প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পৃথিবীর এই ক্রান্তিকালে সাংবাদিকরা ঘরে থাকলে কি কি পেতেন না?

শোভন দত্তের ফেসবুক থেকে : ‘তথ্য দিলে কি পেট ভরবে? তথ্য লাগবে না- সাংবাদিক‌রাও ঘরে থাকুন। করোনা দেশে আসার প্রথমভাগে অনেকের ছিল এমন মন্তব্য। চলেন তো- গত কয়েকদিনের নানা রিপোর্টের ফল বিশ্লেষণ করে দেখি। রিপোর্ট করে তথ্য দিয়ে আসলেই কি হয়?

* দেশব্যপী চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের পিপিই নেই- রিপোর্ট হল, যেমন‌ই হোক পিপিই উৎপাদন শুরু হল। দেশব্যাপী হাসপাতালে তেমন তেমন হলেও কয়টা পৌছাল।

* করোনা নিয়ে আজব থিওরি, স্বপ্নে পাওয়া ঔষধ, কথা বলা নবজাতক হ্যান ত্যান নানা গুজবে করোনাকে পাত্তাই দিচ্ছিল না দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী। রিপোর্ট হল- তাতে ধীরে ধীরে করোনা কি, কেন হয়, কিভাবে ছড়ায়, কিভাবে বাঁচতে হবে- শেখানো হল।

*বিদেশ থেকে লোক ফেরত আনা হল। কোয়ারেন্টাইনের আয়োজন যাচ্ছেতাই। রিপোর্ট হল, মান বাড়লো। প্রবাসীদের হ‌ইচ‌ই আর খরচ এড়াতে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানোর পর নিয়ন্ত্রণ না রাখায় তারা ঘুরেফিরে রোগ ছড়াতে লাগলো। মারাত্নক প্রশ্ন+ রিপোর্ট হল, নজরদারি বাড়লো।

* করোনা বিশ্বব্যপী মারাত্নক হতে থাকলেও দেশের কর্তৃপক্ষ ভাবলেশহীন। জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের বদলে আর‌ও বাড়ানোর সব আয়োজন চলতে থাকলো। ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জ্বালা আর রিপোর্টের ঠেলায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ শুরু হল।

*ছুটি হল। গণহারে লোকজন বেড়াতে যেতে শুরু করলো গিজগিজে ভিড় নিয়ে। রোগ ছড়াতে শুরু করলো দেশব্যপী। রিপোর্ট হল।চলাচল নিয়ন্ত্রণে সরকার সক্রিয় হল।

* টেস্টের অভাবে দেশে করোনা আক্রান্ত রোগী নেই। একে একে এ নিয়ে লাগাতার অনুসন্ধান আর প্রশ্ন সমালোচনার মুখে বাড়লো পরীক্ষা, সনাক্ত হতে থাকলো রোগী।

* হাসপাতাল আর ভেন্টিলেটরের অভাব। রোগী বাড়লে চিকিৎসা দেবে ক‌ই? সে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে রিপোর্ট হতে থাকলো। সরকারি বেসরকারি তৎপরতা বাড়লো সুযোগ সুবিধা বাড়াতে, নতুন অবকাঠামো তৈরিতে।

* লকডাউনে বাড়তে থাকলো দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের ভোগান্তি। রিপোর্ট হল। শুরু হল সরকারি বেসরকারি ত্রাণ তৎপরতা।

* গার্মেন্টস, পোল্ট্রি, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ইত্যাদি ডুবতে শুরু করা নিয়ে রিপোর্ট হল। তাদের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা হল।

* সরকার প্রণোদনা ঘোষণামাত্র লোভী গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা কোয়ারেন্টাইন, লকডাউন সবকিছু ধ্বংস করে শ্রমিকদের টেনে আনলো। রিপোর্ট+ সমালোচনা হল গণমাধ্যমে। কমে গেল জোর করে আনার আত্মবিধ্বংসী কার্যকলাপ। বেতন দিচ্ছে না? রিপোর্টের পর বেতন পাঠানো শুরু হল শ্রমিকদের হাতে বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে।

* ত্রাণ ঠিকমত লোকজন পাচ্ছে না। ত্রাণ চুরি হচ্ছে। রিপোর্ট হল। কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে শুরু করলো।

* রাস্তায় ত্রাণ বিতরণে রোগ ছড়িয়ে যাওয়ার বিপদের চিত্র গণমাধ্যমে আসার পর বাসায় বাসায় ত্রাণ বিতরণ শুরু।

* রোগী হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে চিকিৎসা পাচ্ছে না। কেউ মারাও যাচ্ছে। রিপোর্ট হল। রোগীদের চিকিৎসা এবং টেস্টের সুযোগ বাড়লো। বেসরকারি হাসপাতালদের‌ও এ বিপদ মোকাবেলায় নামানোর প্রস্ততি নিতে বাধ্য করা শুরু হল রিপোর্টের চাপে।

*রোগী তথ্য গোপন করছে, অন্যদের তাই বিপদ বাড়ছে। রিপোর্ট হল। সমস্যাটা আলোচনার টেবিলে জায়গা পেল।

* কুয়েত মৈত্রীতে নার্সদের খাবার নেই, রোগীদের খাবারসহ নানা জিনিসের অভাব। নার্সদের সেই কান্না রিপোর্ট হল। খাবারসহ সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো শুরু হল।

* চিকিৎসকদের অযথা সাময়িক বরখাস্ত করা হল, রিপোর্টের পর সেসব সিদ্ধান্ত আবার বাদ গেল। এমন অসংখ্য আজব চিঠি দিয়ে পরে আবার উঠিয়ে নিল।

* ব্যাংকারদের বিপদ নিয়ে রিপোর্ট হল। তাদের সুযোগ সুবিধা, প্রণোদনা বেড়ে গেল।

* ঢাকার বাইরে টেস্টের ব্যবস্থা নেই। রিপোর্ট হল, ব্যবস্থা তৈরি হল।

* ডাক্তাররা কাজ করতে গিয়ে মারা যাচ্ছে। রিপোর্ট হল। প্রণোদনা ঘোষণা এসে গেলো।ভাল হোটেলে আবাসনের ঘোষণা এল। ভাল হোটেল কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে ঘোষণা দিয়ে দেয়ায় রিপোর্টে তা তুলে ধরা হল। কর্তৃপক্ষ আবার ধাক্কা খেলো।

*নকল মাস্ক‌, গ্লাভস ইত্যাদি নিয়ে রিপোর্টের পর তা আলোচনায় এসেছে। সমাধান কি আসে দেখা যাক।

যাহোক- এমন অসংখ্য খারাপ কাজ করায় সব সাংবাদিককে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হোক। তাই না? তারা বাসায় থাকুক। বাইরে দেশবাসীর তো তাদেরকে দরকার নেই। তথ্য দিয়ে কি হয়?তথ্য দিয়ে কি পেট ভরে? সাংবাদিকরা তো অমুকের দালাল,হলুদ, চিকিৎসকদের শত্রু, সুশীলগিরি দেখায়।

আচ্ছা- প্রধাণমন্ত্রীর একখানা ধন্যবাদ আর আপনাদের যৌক্তিক-অযৌক্তিক গালি ছাড়া সাংবাদিকরা কি পেয়েছে বলতে পারেন? তাদের খোঁজ কে নিয়েছে?

আজ পর্যন্ত গণমাধ্যমের ১৮ জন করোনা আক্রান্ত। চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের পর পেশাগত দিক থেকে সংখ্যার বিচারে এটাই সর্বোচ্চ আক্রান্ত। পরিবারশুদ্ধ আক্রান্ত এই মানুষদের পাশে কে আছে? নিরাপত্তা সামগ্রী, ঝুঁকি ভাতা তো দূরের কথা- তারা সবাই গত মাসের বেতনটা পেয়েছে কিনা জানেন কি? কতজনকে বাড়িওয়ালা, এলাকাবাসী চাকরি ছাড়তে বা বাড়ি ছাড়তে বলছে-খোঁজ রাখেন?

সন্তান কিংবা বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা নষ্টের ভয়ে কতজন সাংবাদিক তাদের পরিবারের লোকজন থেকে দূরে সরে থাকছে জানেন? সাংবাদিকের ত্যাগ, ঝুঁকি মোকাবেলা, করুণ অবস্থা নিয়ে কোথাও কেউ আবেগী পোস্ট কিংবা বীর হিসেবে স্যালুট দিতে ব্যস্ত না, ট্রল করতে ব্যস্ত।

তবু কি ১ জন সাংবাদিক‌ও খুঁজে দিতে পারবেন যিনি ঝুঁকির ভয়ে পালিয়েছেন? পৃথিবীতে এমন কোন পেশা নেই যাতে শতভাগ নির্ভুল , নিষ্পাপ মানুষ কাজ করে। কিন্তু ভুলটুকুই কি সব?একজন অপরাধ করলে পেশাটির সবাই কি অপরাধী?

বুকে হাত দিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করুন তো- সাংবাদিকরা নিজের এবং পরিবারের জীবন বাজি রেখে এই দুঃসময়ে কাজ না করলে পরিস্থিতিটা আসলে কেমন হত? সাংবাদিকমুক্ত দেশ কেমন হত?”

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত