প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জনশূন্য ময়দানে পোপের প্রার্থনা ও ছোট্ট দেশ ভ্যাটিক্যানের বিশালত্ব!

আসাদুজ্জামান সম্রাট: যেখানে এক সঙ্গে চার লাখ মানুষ জড়ো হতে পারে। সেই সেন্ট পিটার্স স্কোয়ারে জনশূন্য ময়দানের দিকে তাকিয়ে পোপ ফ্্রান্সিস সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছেন, ‘প্রভু, পৃথিবীকে আশীর্বাদ করো। আমাদের দেহকে সুস্থ রাখ। তুমি ভয় না পেতে বলেছ। কিন্তু আমরা দুর্বল হয়ে পড়ছি। ঘন অন্ধকারে ঢেকে গেছে আমাদের পথঘাট, শহর। কেড়ে নিচ্ছে জীবন। আমাদের তুমি রক্ষা করো প্রভু।’ করোনায় বিপর্যস্ত পৃথিবীর অন্য স্থানের মতো পৃথিবীর সবচে’ ছোট দেশ ভ্যাটিক্যান সিটি আজ জনশূন্য। পোপ ফ্রান্সিসের প্রার্থনা কবুল হোক, সারা পৃথিবীর মানুষ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরুক। যেমন এক স্বাভাবিক সময়েই আমি ঘুরে এসেছিলাম পৃথিবীর ছোট্ট দেশ ভেটিক্যান সিটি।

সম্ভবত সিক্স কিংবা সেভেনে পড়ার সময়ে আমাদের ভূগোল শিক্ষক পৃথিবীর সবচে’ ছোট দেশের উদাহরণ দিতেন আমাদের বাজার দেখিয়ে। বলতেন, ‘লম্বায় এই খেয়াঘাট থেকে বাজারের ব্রিজ পর্যন্ত আর কলেজ থেকে শর্ষিণা মাদ্রাসা পর্যন্ত হবে পৃথিবীর সবচে’ ছোট দেশ ভেটিক্যান সিটি। এর মধ্যেই রাজধানী, নিজস্ব মুদ্রা, পরিবহন, সিল এমনকি আর্মিও আছে। লোকসংখ্যা আমাদের স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের চেয়ে কম। অর্থাৎ এক হাজারেরও কম।

তখন থেকেই মাথায় ঘুরপাক খায় কেমনে এতো ছোট দেশ হয়। কালক্রমে এর প্রভাব-প্রতিপত্তি জেনেছি। দেখার সুযোগ কয়েকবার এলেও গত ডিসেম্বরেই প্রথম যাই পৃথিবীর ছোট্ট দেশটি দেখতে। আগেভাগেই ভেটিক্যান সম্পর্কিত ধারনা থাকায় লক্ষ্য নির্দিস্ট করেই ভেটিক্যানে যাই। ১২ ডিসেম্বর সকালে রোমে পৌছি। সকালের নাস্তা সেরেই পা বাড়াই কলোসিয়ামের দিকে। সে গল্প আরেকদিন বলবো। আগেই পড়েছি টিবের নদীর তীরে ভেটিক্যান পাহাড়ের উপর ভেটিক্যান সিটি অবস্থিত। কিন্তু আমি নদী খুঁজে পেলাম না। ছোট্ট যে ক্যানেল তা প্রশস্ততায় চন্দ্রিমা উদ্যানের লেকেরও কম। সেন্ট এ্যাঞ্জেলো ব্রিজ পাড় হয়ে হাটি হাটি পা করে পৌছে গেলাম ভেটিক্যানে। ব্রিজের উপর দাড়িয়ে দূরে দাড়িয়ে থাকা দ্বিতীয় শতাব্দীতে নির্মিত সেন্ট এ্যাঞ্জেলো ক্যাসেল দেখলাম।

ভেটিক্যানে এসে এক অন্যরকম প্রশান্তির ছায়া পেলাম মনে হয়। আগে থেকেই একটা উত্তেজনা কাজ করছিল মনে মনে। হয়তো ছোট্টবেলা থেকে গড়ে ওঠা আকর্ষণ চোখের সামনে দেখা এক অন্যরকম অনুভুতি। উত্তর-পশ্চিম রোমের ভ্যাটিকান পাহাড়ের উপর একটি ত্রিভুজাকৃতি এলাকায়, টিবের নদীর ঠিক পশ্চিমে এই ভ্যাটিকান সিটি। দক্ষিণ-পশ্চিমের পিয়াৎসা সান পিয়েত্রো বা সেইন্ট পিটার চত্বর বাদে বাকি সবদিকে ভ্যাটিকান শহর মধ্যযুগ ও রেনেসাঁর সময়ে নির্মিত প্রাচীর দিয়ে রোম শহর থেকে আলাদা করা। তবে নেই কোনো চেক পোস্ট, নেই কোনো ইমিগ্রেশনের ঝামেলা। ইউরোপের এই একটি বিষয় আমার খুব ভালো লাগে। সেনজেন ভিসা থাকলেই ২৯টি দেশ ঘোরা যায় নির্বিঘ্নে। এই দেশগুলোর মধ্যে কোনো কাটাতার নেই, নেই কোনো প্রাচীর কিংবা নিরাপত্তা চৌকি। কখন এক দেশ থেকে অন্যদেশে ডুকে পড়েছেন বোঝার উপায় নেই।ধর্মীয়, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক দিক থেকে ভ্যাটিক্যান বেশ সমৃদ্ধিশালী। এটি রোমান ক্যাথলিক গির্জার বিশ্ব সদর দফতর হিসেবেও কাজ করে। ভ্যাটিকান শহর মধ্যযুগ ও রেনেসাঁর সময়ে নির্মিত প্রাচীর দিয়ে রোম শহর থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রাচীরের ভিতরে আছে উদ্যান, বাহারি দালান ও চত্বরের সমাবেশ। সবচেয়ে বড় দালানটি হলো সেন্ট পিটারের ব্যাসিলিকা; যা রোমান ক্যাথলিকদের প্রধান গির্জা। ভ্যাটিকান সিটিতে রয়েছে একটি মহাকাশ অবজারভেটরি, লাইব্রেরি ভ্যাটিকান। ভ্যাটিকান সিটি শেষ পোপীয় রাষ্ট্র। ক্যাথলিক গির্জা বহু শতাব্দী ধরে মধ্য ইতালির বেশ কিছু এলাকাতে এই রাষ্ট্রগুলো স্থাপন করেছিল, যার শাসনকর্তা ছিলেন পোপ।

বলে রাখা ভালো, ভেটিক্যান সিটির কয়েকটি অংশ রয়েছে। সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায় ডুকতে কোনো টিকিটের বালাই নেই। মিউজিয়াম ও লাইব্রেরীতে ঢুকতে হতে টিকিট কাটতে হবে। আপনি চাইলে অনলাইনে অথবা সরাসরি গিয়েও কাটতে পারবেন। এছাড়া ভেটিক্যানে ডোকার পরে অনেক ট্যুর এজেন্সির লোকজন এসেও আপনাকে টিকিট অফার করবে। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, নিজে একাকী না ঘুরে গ্রæপের সঙ্গে গাইডসহ ঘুরলেই আপনি এর আসল মজাটা পাবেন। আমার অনলাইনে টিকিট কেনা ছিল বলে সময়ক্ষেপন খুব একটা হয়নি। তবে সিকিউরিটি চেকে কিছুটা সময় ব্যয় হয়। কারণ, তাবৎ পৃথিবীর আকর্ষণ এই ভেটিক্যান দেখতে প্রতিবছর কোটি পর্যটক আসে। আমরা সিকিউরিটি চেক করে গাইডের কাছ থেকে হেডফোন ও রিসিভার নিয়ে কানে গুজে এগুতে থাকলাম। গাইড ইংরেজীতে খুব সাবলীলভাবে ইতিহাস বর্ণনা করলেন এক একটি পেইনটিং, ভাস্কর্য ও স্থান দেখিয়ে। তবে টাকা খরচ করলেও ভেটিক্যানের অনেক কিছুই আপনি দেখতে পারবেন না, আমিও পারিনি। তা নিয়ে মনে আক্ষেপ থাকাটাই স্বাভাবিক।

পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক পট পরিবর্তন ও গুরুত্বপূর্ণ সব ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী এই ভেটিক্যান। সবচেয়ে রহস্যের জায়গাটি হলো ভ্যাটিকান আর্কাইভ বা সংগ্রহশালা। এটিকে ‘স্টোর হাউস অব সিক্রেট’সও বলা হয়ে থাকে। বিগত শতাব্দীগুলোতে বিভিন্ন সময়ে পোপদের আদান-প্রদানকৃত নানা চিঠিপত্র, অধ্যাদেশ এবং এমনই অনেক ঐতিহাসিক জিনিস নিয়ে গড়ে উঠেছে ভ্যাটিকানের এ সংগ্রহশালাটি। সপ্তদশ শতকে পোপ পঞ্চম পলের হাত ধরে শুরু হয়েছিল এর যাত্রা। ভ্যাটিকান সিটি আর্কাইভ বা সংগ্রহশালাতে সাধারণ তো নয়ই; ভ্যাটিকান সিটির কেউই ঢোকার অনুমতি পান না। খুব অল্প সংখ্যক স্কলাররাই এখানে প্রবেশ করতে পারেন। মহামান্য পোপের অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করতে হয় এখানে। পোপোর অনুমতি ছাড়া সেটি একেবারেই অসম্ভব। ১৮৮১ সালে পোপ ত্রয়োদশ লিওর অনুমোদনের আগ পর্যন্ত ভ্যাটিকানের এ সিক্রেট আর্কাইভে গবেষকদেরও প্রবেশাধিকার ছিল না। তিনিই প্রথম সেই ব্যবস্থা চালু করেন। শুধু গবেষণার কাজেই স্বল্প সময়ের জন্য প্রবেশের অনুমতি পাওয়া যায় এই সংগ্রহশালাতে।

সংগ্রহশালাতে রয়েছে ৮০০ শতক থেকে বিভিন্ন ডকুমেন্ট। আর্কাইভে পাওয়া ডকুমেন্টগুলোর মাঝে সবচেয়ে পুরনোটি ৮০৯ খ্রিস্টাব্দের। এই সংগ্রহশালাতেই রয়েছে বাইবেলের সবচেয়ে পুরনো ভার্সনগুলো এবং এটি অনেক গোপনীয়তার সঙ্গে সযত্নে লুকানো আছে। হাজার বছরের পুরোনো দলিল, বই, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির হাতে লেখা ডায়েরি, গ্যালিলিও’র বইসহ অনেক কিছুই আছে। এই সংগ্রহশালায় প্রায় ৮৪ হাজার বই আছে। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টান মিশনারি, প্যাগান আরও কিছু ধর্ম আর মতবাদের অনেক গোপন ডকুমেন্ট সংরক্ষিত আছে রহস্যময় এই সিক্রেট আর্কাইভে। এছাড়া ক্যাথেলিক গির্জার অর্ধেক সম্পত্তিই রয়েছে যুগ যুগ ধরে। দূর্লভ পেইন্টিং, বই, ভাস্কর্য, দামি রত্ন-সম্পদেও জন্য বিশ্বব্যাপী ভেটিক্যানের এতো এতো প্রভাব।

২২ ধরনের আলাদা আলাদা সংগ্রহশালা নিয়ে গড়ে উঠেছে ভ্যাটিকান জাদুঘর। মিশরীয় সংগ্রহ, ইৎরুস্কান সংগ্রহ, বোর্গিয়া ডিপার্টমেন্ট, রোমান চিত্রকলা, রাফায়েল কামরা, সিস্টেইন চ্যাপেল ইত্যাদি। গাইডকে অনুসরণ করে এগুতেই প্রথমেই সূর্য দেবতা অ্যাপোলোর ভাস্কর্য পরে। এরপর রোমানদের তৈরি পশু পাখির শ্বেত-পাথরের ভাস্কর্যের সংগ্রহশালায়। এ এক অন্যন্য জগৎ, চারপাশের নিখুত প্রাণীমূর্তিগুলো যেনো জীবন্ত হয়ে আছে। পরে ডুকলাম মিশরীয় সংগ্রহশালা দিকে। এখানে মূল আকর্ষণ হাজার হাজার বছর আগের মিশরীয় মমি! এর পরে একের পর এক অমূল্য শিল্পকলায় থরে থরে সাজানো গ্যালারিগুলো, দীর্ঘপথ ধরে চলে গেছে। কোনটাতে ট্রাপেস্ট্রির বিশ্ব সেরা সংগ্রহ, কোনটাই ফ্রেসকো, কোনটাতে প্রাচীন ম্যাপের আদলে পেইন্টিং এর ছড়াছড়ি। এখানে এলে বিভ্রান্ত হতে হয় কোনটা রেখে কোনটা দেখবো। চিত্রকর্ম আর সুনিপুণ হাতের সূক্ষ কাজ, হাজার হাজার অবিশ্বাস্য রকমের জীবন্ত ভাস্কর্যগুলো সাজানো। একইভাবে ছাদেও দীর্ঘ এলাকা জুড়ে ইতালিয়ান চিত্রকরেরা নানা শিল্পকর্ম। এঁকে গেছেন একের পর এক অত্যাশ্চর্য পেইন্টিং। চারিদিকে জীবনের উজ্জল আলো ছড়ানো ভ্যাটিকানের এই জাদুঘরের তুলনা শুধু সে নিজেই।

পর্যটকদের ভীরের কারনে এগুতে হয় গাইডের ফ্ল্যাগ দেখে। এরপর গাইডের পিছু পিছু ডুকে পড়ি আর শুনি বিখ্যাত চিত্রকর রাফায়েলের বিশ্বখ্যাত পেইনটিং ‘স্কুল অফ এথেন্সে’র ঘোষণায়। হুশ ফিরে দু’চোখ ভরে দেখি বিশাল সেই ক্যানভা। যাতে রয়েছেন সক্রেটিস, প্লেটো, টলেমী, পিথাগোরাস, অ্যারিষ্টটল, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, মাইকেল এঞ্জেলো, ইউক্লিড, আলেকজান্ডার, হিরোডটাস, জোরোয়াস্টার এবং একমাত্র নারী সদস্য বিদুষী গণিতবিদ হাইপেশিয়া সহ স্বয়ং রাফায়েল। এই বিশেষ চিত্রকর্মটি রাফায়েল এমন ভাবে নীল-সাদা আকাশের ব্যাকগ্রাউন্ড দিয়ে একেছিলেন যেন দর্শনার্থীর কাছে মনে হয় সে নিজেই এথেন্সের সেই জ্ঞানসভায় উপস্থিত আছে। কৌতূহলী দৃষ্টি মেলে শ্রদ্ধাবনত মস্তকে দেখছে চিরঅমর মহাজ্ঞানীদের সেই মিলনসভা। তৎকালীন পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াসের এই আবাসকক্ষগুলোর দেয়াল জুড়ে রাফায়েল একের পর এক অসাধারণ চিত্রকর্ম উপহার দিয়ে গেছেন আমাদের। বিশ্ব নিঃসন্দেহে তার কাছে আরও অগণিত অমর সৃষ্টি পেত যদি মাত্র ৩৭ বছর বয়সে মারা না যেতো ‘মরণশীল এই ঈশ্বর’। তাঁর সময়ে তিনি মরণশীল ঈশ্বর নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। তখনকার অন্যতম সেরা স্থপতি ও নকশাবিদও ছিলেন তিনি। প্রত্নতত্ত্ব বিদ হিসেবেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে।

সিস্টেইন চ্যাপেলে ঢুকলে যে কেউ অবাক ও বিস্মিত হয়ে যাবে। সিলিং জুড়ে পৃথিবীর সৃষ্টি, আদম ও ইভের গল্প বা এরকম আরও হাজারও গল্পকে জীবন্তভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গাইডের বর্ণনা শুনে আমি মনের অজান্তেই চলে যাই সেই সময়ে। লাস্ট জাজমেন্ট চিত্রকর্মটি দেখার পরে কেউ আর অন্যায় অবিচারে লিপ্ত হওয়ার চিন্তা করবেনা। বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাস্কর, রেনেসাঁ যুগের অন্যতম সেরা স্থপতি, কবি, নকশাবিদ মাইকেল এঞ্জেলো যে গুটিকয় অমর অনন্যসাধারণ চিত্রকর্মের মাধ্যমে নিজেকে সর্বকালের অন্যতম সেরা চিত্রকরের মর্যাদায় আসীন করেছেন তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত এই সিস্টেইন চ্যাপেল। মাইকেল এঞ্জেলো সিস্টেইন চ্যাপেলের ছাদে এই চিত্রকর্ম এক হাতে এঁকেছেন চার বছর ধরে, উল্টো ভাবে উপুড় হয়ে অপরিসীম যন্ত্রণা সহ্য করে। পেইন্টিং দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে বাইবেলের নানা অধ্যায়- ঈশ্বরের আলো ও অন্ধকারকে আলাদা করা, আদমের সৃষ্টি, তারপর ইভ, পরবর্তীতে তাদের স্বর্গ থেকে বিতাড়ন, নূহের বন্যা ও পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ঘটনা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমে থাকা ধুলোয় প্রায় অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া ছাদ থেকে বর্তমান প্রযুক্তির সাহায্যে প্রায় এক দশক ধরে স্তরের পর স্তর ধুলোবালি পরিষ্কার করে নতুন জীবন দান করা হয় ১৯৯৪ সালে।

সিস্টেইন চ্যাপেলে একটি সভাকক্ষ রয়েছে। যেখানে বসে পোপ নির্বাচন করে কার্ডিনালরা। এই সভা কক্ষেরই বেদীর দেয়াল জুড়ে আছে মাইকেল এঞ্জেলোর আরেক অমর সৃষ্টি ‘দ্য লাস্ট জাজমেন্ট’ বা ‘শেষ বিচার’। নয় বছর ধরে আঁকা হয় এই চিত্রকর্ম। ইহকালে পাপ কাজ করলে পরকালে কী শাস্তি দেয়া হবে তা দেখানো হয়েছে। গাউড জানালো এই চিত্রকর্মেও দৈর্ঘ্য ৪৫ ফুট আর প্রস্থ প্রায় ৪০ ফুট। দ্য লাস্ট জাজমেন্ট দেখার পর ইহজনমে আর কেউ পাপ কাজ করতে সাহস পাবেননা। গাইড জানালেন, চিত্রকর্মটি আঁকার পরে শাস্তির চিত্র অনেককেই আতঙ্কিত করলেও যথেষ্ট মনোপীড়ার কারণ হয়ে দাড়িয়ে ছিল তা তৎকালীন পোপসহ রক্ষনশীল সমাজের। এ কারনে পোপের আদেশে নগ্ন মানবদেহের স্থান বিশেষে আব্রুর ব্যবস্থাও করা হয়। লাইব্রেবীর বিভিন্ন অংশ ঘুরে যা দেখেছি তা একবার নয়, হাজারবার গেলেও প্রতিদিনই নতুন মনে হবে। আমি ভুল করে নোটবুক নিয়ে যাইনি। একটা ব্রুশিয়ারের খালি অংশে অল্প কিছু লিখে রাখতে পেরেছি। তবে বর্ণনা শুনে দেখবো না লিখবো এ নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্ধে সেই লেখাগুলোর অনেকগুলো নিজেই মেলাতে পারছিনা।

ফেরার পথে ডুকে পরলাম সেইন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায়। এখানে ডুকতে কোন টিকিট লাগেনা। সিকিউরিটি চেক করে যে কেউ ডুকে যেতে পারেন। তবে এখানে একটা ড্রেস কোড রয়েছে। পুরো পা আবৃত করে যেতে হবে। পোষাক আশাকের ক্ষেত্রে স্বল্পতা ও উগ্রতা গ্রহণযোগ্য নয়। এটি সম্ভবত পৃথিবীর অন্যতম বড়ো চার্চ। বলা হয়ে থাকে যীশু খ্রিষ্টের সরাসরি ১২ জন শিষ্যের অন্যতম গলি থেকে আসা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা ধীবর পিটার একসময় রোমে আসে এবং নিভৃতে তার বিশ্বাস প্রচার করতে থাকে। পরে ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত অত্যাচারী রোমান সম্রাট নিরোর সময় পিটারকে উল্টো কওে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয় ক্যালিগুলার সেই ওবেলিস্কের সামনে এবং অন্য অনেকের সাথেই তাকে গোর দেওয়া হয় সেই চত্বরেই যার উপরে দাড়িয়ে আজ এই বিশাল মর্যাদাপূর্ণ তীর্থস্থান। এর আকাশ ছোঁয়া প্রায় সাড়ে চারশ ফুট উচ্চতার গম্বুজটি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু গম্বুজ, যার ভিতরের ব্যস ৪৬৪ ফিট ১ ইঞ্চি! এই আক্ষরিক অর্থেই চক্ষু চড়কগাছ করা গম্বুজ নির্মাণের মূল কৃতিত্ব দেওয়া হয় মাইকেল এঞ্জেলোকে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এই ব্যাসিলিকা যে কতটা জাঁকজমকপূর্ণ, দেয়ালে দেয়ালে কতটা কারুকার্য, ছাদে শিল্পের সমারোহ আর কোণে কোণে কত বিখ্যাত শিল্পীর ভাস্কর্য আর শিল্পকর্মে পরিপূর্ণ তার আর নতুন করে ব্যাখ্যা দেওয়ার কিছু নেই। ধারণা করা হয় উপাসনার মূল বেদীর নিচেই সেন্ট পিটারের দেহাবশেষ সংরক্ষিত আছে।

এখানে মূল দরজা থেকে ডুকেই বিশাল বিশাল ভাস্কর্য। নানাভঙ্গিতে যিশুর এসব ভাস্কর্য খুবই জীবন্ত। একটু ভেতরের দিকে এগোতেই দেখা মিললো মাইকেল এঞ্জেলোর ‘পিয়েতা’। বলা হয়ে থাকে এটা শুধুমাত্র ভ্যাটিকান নয়, বিশ্বের অন্যতম এক শিল্প সম্পদ। মেরীর কোলে পূর্ণ বয়স্ক যীশুর মৃতদেহ, কি অপূর্ব তাদের মুখমণ্ডলের অভিব্যক্তি, অজানা আবেগে উদ্ভাসিত। মাত্র ২৫ বছর বয়সে মাইকেল এঞ্জেলো এই সাদা মার্বেলের ভাস্কর্যটি তৈরি করেন এবং এটিই তার খোদাই করা ভাস্কর্য যেখানে শিল্পী তার নাম খোদাই করে রেখেছেন। মেরীর আলখেল্লার কাপড়ে বাতাসের তৈরি ভাজ দেখে ভুলেই যেতে হয় এটা পাথরের ভাস্কর্য। কাছ থেকে দেখার জন্য অনেক সময় অপেক্ষা করলাম। কিন্তু এর সামনে ভিড় লেগেই থাকে অসীম স্নিগ্ধ ও অনন্য সুন্দর ভাস্কর্যটিকে দেখতে। আমি তিন চারটি ছবি তোলার চেষ্টা করেছি। সমস্যা হচ্ছে এখানে ফ্ল্যাশ ব্যবহার একদমই নিষিদ্ধ। সেখানে মোবাইলে আমাকে মার্ক করলে পিয়েতা অন্ধকার হয়ে যায়। আবার পিয়েতা মার্ক করলে আমার ছবি দেখা যায়না। এ লেখায় পিয়েতার সঙ্গে একটি সেলফি যুক্ত করেছি। বলে রাখা ভালো যে, পিয়েতা এখন একটি বুলেট গ্রুফ গ্লাসের পেছনে রাখা হয়েছে। কারণ, কয়েক দশক আগে এক বিকৃতমস্তিস্ক ধর্মান্ধ নিজেকে যীশু দাবি করে মেরীর মূর্তিতে হাতুড়ির আঘাত হেনে খানিকটা ক্ষতি করেছিলেন। ফলে বেশ কয়েক মিটার দূর থেকে দেখতে হয় পিয়েতা, পাশেই প্রার্থনা ঘর। আরো অনেক ভাস্কর্য। সবগুলোই ঝুলন্ত অবস্থায় রাখা। এরপর সরু গলি পার হয়ে চলে এলাম সেন্ট পিটার্স স্কোয়ারে।

শুনে এসেছিলাম এখানে নাকি টাইম ভিউয়ার মেশিন রয়েছে। অতিপ্রাকৃত বিষয় যারা বিশ্বাস করেন তারা মনে করেন অসাধারণ প্রযুক্তিগত ক্ষমতা ভ্যাটিকানের রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে বিশেষ এক যন্ত্র যা দিয়ে অতীত এবং ভবিষ্যৎ দেখতে পাওয়া যায়। ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন দ্বারা চালিত এই যন্ত্রটিকে ভ্যাটিকান গির্জার গোপন স্থানে রাখা হয়েছে। শুধু গির্জার শীর্ষ ব্যক্তিরাই প্রয়োজনে এটি ব্যবহার করেন। দেখে নেন অতীত ও ভবিষ্যতের বিভিন্ন ঘটনা। তাদের দাবি, সেই যন্ত্রটিই গির্জার ক্রমাগত শক্তি ও ক্ষমতা ধরে রেখেছে। এই যন্ত্রটি ১৯৫০ সালের দিকে তৈরি করা হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। ফাদার মারিয়া আর্নেত্তির নেতৃত্বে ১২ জন বিজ্ঞানী এই বিশেষ যন্ত্রটি নির্মাণ করেন। বলা হয়, ধর্মীয় দায়িত্ব গ্রহণের আগে মারিয়া আর্নেত্তি প্রকৃতিবিজ্ঞানী ছিলেন। গবেষকরা আরও দাবি করেছেন, ভ্যাটিকানের বিজ্ঞানী দল যন্ত্রটি নির্মাণ করলেও তা সবার কাছে প্রকাশ্যে আনায় আপত্তি জানান ফাদার আর্নেত্তি। তাতে সময়ের স্বাভাবিক প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। এতে সবার মাঝে বিশৃঙ্খতা দেখা দেবে। এই যন্ত্র থেকে ফাদার আর্নেত্তি অতীতের অনেক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন বলেও শোনা যায়। গ্রিসের পতন থেকে যিশু খ্রিস্টের ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার দৃশ্য সবই দেখেছেন ফাদার আর্নেত্তি। ধারণা করা হয় মহাজাগতিক বিষয়ও পর্যবেক্ষণ করা যায় যন্ত্রটি দিয়ে। মনে মনে অনেক খোঁজাখুজি করলাম। গাইডকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম। মুচকি একটি হাসি দেয়া ছাড়া আর কিছুই বলেন নি। আদৌ এর অস্তিত আছে কি-না সে সম্পর্কে কোনো ধারনাও পাওয়া গেলো না।
প্রসঙ্গত: ১৮৭০ সালের আগে এবং পরে ভ্যাটিকান ইতালিরই অংশ ছিলো। মূল ইতালি এবং ভ্যাটিকানের শাসক ছিলো সম্পূর্ণ আলাদা। পোপরাই ছিলেন ভ্যাটিকানের সর্বেসর্বা। কিন্তু ১৮৭০ সালে ইতালি ভ্যাটিকানের শাসন নিয়ে নেয়। এই মুখোমুখি অবস্থানের অবস্থানের অবসান ঘটে ১৯২৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ইতালির একানায়ক বেনিতো মুসোলিনি রাজা তৃতীয় ভিক্টর ইমানুয়েলের পক্ষে এক চুক্তির মাধ্যমে ভ্যাটিকানকে স্বাধীন দেশের মর্যাদা প্রদান করেন। এই সময় ইতালি সরকার সেই যুগে প্রায় ৯২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ প্রদান করে ভ্যাটিকান শহরকে। এই ক্ষতিপূরণ মূলত দেয়া হয় বিগত ৬০ বছর ধরে পোপের মর্যাদা এবং কার্যাবলী ক্ষুন্ন করার অভিযোগের প্রেক্ষিতে। এরপর থেকেই বিশ্বের ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচিত হবার পাশাপাশি পোপের কার্যালয় এবং বাসস্থান হিসেবে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। ভ্যাটিকান হয়ে পড়ে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র। ২ মাইলের সীমানা ছাড়াও মোট ১০৯ একরের উপর দাঁড়িয়ে আছে ভ্যাটিকান সিটি রাষ্ট্রটি। এছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলের আরো ১৬০ একরের মালিকানা রয়েছে এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের। প্রায় শত বছরের পুরাতন সব স্থাপনার পাশাপাশি ভ্যাটিকানের রয়েছে নিজস্ব সকল ব্যবস্থা। ভ্যাটিকান নিজেই নিজের শহরের ব্যাংকিং, টেলিফোন সিস্টেম, পোস্ট অফিস, ফার্মাসি, পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেলের ব্যবস্থা করে রেখেছে। রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যা আনুমানিক এক হাজার বলা হলেও প্রকৃত জনসংখ্যা ৮০১জন। যার মধ্যে ১৩৫ জনই সুইস গার্ড। ১৫০৬ সাল থেকে সুইস গার্ডই পোপের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রদানের দায়িত্ব পালন করছে। পোপ ছাড়াও সেইন্ট পিটার স্কয়ার এবং সেসব অঞ্চলের দায়িত্বে আছে সুইস গার্ড।

অসাধারণ এক মুগ্ধতার সঙ্গে অনেক বেশি শূন্যতা নিয়ে ফিরে আসলাম। সেন্ট পিটার্স স্কয়ার মাড়িয়ে এগোতে এগোতেই মনে হলো- যে জায়গাটি একদিন সেন্ট পিটার ও তার সঙ্গীদের গোরস্থান হিসেবে ব্যবহার করেছিল অত্যাচারী স¤্রাট নিরো সেই সেন্ট পিটার্স এখন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী একটি রাষ্ট্র। সারা বিশ্বে পোপের প্রভাব ব্রিটিশ রানীর চেয়েও বেশি মনে করা হয়। সেদিন নিরো কী ভেবেছিল এই পিটারের সূত্র ধরেই পুরো ইতালীসহ বিশ্বে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন মানুষের তীর্থস্থানে পরিণত হবে ভেটিক্যান!

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও সম্পাদক, পার্লামেন্ট জার্নাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত