প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মানুষ বাঁচাতে লকডাউনে যেন মানুষের মৃত্যু না হয়

মঞ্জুরুল আলম পান্না : করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে লকডাউনের মধ্যে বিশ্ব যে থমকে আছে তা সহসাই উঠছে না। ভাইরাসটিতে আক্রান্ত রোগী এবং মৃত্যুর সংখ্যা হয়তো একটা পর্যায়ে গিয়ে থেমে যাবে। কিন্তু কাজ হারানো মানুষের সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বা এর অর্থনৈতিক কিংবা সামাজিক অভিঘাত কতোটা ভয়ঙ্কর হবে সে সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কেউ। জাতিসংঘ তীব্র এক অশনি সংকেতের কথা জানিয়েছে গত শনিবার। বলেছে, বিশ্বজুড়ে দেখা দিতে পারে ভয়াবহ খাদ্য সংকট। এরই মধ্যে সারা পৃথিবীতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন কয়েক কোটি মানুষ। গত ৩১ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিলে করা বেসরকারি সংস্থা ব্রাকের এক জরিপ বলছে, দেশের নিম্ন আয়ের ১৪ ভাগ মানুষের ঘরে এখনই নেই কোনো খাবার। করোনাভাইরাসের পূর্বে আয়ের ভিত্তিতে জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ২৪ শতাংশ ছিলেন দারিদ্র্যরেখার নিম্নসীমার নিচে। এখন তা দাঁড়িয়েছে ৮৯ শতাংশে। ত্রাণের দাবিতে বেশ কয়েক জেলায় ভুখা মিছিল হয়েছে, মানববন্ধন হয়েছে, সড়ক অবরোধ হয়েছে। পেটের ক্ষুধায় ত্রাণ ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাও ঘটেছে।
করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে লকডাউন করে রেখেও মানুষের ঘরের বাইরে আসার ঠেকানো যাচ্ছে না। শুধ অসচেতনতার কারণেই যে এমনটি ঘটছে, তা নয়। পেটের যন্ত্রণায় যেনতেন কাজের খোঁজে নামতে বাধ্য হচ্ছেন মানুষ। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদঅমর্ত্য সেন, তার উত্তরসূরি অভিজিৎ ব্যানার্জি ও এস্থার ডুফলো এবং অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বলেছেন, ‘মানুষের ভাতের ব্যবস্থা করতে না পারলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করতে ভারতজুড়ে ডাকা ‘লকডাউন’সফল হবে না।’ তাদের বক্তব্য, ‘কেউ যখন ভাবছেন কী করে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচা যাবে, কেউ তখন ভাবছেন, কোথায় দুটো ভাত পাওয়া যাবে। কাজেই তার ব্যবস্থা করতে হবে।’ তাদের এই মূল্যায়ন কেবল ভারতের জন্যই নয়, প্রতিটি দেশের জন্য বরং যথার্থ।
পশ্চিমবঙ্গে ৮ কোটি মানুষকে বিনামূল্যে ৬ মাসের জন্য চাল দেয়ার কথা ঘোষণা করেছেন মমতা ব্যানার্জী। বাংলাদেশেও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ১০ টাকা কেজিতে চাল দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কিন্তু সেই ১০ টাকাই বা কোথায় পাবেন সব হারানো মানুষেরা। দরিদ্র প্রতিটি পরিবারকে মাসে ২/৩ হাজার করে টাকা দেয়ার কথাও জানানো হয়েছে। পাঁচজন মানুষের একটা সংসারে ওই টাকায় কী হয়, তা আমাদের নীতি নির্ধারকরা ভেবে দেখার সময় পাননি নিশ্চয়। আর ১০ টাকা কেজির সরকারি সেই চাল নিয়েও বা যে তুঘলকি কা- ঘটছে তাতো সবাই দেখছি। বৈশ্বিক মহামারীর এই সময়টিতেও লুটেরা-দুর্নীতিবাজরা থেমে নেই। না খেয়ে থাকা লাখো-কোটি মানুষের মুখের খাবার চুরি করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছে না মানুষরূপী জানোয়ারগুলো। গুদামের ভেতরে, খাটের নিচে, মেঝে ফুঁড়ে, মাটির নিচ থেকে বের হচ্ছে শতশত বস্তা চাল। ভ্রাম্যমান আদালত তাৎক্ষণিকভাবে এদের কয়েকজনকে কয়েক মাস করে কারাদ-ও দিয়েছে। এই দুর্যোগে এতো অল্পতেই কি ছেড়ে দেয়া উচিত ভয়ানক চালচোরদের।
ওদের জন্য প্রয়োজন আরও কঠোরতম শাস্তির। বিশেষ ক্ষমতা আইন’ ১৯৭৪-এর ২৫ নম্বর ধারা প্রয়োগ করতে হবে। ওই ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে কালোবাজারি আর মজুতদারদের শাস্তি মৃত্যুদ- অথবা ১৪ বছরের কারাদ-। আইন অনুযায়ি এক মাসের মধ্যে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।
আমি আইনের ছাত্র নই। তবুও মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে রাষ্ট্রপতির বিশেষ অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে চালচোরদেরকে বিশেষ শাস্তির আওতায় আনা যায়। আমার বিশ্বাস, এই কাজটি করতে পারলে দেশের কোনো মানুষই শেখ হাসিনা সরকারের কোনো প্রকার সমালোচনা করবে না, বরং প্রশংসাই কুড়াবে। করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে জিও স্ট্র্যাটেজিক্যাল পরিবর্তন আসছে এবং আসবে। যুদ্ধাপরাধীদের উত্তসূরিসহ অনেকেই ওঁৎ পেতে আছেন যেকোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে বর্তমান সরকারের পতন ঘটাতে। অস্থির এই সময়ে চালচোরদের প্রায় সবাই সরকারি দলের নেতাকর্মী বলেই জানা যাচ্ছে। অনাহারী মানুষের কষ্টকে পুঁজি করে এই মুহূর্তে এ ধরনের কোনো পরিস্থিতি পুরো দেশের জন্য ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে। দরিদ্র মানুষের ভাতের কষ্টটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বৈশ্বিক এই দুর্যোগে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও মাঠে নেমেছেন সেনা সদস্যরা। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য গৃহীত যেকোনো কর্মসূচি তাদের হাতে ছেড়ে দেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘মানুষকে বাঁচাতে লকডাউনের সময়ে মানুষ যদি কর্মসংস্থান হারাতে থাকেন, তাহলে রোজগারের সব রাস্তাই বন্ধ হয়ে যাবে। মানুষের হাতে টাকা থাকবে না। তখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে যেখানে দেখা যাবে, শেষে খাদ্যের অভাবে মানুষকে মরতে হচ্ছে।’। লেখক : সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত