প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এ বি এম কামরুল হাসান : জরিপে উঠে এসেছে মান আর জ্ঞান, দুটোরই অভাব

সকালে যাত্রাপথ পরিবর্তন করতে হলো। যাবার কথা কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে। ৪৫ কিলোমিটার দূরে। ২৪ ঘন্টার ডিউটি। যেতে হলো মূল কর্মস্থলে। সেটি নন-কোভিড হাসপাতাল। গত রাতে শেষ রোগীটা মারা যাওয়াতে এই পরিবর্তন। ব্রুনেই এর কোভিড হাসপাতাল এই মুহূর্তে রোগী শূন্য। ৯৯ দিনের কোভিডযুদ্ধে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়নি। শুনলাম, চীনা প্রতিনিধি দল বলে গেছে- তাদের হাসপাতালে আক্রান্তের সংখ্যা শুন্য। কিন্তু বাংলাদেশে আক্রান্ত হচ্ছে, মরছে। স্কয়ার হাসপাতালের মির্জা নাজিমুদ্দিন। ইমপালস হাসপাতালের জলিলুর রহমান। বি আর বি হাসপাতালের সাজ্জাদ হোসেন। এরা সবাই আইসিইউ প্রধান। মারা গেছেন। ঢাকা মেডিকেলের আইসিইউ প্রধান মোজাফ্ফর হোসেন। আইসোলেসনে আছেন। স্বাস্থ্যকর্মীরা মনোবল হারাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে ? কেউ কি ভাবছেন ? কারণ খুঁজছেন ? কারণ পেলেই তো সমাধান।

ঝটপট একটা জরিপ করে ফেললাম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, চিকিৎসকদের একটি গ্রুপে। ২৪ ঘন্টায় অংশ নিয়েছেন চার শতাধিক চিকিৎসক। মানহীন সুরক্ষা সামগ্রীকে প্রায় সবাই দায়ী করেছেন এর জন্য। সুরক্ষা সামগ্রীর অপর্যাপ্ততা এবং এর পরিধান-খোলার প্রশিক্ষণকে দায়ী করেছেন প্রায় অর্ধেক চিকিৎসক। প্রায় ১৬ শতাংশ চিকিৎসক মনে করেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের পিপিই বিষয়ে জ্ঞান এর অভাব রয়েছে।ফেসমাস্ক এর লিকটেস্ট না করাকে দায়ী করেছেন ৮ শতাংশ চিকিৎসক। একজন লিখেছেন, “আজ হাসপাতালে এসে দেখি দুই রুমে দুইটা ব্যবহার করা পিপিই খুলে রাখা, কমন সেন্স এর অভাব।” আরেকজন মন্তব্য করেছেন, “একজনকে দেখেছি একবার গগলস ধরে নাড়াচ্ছে, একবার মাস্ক ধরে টানাটানি করছে। কাভারঅল পরে গরমে অস্থির হয়ে এসব করছে মনে হলো।” জরিপে দুটো জিনিস উঠে এসেছে। মান আর জ্ঞান। দুটোরই অভাব। পিপিই এর মান আর পিপিই বিষয়ে জ্ঞান। রেস্পিরেটর মাস্ক টাইট করে পরতে হয়। কোনো লিক থাকলে চলবে না।ভাইরাস ঢুকে যাবে। অন্তত যখন পজেটিভ রোগীর কাছে থাকলে। সবার মুখে সব মাস্ক ফিট হয় না। সেটা কখনো টেস্ট করার ব্যবস্থা করেছেন ? এখনো সময় আছে। গলদ ঠিক করতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের বাঁচাতে হবে। তাদের মনোবল ফেরাতে হবে।

কিভাবে ঠিক করবেন ? প্রথমে আসুন মান নিয়ে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাকে ডাকুন। সংগৃহিত পিপিই সামগ্রীর মান দেখতে বলুন। সংবাদপত্রের ছবিতে দেখেছি জুপিটার সুট (যেটাকে অনেকে ওভার অল গাউন বলে) এর নিচে কি পরা আছে সেটা দেখা যাচ্ছে। জানিনা কি জাতের সুরক্ষা সামগ্রী এটা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনেককেই বলতে শুনেছি, আমরা মানসম্মত দিচ্ছি, খারাপগুলো দানের মাল। দানকারীদের বলুন, কেন্দ্রীয়ভাবে দান করতে। সেটারও মান যাচাই করুন বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে।মানসম্মত না হলে ফেরত দিন, সবার মান বাঁচান। স্বাস্থ্যকর্মীদের জীবন বাঁচান। আরেকটা কথা, সুরক্ষা সামগ্রীর পুনর্ব্যবহার। এটা সবাই অহরহ করছে, করছে মানে বাধ্য হচ্ছে। পাচ্ছে না তাই। এটা আমরা করি নাই, দেখি নাই, শুনি নাই। পুনর্ব্যবহার করা যায় কিনা খোঁজ নেন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাকে জিজ্ঞেস করেন, সিডিসি-কে জিজ্ঞেস করেন।

এবার আসুন জ্ঞান নিয়ে। স্বাস্থ্যকর্মীদের পিপিই বিষয়ে জ্ঞানের অভাব রয়েছে। চিকিৎসকরাই বলছেন এটা। চিকিৎসকদের বাইরে আছে নার্স, আয়া, বুয়া, দারোয়ান, পরিচ্ছন্ন কর্মী। সবাইকে সতর্ক হতে হবে। এটা টিম ওয়ার্ক। একজন ভুল করলে সবাই আক্রান্ত হবে। এটার সমাধানে আপনাকে তিনটি কাজ করতে হবে। প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণ আর প্রশিক্ষণ । এর কোনো বিকল্প নেই। চিকিৎসক, নার্স এবং প্রতিটি স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য প্রয়োজন কার্যকর প্রশিক্ষণ। প্রতিটি হাসপাতাল থেকে কেন্দ্রে ৩/৪ জন করে প্রশিক্ষক পাঠান। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তা নেন। কেন্দ্রীয়ভাবে প্রশিক্ষণ দেন। পরে ওই প্রশিক্ষকগণ তার হাসপাতালের সব স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিবেন। প্রশিক্ষণ মানে তাত্ত্বিক নয়, ব্যবহারিক। কার কোন মাস্ক ফিট হবে, লিক আছে কিনা- সেটাও।পরে এই প্রশিক্ষকরা পালাক্রমে ডিউটি করবে। সবার পিপিই পরিধান-খোলা পর্যবেক্ষণ করবে, সাহায্য করবে। এগুলো করতে সময় লাগবে বড় জোর এক সপ্তাহ। আমি নিজে এসব প্রশিক্ষণ পেয়েছিলাম প্রথম পজিটিভ রোগী সনাক্তের একমাস আগে। ১৬ জুন ২০২০। লেখকঃ প্রবাসী চিকিৎসক, কলামিস্ট। ফেইসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত