প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল: ফ্যাটি লিভার থেকে ক্যান্সারও হতে পারে

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল : ফ্যাটি লিভার, লিভারের একটি জটিল রোগ- এ কথা সত্যি। এও সত্যি যে এ রোগ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো ইদানীং আমাদের দেশেও লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের অন্যতম কারণ। কাজেই একে হেলাফেলা করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু তাই বলে এমনটা মনে করা উচিত না যে, এটি চিকিৎসার অযোগ্য কোনো রোগ সুবা বাংলার ঘরে ঘরে এখন ফ্যাটি লিভার। ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা কেউই আর ফ্যাটি লিভারের খপ্পর থেকে মুক্তি পাচ্ছে না।

সবার এখন ফ্যাটি লিভার, পেটে আল্ট্রাসনোগ্রামের প্রোবটা ধরলেই লিভারে চর্বি। আর লিভারে এই চর্বি নিয়ে একেক জনের ভাবনাচিন্তাও একেক রকম, অনেকটা কোভিডের মতো। কারো কারো ধারণা, লিভারের চর্বি মানেই লিভারটা শেষ – ‘অ্যান্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড’! আবার আরেক দল মানুষ আছেন যাদের কাছে এটা কোনো বিষয়ই না। আর এই দুই ধরনের রোগী নিয়েই কেটে যায় আমার মতো লিভার বিশেষজ্ঞদের ইদানীংকার সকাল-সন্ধ্যার বেশিটা সময়। কারণটা পরিষ্কার, দেশে বাড়ছে ফ্যাটি লিভারের রোগী। হেপাটাইটিস-বির পর লিভার রোগের সিলভার মেডেলটা এ দেশে এখন সম্ভবত ফ্যাটি লিভারেরই কবজায়।

সংগত কারণেই প্রশ্ন দাঁড়ায় ফ্যাটি লিভার আসলে কী? জেনে রাখা ভালো, লিভারে চর্বি থাকাটাই সংগত আর না থাকাটাই অস্বাভাবিক। আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই তার কিছুটা অংশ লিভারে জমা থাকে চর্বি হিসেবে আর শরীর যখন ঝামেলায়, অতিরিক্ত পরিশ্রম কিংবা অসুখ-বিসুখে, তখন শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তির জোগান দেয় লিভার এই সঞ্চিত চর্বি থেকে। কিন্তু ওই যে বাংলায় যেমনটা বলে, ‘বেশি ভালো ভালো না’, বেশি তেমনি ভালো না লিভারের চর্বিও।

লিভারে ৫ শতাংশ বেশি চর্বি জমলে আমরা তাকে বলি লিভারের রোগ- ফ্যাটি লিভার। মানুষভেদে লিভারে ৭০-৮০ শতাংশ চর্বিও কিন্তু আমরা দেখে থাকি। যাদের লিভারে এই বাড়তি চর্বি থাকে, তাদের কারো কারো কোনো সমস্যা হয় না- এটা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও ঠিক যে আজকের বাস্তবতায় ফ্যাটি লিভার লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের বড় কারণ। আর এ কারণেই লিভারে চর্বি থাকলে তা ঠিকঠাক মতো যাচাই-বাছাই করাটা জরুরি।

প্রথমেই জানতে হবে লিভারে চর্বি কেন জমে? কারণ অনেক। এক নম্বরেই আছে মেদবহুল শরীর। পাশাপাশি ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেশার, ডিজলিপিডিমিয়া, হাইপোথাইরয়েডিজম, হেপাটাইটিস-সি ভাইরাস ইনফেকশন, নারীদের পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রম, অ্যালকোহল পান ইত্যাদিও লিভারে চর্বি জমার বড় কারণ। এ কারণগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করলেই আমরা লিভারে চর্বি জমার ৯০ শতাংশ বেশি কারণ খুঁজে পাই। এ কারণে ফ্যাটি লিভারের কোনো রোগী আমাদের কাছে এলে আমরা আগে খুঁজে দেখি এসব রোগের কোনোটা তার আছে কি না, থাকলে চিকিৎসা দিই।

পাশাপাশি আমরা দেখে নিই লিভারে চর্বির পরিমাণ কত আর লিভারটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, না হয়নি। এসব দেখার জন্য লিভার ফাংশন টেস্টগুলো তো আছেই, সঙ্গে আছে আলট্রাসনোগ্রাম। আর এসব পরীক্ষার তালিকায় সর্বশেষ সংযোজনটি হলো ফাইব্রোস্ক্যান। ফাইব্রোস্ক্যান দিয়ে খুব সহজেই বলে দেয়া সম্ভব লিভারে চর্বির পরিমাণ কতো শতাংশ আর লিভারের ক্ষয়ক্ষতিই-বা কতোখানি। প্রশ্ন দাঁড়ায় লিভারের চর্বি কমানোর জন্য কোনো বুদ্ধি আছে কিনা? এ জন্য ধনন্তরী চিকিৎসার নাম ‘যাপিত জীবনযাত্রার পরিবর্তন’ বা ‘লাইফস্টাইল মডিফিকেশন’।

সহজ বাংলায় এর মানে, রাতে ভাতটা কম খাওয়া, খেয়েই ঘুমাতে না যাওয়া, ফাস্ট ফুড-ফ্যাটি ফুড কম খাওয়া আর সঙ্গে নিয়মিত হাঁটা। তবে কথাগুলো বলা যতো সহজ, তামিল করাটা ঠিক ততোটাই কঠিন। যে কেউ নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, ‘পৃথিবীতে অর্জনের চেয়ে বর্জন সহজ’। এই যেমন টাকাপয়সা কিংবা মানসম্মান- এ সবকিছু অর্জন করা কঠিন, অথচ বিলিয়ে দিতে লাগে না এক মিনিটও। ব্যতিক্রম শুধু এক জায়গায়, আর তা হলো মেদ-চর্বি। এ জিনিস জোগাড় করতে সময় লাগে না, ঝামেলা বাধে যখন বিসর্জনের প্রশ্নটা আসে।

পাশাপাশি লিভারে চর্বি কমানো ওষুধ আছে কিনা, এ নিয়েও প্রশ্ন অনেকের। প্রশ্ন টেলিভিশনে হেলথ শোর উপস্থাপকের আর অবশ্যই প্রত্যেক ফ্যাটি লিভারের রোগীর। ইদানীং আমাদের কাছে এর উত্তর আছে। অবিটাকলিক অ্যাসিড নামে প্রাইমারি বিলিয়ারি সিরোসিসের যে ইউএস এফডিএ অনুমোদিত নতুন ওষুধটি, একের পর এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে এটি শুধু লিভারের চর্বিই কমায় না, কমায় লিভারের ফাইব্রোসিস বা ক্ষতির মাত্রাও। সুখের কথা, আমাদের একাধিক ওষুধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কল্যাণে এ ওষুধটি এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে এবং সহজেই পাওয়াও যাচ্ছে।

ফ্যাটি লিভার, লিভারের একটি জটিল রোগ- এ কথা সত্যি। এও সত্যি যে এ রোগ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো ইদানীং আমাদের দেশেও লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের অন্যতম কারণ। কাজেই একে হেলাফেলা করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু তাই বলে এমনটা মনে করা উচিত না যে, এটি চিকিৎসার অযোগ্য কোনো রোগ। নিয়মিত চিকিৎসা আর সঙ্গে সাধনায় লিভারের চর্বি আনা যায় নিয়ন্ত্রণে আর ঠেকানো যায় লিভারের ক্ষতি।

লেখক: চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও চেয়ারম্যান, ফোরাম ফর দ্য স্টাডি অব দ্য লিভার বাংলাদেশ

 

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত