প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

৭ মার্চের ভাষণ নির্যাতিত মানুষের ভরসার প্রতীক

ড. আতিউর রহমান: আজ ৭ মার্চ। আমাদের ইতিহাসের এক উজ্জ্বলতম মাইলস্টোন। সংক্ষিপ্ত, ভারসাম্যপূর্ণ, আবেগাপ্লুত অথচ বাস্তবানুগ, ছন্দময়, দূরদর্শী, মানবিক এবং রাষ্ট্রনায়কোচিত এই ভাষণই বঙ্গবন্ধুকে সারাবিশ্বের নির্যাতিত মানুষের ভরসার প্রতীকে পরিণত করেছে। সেদিন ছিলো অন্য রকম এক বিকাল। গভীর উত্তেজনা, উত্তাল জনতা, দল-মত নির্বিশেষে সব বয়সের, শ্রেণির মানুষের সমাবেশটি ছিলো অতুলনীয়। রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি সেদিন জনসমুদ্রের কিনারে। রমনার রেসকোর্স ময়দানে সমবেত বিভিন্ন শ্রেণিপেশার দশ লক্ষাধিক মানুষ। তারা মুক্তির আকাক্সক্ষায় বুক বেঁধে দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন তাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুনতে। এ সমাবেশের মূল চেতনাই ছিলো ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’। বঙ্গবন্ধুও তার ঐতিহাসিক ভাষণে ব্যক্ত করেছিলেন স্বাধীনতার অভিপ্রায়। ১১০৮টি শব্দের উনিশ মিনিটের এই ভাষণটিতে ঘণীভূত হয়ে আছে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারবঞ্চিত বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের সুদীর্ঘ সময়। চুয়াল্লিশ বছর ধরে ভাষণটি জনসাধারণ্যে শ্রুত হচ্ছে লাখ-কোটিবার। গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে এই ভাষণ।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ-প্রকৃত অর্থেই অভিন্ন ও একাত্ম। যেন একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছিলেন পথিকৃৎ। মৃত্যুকে তুচ্ছ ভেবে এগিয়ে গেছেন অবিচল চিত্তে। গণতান্ত্রিক মূল্যচেতনা, বৈষম্য-শোষণ থেকে মুক্তির আকাক্সক্ষা এবং অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এই ত্রিমাত্রিক বৈশিষ্ট্যই বঙ্গবন্ধুর মূলকথা। এই মূলমন্ত্রকে তিনি সঞ্চারিত করেছিলেন প্রতিটি বাঙালির চেতনায়। এ জন্যই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার। জাতির পিতা। সব অর্থেই ‘তিনিই বাংলাদেশ’। বঙ্গবন্ধু সারাজীবন কাজ করে গেছেন বাঙালি জনগণের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য। স্বপ্ন দেখেছিলেন শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের। গড়তে চেয়েছিলেন ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা, যা বাস্তবায়নে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত এই নেতা তার জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। সাতচল্লিশে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ তেইশ বছরে শত শহীদের রক্ত বাহান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুথান পর্যন্ত রাজনৈতিক অধিকার অর্জন এবং সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামেই ছিলো বঙ্গবন্ধুর দৃপ্ত পদচারণা। পাকিস্তান সৃষ্টির পরই শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম-পাকিস্তানের শোষণমূলক আচরণ। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রেই বাঙালিরা উপেক্ষিত হতে থাকে। দিনে দিনে রচিত হয় বৈষম্যের পাহাড়। জনসংখ্যার দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান বৃহত্তর অংশ হওয়া সত্ত্বেও সরকারি বাজেটের প্রায় পুরোটিই খরচ হতো পশ্চিম পাকিস্তানিদের জন্য। বৈদেশিক সাহায্যের আশি ভাগই ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। চাল, আটা ও তেলের দাম পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানে ছিলো দ্বিগুণ। কেন্দ্রীয় সরকার ও সামরিক বিভাগের চাকরির প্রায় নব্বই শতাংশই ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানিদের দখলে। প্রশাসনের শীর্ষে ছিলেন তারাই। এমনকি তারা নগ্ন আঘাত হানে বাঙালির মাতৃভাষা বাংলার উপর।

এ সব বৈষম্য ও পাকিস্তানিদের নানা অন্যায়-অত্যাচারকে উপজীব্য করে ছেষট্টিতে বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিব ছয় দফা কর্মসূচি দেন। জনগণের অধিকার আদায়ের এই ঐতিহাসিক কর্মসূচি মোকাবেলায় পাকিস্তানি সামরিক শাসক শেখ মুজিব ও তার দলের উপর অগণতান্ত্রিক ও ষড়যান্ত্রিক আচরণ শুরু করে। ফলে তার উপর বারবার নেমে আসে দুঃসহ কারাজীবন। তবে তিনি ফাঁসির ভয়কে তুচ্ছ করে বলতে পেরেছেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলবো, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা’। আর বাঙালি জনগণ পরিস্থিতির করুণার পাত্র হয়ে না থেকে পাকিস্তানি শাসকদের অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে আত্মদান করতেও পিছপা হয়নি। ঊনসত্তরে ছাত্র-জনতা সংগ্রাম করেই শেখ মুজিবকে কারামুক্ত করেন এবং ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এরপর আসে সত্তরের সাধারণ নির্বাচন। এ নির্বচনের ফলাফল ছিলো বাঙালির শোষণ-বৈষম্যের প্রতিফলন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তা সত্ত্বেও পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে বিলম্ব করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো যেকোনোভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিবিদদের হাতে কুক্ষিগত করে রাখা। এই ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু একাত্তরে মার্চের শুরুতেই পূর্ব পাকিস্তানে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিকামী মানুষ ঢাকার রাজপথ প্রকম্পিত করে তোলে। ঢাকা পরিণত হয় মিছিলের নগরীতে। সারা পূর্ব পাকিস্তান কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বিশ^বাসী অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করে বিশালকায় এক নেতার রাষ্ট্রনায়কে রূপান্তরের প্রক্রিয়া।

অসহযোগ আন্দোলনের টানটান উত্তেজনায় যখন বাঙালি জনমানুষ আন্দোলিত, সেই পটভূমিতেই ৭ মার্চ বেলা ২টা ৩০ মিনিটে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনের সর্বব্যাপী গণজাগরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান শুরু করেন তার ঐতিহাসিক ভাষণটি। রেসকোর্সের পুরো ময়দান তখন পরিণত এক বিশাল জনসমুদ্রে। হাতে তাদের বাঁশের লাঠি আর কণ্ঠে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি। লক্ষ্য তাদের অভিন্ন-স্বাধিকার ও মুক্তি। চোখে তাদের মুক্তির চেতনার আগুন। লড়াই করে অধিকার ছিনিয়ে আনার আগুন।

কী অসীম চাপ। একটি জাতির প্রত্যাশা। অদূরেই পাকিস্তানি সেনা। মাথার ওপর চক্কর দিচ্ছে টিক্কাখানের হেলিকপ্টার। সামনে সাত কোটি বাঙালির রক্তমাখা চোখ। তারা চেয়ে আছে তাদের প্রাণের ও ভালোবাসার নেতার দিকে। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি আর কালো কোট পরনে নেতার চোখে সংগ্রাম। রক্তে উদ্বেলতা। মাথায় সাবধানতার অসীম ওজন। একটু এদিক-সেদিক হলেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনতে পারে হানাদার দল। তাই সাবধানে উচ্চারণ করতে হবে প্রতিটা শব্দ। অথচ কোনো রকম পূর্ব প্রস্তুতি নেই। নেই লিখিত কোনো স্ক্রিপ্ট। শুধু মাথায় আছে একটি মাত্র শব্দ ‘স্বাধীনতা’। সাত কোটি মানুষের ভালোবাসায় আস্থা রেখে বাঙালি জাতির মুক্তির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শুরুতেই শান্ত ও গম্ভীর কণ্ঠে বলেন, ‘ভাইয়েরা আমার, আজ দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি’। এ কথার মাধ্যমে তিনি বাঙালি জাতির রাজনৈতিক অধিকার বারবার ভূলুণ্ঠিত হওয়া আর চরম নিষ্ঠুরতায় তা দমিয়ে দেওয়ার পুঞ্জিভূত মনোবেদনা তুলে ধরেন। আর জীবনদানের পেছনে মানুষের কী অদম্য আকাক্সক্ষা ক্রিয়াশীল ছিলো তা তিনি স্পষ্ট করলেন, ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়’। এই ভাষণে ছয়বার ‘মুক্তি’ শব্দটি উচ্চারণ করেছেন তিনি। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি উচ্চারণ করেন একেবার শেষ লাইনে। এ কথাগুলোর মাধ্যমে বাংলার মানুষ কার কাছ থেকে কী ধরনের মুক্তি ও অধিকার চায় তাও তার বক্তৃতায় ফুটে উঠে। সেদিন সবার চিন্তা-চেতনায় ছিলো শত বছরের পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে বাঙালি জাতি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করবে। বঙ্গবন্ধুও তার ভাষণে স্বাধীনতার অবয়ব আঁকেন এভাবে ‘এ দেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে’।

এরপর তেইশ বছরের বাঙালির করুণ ইতিহাসের সারাংশ উপস্থাপন করে তিনি বলেন, ‘কিন্তু’ দুঃখের বিষয়, আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় ২৩ বছরের করুণ ইতিহাস, বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। ২৩ বছরের ইতিহাস, মুমূর্ষু নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস, বাংলার ইতিহাস এ দেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস’। এ কথার মাধ্যমে মানসপটে ভেসে উঠে বাঙালিরা কেমন করে অন্যায়-বঞ্চনাকে প্রতিহত, ন্যায়কে সমুন্নত, জাতিগত অসাম্য এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে চেয়েছিলো, জীবন দিয়ে চেষ্টা করেও সেগুলো একে একে ব্যর্থ হওয়ায় কেমন করে মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রাম মুখ্য হয়ে উঠে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর পুরো দেশ বদলে যায়। যেন আগুনের তাপে ফুটন্ত পানির মতো টগবগ করতে থাকে সাত কোটি মানুষ। জোরদার হয়ে উঠে অসহযোগ আন্দোলন। শেখ মুজিবের নির্দেশই হয়ে উঠে সরকারি নির্দেশ। মানুষও তা মানতে থাকে। এমনকি সরকারি প্রশাসনও। তিনি বলেন, ‘আর এই সাতদিন হরতালে যে সব শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছেন, প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছিয়ে দেবেন। সরকারি কর্মচারীদের বলি। আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে খাজনা, ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো। কেউ দেবে না’। বাংলার বিক্ষুব্ধ জনতার প্রতি কর্তৃত্বমূলক এই নির্দেশাবলী প্রদানের অমিত তেজ, আস্থা আর প্রগাঢ় আত্মবিশ্বাস বঙ্গবন্ধু পেয়েছিলেন দীর্ঘ সংগ্রামের অগ্নিপরীক্ষায়। শুধু জনতার প্রতি নির্দেশই নয় বরং পাকিস্তানি সেনাশাসকদের উদ্দেশ্যেও কয়েকটি শর্ত দিয়ে তিনি আসন্ন স্বাধীনতার ঘোষণাও দেন।

মুক্তির দিশারি বঙ্গবন্ধু একটি দর্শন, একটি চেতনা। এই প্রবাদ পুরুষের রাজনৈতিক দর্শনের মাঝে বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির পথ খুঁজে পাওয়া যায়। বাঙালির সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু কাজ করে যাচ্ছিলেন। আর তখনই ঘাতকের নির্মম বুলেট তাকে জনগণের কাছ থেকে কেড়ে নেয়। জাতির পিতা আজ আমাদের মাঝে নেই। তবে তিনি অমর, অবিনশ্বর ও মৃত্যুঞ্জয়ী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মাঝে তিনি চিরজাগ্রত। তার এই ভাষণের মধ্য দিয়েই তিনি বাংলাদেশের শাসনভার নিজ হাতে নিয়ে নেন। ছোট ছোট শব্দ দিয়ে তিনি তার এই সার্বভৌম কর্তৃত্বের প্রকাশ ঘটান। ‘রিকশা, ঘোড়াগাড়ি চলবে, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে, শুধু সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজ কোর্ট, সেমি-গভর্নমেন্ট দপ্তরগুলো, ওয়াপদা কোনো কিছু চলবে না’। এসব বাস্তবানুগ উচ্চারণই বলে তিনি কতোটা দূরদর্শী ছিলেন। এই ভাষণটি শুনলে এমনিতেই এক অন্য রকম শিহরণ জাগে। ভাষা সহজ-সরল। মর্মস্পর্শী। এই ভাষণেই স্পষ্ট হয় এ দেশের সব দুঃখী মা তার ‘মা’ হয়ে যান। ‘কী করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে’ এ কথাগুলোই প্রমাণ করে এই সত্যিটি। পুরো দেশের মুক্তির সংগ্রামের দায়ভার নিজের কাঁধে নিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন তিনি কতোটা দায়বদ্ধ এক মানবিক রাষ্ট্রনায়ক। আর এ কারণেই ৭ মার্চের পর ‘স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের হলো’ (নির্মলেন্দু গুণ)। এই ভাষণটি ছিলো ইতিহাসের ফসল। আবার এই ভাষণই সৃষ্টি করেছিলো এক নয়া ইতিহাস। ‘বাংলা’ আর ‘বাংলাদেশ’ অভিন্ন অর্থে ব্যবহার করেছেন তিনি এই ভাষণে এক অন্য রকম ছন্দে। সমার্থক হিসেবে। আর সে কারণেই বলা হয় এ এক অমর রাজনৈতিক কবিতা। কবিতাই মানুষ বেশি মনে রাখে। কেননা কবির অন্তর থেকেই সৃষ্টি হয় কবিতা। শিল্পের এই সৌন্দর্য কবিতায় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠে।

তার স্বতঃস্ফূর্ত এবং অন্তরবাণী এই রাজনৈতিক কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছিলো বলেই আজ ইউনেস্কো এই ভাষণকে অমূল্য বিশ্ব সাংস্কৃতিক দলিল তথা সম্পদ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। নরমে গরমে দেওয়া এই ভাষণটি দারুণ ভারসাম্যপূর্ণ। মানবিক। বিচক্ষণ। দূরদর্শী। পরবর্তী সময়ে আমরা যে গেরিলা যুদ্ধের সূচনা করেছিলাম এবং সফল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করেছিলাম তার পথ-নির্দেশ এই ভাষণেই দেওয়া হয়েছিলো। বাঙালির গৌরবময় ইতিহাসের এক উজ্জ্বল মাইলস্টোন এই ভাষণ যুগে যুগে বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। চলমান ‘মুজিববর্ষে’ ৭ মার্চের ভাষণটি যে আলাদা গুরুত্ব পাবে তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। মুক্তির দিশারি বঙ্গবন্ধু একটি দর্শন, একটি চেতনা। এই প্রবাদপুরুষের রাজনৈতিক দর্শনের মাঝে বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির পথ খুঁজে পাওয়া যায়। বাঙালির সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু কাজ করে যাচ্ছিলেন। আর তখনই ঘাতকের নির্মম বুলেট তাকে জনগণের কাছ থেকে কেড়ে নেয়। জাতির পিতা আজ আমাদের মাঝে নেই। তবে তিনি অমর, অবিনশ্বর ও মৃত্যুঞ্জয়ী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মাঝে তিনি রয়েছেন চিরজাগ্রত। তিনি আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস। বেলাল চৌধুরীর ভাষায় (দ্র. ‘পিতৃপুরুষ’) : ‘তিনি আমাদের নিত্যবহমান রক্তধারা / তিনি আমাদের পুণ্যশ্লোক পিতৃপুরুষ’। লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর। ই[email protected]

সর্বাধিক পঠিত