবে যেন অতিরিক্ত টোল নির্ধারণ করা হলে পরিবহন খরচ বেড়ে গেলে সময় বাঁচলেও পদ্মা সেতু ব্যবহার করে উপযোগিতায় পাওয়া যাবে না। পদ্মা সেতু আমাদের গর্বের এবং গৌরবের জিনিস। এটা আমাদের অর্থনীতিতে অবশ্যই বিশাল অবদান রাখবে।

লেখক পরিচিতি : এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান।

সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখাটি লিখেছেন আমিরুল ইসলাম

 

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত