প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আরিফা জেসমিন কণিকা: যে গানের প্রতিটি শব্দ বুকের ভেতরে আলোড়ন সৃষ্টি করে

আরিফা জেসমিন কণিকা: শোন একটি মুজিবরের থেকে” গানটির পটভূমি। বলছিলেন গানটির সুরকার অংশুমান রায় এর ছেলে ভাস্কর রায়।

“বাবা, গৌরীজেঠু (গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার), দিনেন জেঠু (দিনেন্দ্র চৌধুরী) এরা সকলেই নিয়মিত আড্ডা মারতেন। হয়তো সকালে বাজারে বেরলেন বাবা, চায়ের দোকানে আড্ডা মেরে বাজার করে তারপর বাড়ি ফিরলেন।”

“আবার কখনও আমাদের বাড়িতে বা গৌরীজেঠুর বাড়িতেও আড্ডা মারতেন সবাই। ৭১ সালের যে দিনটার কথা বলছি, সেদিনও ওই চায়ের দোকানে আড্ডা বসেছে। বাবা, গৌরীজেঠু, দিনেন জেঠুরা তো ছিলেনই, এসেছিলেন উপেন জেঠুও (উপেন তরফদার),” বাবার কাছ থেকে সেদিনের ঘটনা যেভাবে শুনেছিলেন, সেটাই বলছিলেন ভাস্কর রায়।

সেদিনের আড্ডায় যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার প্রখ্যাত গীতিকার।

দিনেন্দ্র চৌধুরী ছিলেন রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকসঙ্গীতের অধ্যাপক এবং সেই সময়ের একজন বিশিষ্ট সঙ্গীত শিক্ষক।

উপেন তরফদার ছিলেন আকাশবাণীর প্রযোজক। পুরনো দিনে যে স্পুল টেপ রেকর্ডার ছিল, সেই একটা নিয়ে এসেছিলেন। তাতে শেখ মুজিবর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণটা ওই আড্ডাতেই শুনিয়েছিলেন আকাশবাণী থেকে কেন্দ্র অধিকর্তা হিসাবে অবসর নেওয়া মি. তরফদার।

ভাস্কর রায়ের কথায়, “ওই ভাষণ আর ওপার বাংলার পরিস্থিতি নিয়েই কথাবার্তা চলছিল। কিন্তু গৌরী জেঠু একটু অনমনস্ক ছিলেন সেদিন। উনি আর আমার বাবা চারমিনার সিগারেট খেতেন।”

“প্যাকেটের ভেতরে একদিকে সাদা যে কাগজটা থাকে, সেই কাগজটা বার করে গৌরী জেঠু কিছু একটা লিখতে থাকেন। মাঝে মাঝে টুকটাক কথাবার্তাও বলছিলেন। কিছুক্ষণ পরে তিনি বাবা আর দিনেন জেঠুর হাতে ওই সিগারেটের প্যাকেটের কাগজটা দিয়ে বলেন দেখ তো চলবে কীনা এটা।”

অংশুমান রায় ওটা পড়েই বলে উঠেছিলেন – “গৌরীদা এটা আপনি আর কাউকে দিতে পারবেন না। এটা আমি সুর করব, আমি গাইব।”

তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শুধু হারমোনিয়াম দিয়ে গানটার সুর বেঁধে ফেলেছিলেন অংশুমান রায়।

“উপেন জেঠু ওই স্পুল রেকর্ডারেই গানটা রেকর্ড করে নিয়েছিলেন। সেটা আকাশবাণীর আর্কাইভে রয়েছে। আমি শুনেছি সেটা,” বলছিলেন অংশুমান রায়ের ছেলে।

“বাবার গলা, হারমোনিয়াম আর তালবাদ্য বলতে একটা শক্ত মলাটের গানের খাতায় দিনেন জেঠুর তাল ঠোকা। সংবাদ পরিক্রমা যতটা সময় ধরে হত, বঙ্গবন্ধুর ভাষণটা তার থেকে কিছুটা ছোট ছিল।”

“তাই প্রযোজক হিসাবে উপেন জেঠু ঠিক করেন যে ভাষণের মাঝে মাঝে বাবার গাওয়া গানটা বাজানো হবে। এটা প্রণবেশ জেঠুও লিখে গেছেন। ওইভাবেই গানটা বেজেছিল সেই রাতে,” জানাচ্ছিলেন ভাস্কর রায়।

আকাশবাণী কলকাতা থেকে যে ”সংবাদ পরিক্রমা” অনুষ্ঠানটি হত সেই সময়ে (এখনও প্রচারিত হয় অনুষ্ঠানটি, কিন্তু ৭১ এর যুদ্ধের আগে পরে ওই অনুষ্ঠানটি বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল), প্রণবেশ সেন ছিলেন তারই লেখক। সেই অনুষ্ঠানটি উপস্থাপন করতেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।

পরের দিন রোজকার মতোই বাজারে গিয়েছিলেন অংশুমান রায়। ফেরার পথে সেই চায়ের দোকানে ঢুকতেই অনেকে মিলে জড়িয়ে ধরেন তাঁকে।

আবার সেদিন অনুষ্ঠান সম্প্রচার হয়ে যাওয়ার পরের দিন যখন উপেন তরফদার আকাশবাণী দপ্তরে ঢুকেছেন, তখন তার ডাক পড়ে কেন্দ্র অধিকর্তার ঘরে।

“আমাদের বাড়িতে অনেক পরে একটা আড্ডায় উপেন জেঠু বলেছিলেন যে তিনি সরাসরি অধিকর্তার ডাক পেয়ে একটু বোধহয় ঘাবড়িয়ে গিয়েছিলেন। ঘরে ঢুকে তিনি দেখেন আরও অনেকে সেখানে উপস্থিত। কয়েক মুহূর্ত পরে সবাই বলে ওঠেন এটা আপনি কী করেছেন জানেন?”

“উপেন জেঠু বোধহয় তখনও ভাবছিলেন যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মাঝে মাঝে বাবার গাওয়া ওই গানটা বাজিয়ে বোধহয় তিনি অন্যায় করে ফেলেছেন। তবে তার ভুলটা ভাঙ্গতে সময় লেগেছিল কয়েক সেকেন্ড। সবাই বলেন যে ঐতিহাসিক একটা অনুষ্ঠান করে ফেলেছেন আগের রাতে,” বলছিলেন ভাস্কর রায়।

পর পর বেশ কয়েকবার ওই গান আর শেখ মুজিবর রহমানের ভাষণটা সম্প্রচারিত হয় ওই রাতেই।

আর এপ্রিল মাসের ২২ তারিখ গানটি ‘হিন্দুস্তান রেকর্ড’-এর স্টুডিওতে রেকর্ড করা হয়।

৪৫ আর পি এমের রেকর্ডটির একদিকে ছিল ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে’ গানটি। গানের সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন দিনেন্দ্র চৌধুরী।

ওই গানের একটা ইংরেজি অনুবাদও হয়েছিল: A Milliion Mujiburs Singing নামে।

রেকর্ডের একপিঠে ছিল বাংলা আর উল্টোপিঠে ওই একই দিনে রেকর্ড করা হয় ইংরেজি অনুবাদটিও। অংশুমান রায়ের সঙ্গে ইংরেজিতে গেয়েছিলেন করবী নাথ।

মুক্তিযোদ্ধারা অনেকেই নানা জায়গায় বলেছেন বা লিখেছেন যে আকাশবাণীর কলকাতা কেন্দ্র থেকে যখনই এই গানটা বাজানো হত, তখনই নতুন করে লড়াইতে উদ্বুদ্ধ হতেন তারা। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত