প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শর্বাণী দত্ত: কোনো কাক মরে গেলে মা কিছুক্ষণ চুপচাপ হয়ে যায়

শর্বাণী দত্ত: আমার মা বছরখানেক হলো বেশ কয়েকটা কাক পোষে। ওরা ভালোই সায়েন্টিফিক জীবনযাপন করে। অথবা কঠোর জৈনধর্ম অনুসারীও হতে পারে। সূর্যাস্তের পর আর কিচ্ছুটি খেতে আসেনা। ওদের খাবার-দাবার বলতে ভোরবেলায় ব্রেকফাস্ট, দুপুর গড়ানোর আগেই লাঞ্চের পর্ব শেষ আর কোনো কোনো দিন বিকেলে জলখাবার হলে সেটাও।
কাক নিয়ে চিন্তা করতে বসলে সঙ্গে সঙ্গে পাখি শব্দটা কেমন যেনো আসেনা; আমার মনে আছে, একবার স্কুলে কাক নিয়ে ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্সে লিখতে দিয়েছিল। আমি এবং প্রায় সবাই লিখেছিলাম “A crow is an ugly bird but it helps us with the trash”. আমাদের মিস বিরক্ত হয়ে শিখিয়েছিলেন, “No creation can be ugly, not only you should refrain from writing such regressive things, you must teach your heart.” কোনো সৃষ্টিই দেখতে কুৎসিত হয়না, তোমাদের ভেতর থেকে এই চিন্তাগুলো মুছে ফেলো। আমরা সেদিনের মতো একটু অনুতপ্ত হয়েছিলাম বৈকি, তা বলে কাককে কোনো সুন্দর পাখি মনে হয়নি কোনোদিন।
সে যাকগে। আমাদের বাড়ির পোষ্য কাকগুলোর কথা বলছিলাম। এদের সবাইকার চেহারা এক নয়। মায়ের অনুপস্থিতিতে কোনো কোনো দিন আমিও ওদের খেতে দিই, খেয়াল করে দেখেছি, একটু মন দিয়ে দেখলেই আলাদা করা যায়। একজন আছে যার মুখটা একদম সরু, অনেকটা কোরিয়ান ভি-শেইপ মার্কা। সে আবার প্রচণ্ড বদমেজাজি। যদিও আমাকে এখনো আপন করে নিতে পারেনি বলে মেজাজটাও সেরকম দেখায় না, কিন্তু খাবার দিতে দেরি হলে তারস্বরে কা-কা-কা চিৎকার করে আমার মা’কে ব্যতিব্যস্ত করে ফেলে। একদিন দেখলাম মা খুব স্বাভাবিক মুখ করে গমগমে গলায় ওর সঙ্গে গল্প করছে। বেশ একধরনের সাংসারিক আলাপ। “খাওয়ার সময় চারিদিকে এত না ছেটালে হয়না? এখানে কি দশটা চাকরানি পেয়েছো? তোমার উচ্ছিষ্ট মুছবে?” রোগাটে দেখতে রাগী কাকটা আবার কা-কা করে উঠলো।
আরেকটা ভয়ংকর দেখতে কাক আছে। ভয়ংকর বলছি কারণ সে প্রায় দানবাকৃতির। কাকেদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে একটা-দুটো রঙিন ছোট্ট পাখি চলে আসে খেতে। ওই পাখিগুলো অবশ্য সামান্য খায়। আমাদের পোষ্য কাকগুলোর মতো মহারাজা নয়। আমাদের তেনারা তো অত্যন্ত আমিষভোজী। যেদিন বাড়িতে নিরামিষ রান্না হয় সেদিন বিরসবদনে একটু আধটু মুখে দিয়েই ভেগে যায়। যাই হোক, তো সেই দানবাকৃতির কাক এই ছোট পাখিগুলোর সামান্য খাওয়াটুকুও সহ্য করতে পারেনা। এ কি ঈর্ষা নাকি লোভ না কি জানিনা। এ নিয়েও মা ওদের ধমকে দিয়েছে। যদিও লাভ বিশেষ হয়নি। মা’কে ওরা পাত্তা দেয়না। মায়ের শাসনকেও কা-কা করে উড়িয়ে দেয়। মা যে ওদের ব্যাপারে হৃদয়েশ্বরী মাতৃরূপে অবতীর্ণ হয়েছে, সে কথা ওরা বেশ বুঝে গিয়েছে।
কাক কমবেশি ডাস্টবিনের খাবার খেয়েই দিব্যি বেঁচে থাকে। মাঝেমধ্যেই ইলেকট্রিক তারের ওপর বসে হঠাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মরে যায়। আমাদের বাড়িতে কাককে এঁটো বা উচ্ছিষ্ট দেয়া নিষিদ্ধ। আমাদের খাওয়ার আগেই ওদের খাবার, মাছ, মাংস তুলে রাখা হয়। আমরা বসে বসে মা’কে দেখি, সেই ugly bird গুলোকে মা কেমন সহজভাবে ভালোবাসছে! ইদানীং বাড়ির সামনের দিকের তারগুলোয় কোনো কাক মরে গেলে মা কিছুক্ষণ চুপচাপ হয়ে যায়, ভাবে তার পোষা কাকগুলোর কেউ কি চলে গেলো?! ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত