শিরোনাম
◈ এনআইডি সংশোধনসহ বিভিন্ন সেবার ফি বাড়াল ইসি ◈ বিশ্বকাপ চলাকালীন আর্জেন্টিনাবিরোধী প্রচারণায় টাকা খরচ ক‌রে‌ছে ব্রাজিলসহ ৩ দেশ: রাস্ট্রপ‌তি হাভিয়ের মিলেই ◈ প্রশাসনে বড় রদবদল, সচিবালয়ে নতুন মুখের অপেক্ষা ◈ সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলেছে ‘মোদির পদত্যাগপত্র’, যা জানা যাচ্ছে ◈ রাবিতে শিক্ষার্থীকে মারধর: জিএস আম্মারসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা ◈ খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক ফলপ্রসূ, ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’র কথা জানালেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গোর ◈ টেকসই কৃষি-সবুজ শিল্পে ঋণ কমেছে, বেড়েছে টেকসই অর্থায়ন ◈ বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য নতুন নির্দেশনা সরকারের ◈ বন্ধ কারখানার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী যে সুখবর দিলে ◈ সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দিলেও বিক্রিতে লাগবে বাবা-মায়ের সম্মতি: আইনমন্ত্রী

প্রকাশিত : ০৫ মে, ২০১৯, ০৭:২৫ সকাল
আপডেট : ০৫ মে, ২০১৯, ০৭:২৫ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

শুধু সনু নয়, দলিত সম্প্রদায়ের মেয়েরা  স্নাতক করলেও নেই কোন চাকরি

মৌরী সিদ্দিকা : টানবাজার সুইপার কলোনির প্রথম স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন সনু রাণী দাস। সনুর জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং বিয়েও হয়েছে নারায়ণগঞ্জের টানবাজার সুইপার কলোনিতে। আমাদের দেশে নারীদের শিক্ষাব্যবস্থাই যেখানে বৈষম্যের শিকার ঠিক সেখানেই জেগে উঠলেন হরিজন সম্প্রদায়ের মেথর কলোনির সনু, মিনা ও পূজা।

বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলার সময় সনু জানান, অতীতে কলোনির বাচ্চারা বেশি বৈষম্যের শিকার হলেও এখন অনেকটা কমে গিয়েছে। কলোনির বাচ্চারা এখন স্কুলে যেতে পারে, আগের চেয়ে শিক্ষকরা আন্তরিক হয়েছে।

বাংলা আমাদের দ্বিতীয় ভাষা। এ ভাষা আমরা জানি না। ধীরে ধীরে আমি শিখেছি। কলোনির সবাই বাংলা বোঝে না, হিন্দি আমাদের মাতৃভাষা। কলোনির লোকজন বিশেষ করে মেয়েরা খুব কম বাইরে যায়। তাই হিন্দি ছাড়া অন্য কিছু তারা বোঝে না।

একসময় আমিও বাংলা বুঝতাম না। আপনারা চিরচিটটাকে বলেন তেলাপোকা। আমি আগে তেলাপোকা মানে বুঝতাম না।

সনু বলেসন, স্কুলে অনেকদিন আমাদের দুপুরের খাবার সহপাঠীরা আড় চোখে দেখতো। তারা কি ভাবতো জানি না। আমরা তো পরিষ্কার হাতেই ভাত রান্না করতাম। আমি কখনোই এটা কাউকে বলতে পারিনি।

সনু বলেন, একসময় স্কুলের পিছন দরজা দিয়ে মুখ ঢেকে বের হতাম। স্কুলে দলিত সম্প্রদায় বলে কেউ মিশতে চাইতো না। অতীতে শুধু শিক্ষার্থীরা নয় স্কুলের শিক্ষকরাও আমাদের মেনে নিত চাইতো না। আমাদের কলোনির কোন বাচ্চাকে ভর্তি নিতে চাইতো না। আমরা বাংলা বুঝি না, শিক্ষক হিন্দি বোঝেন না। ভাষা না বুঝলে যা হয় কলোনির বাচ্চারা এই ভয়ে স্কুলে যায় না। সুইপার হয়ে স্কুলে পরিচয় দিতে একসময় লজ্জা পেলেও এখন আমি আমার আমার পরিচয় গর্বের সাথে বলি, ‘আমি সুইপার’। একথা বলে তিনি গর্বভরে প্রাণ খোলা একটি হাসি দিলেন। হাসি দেখেই বোঝা যাচ্ছে তিনি কতটা খুশি।

তিনি আরও বলেন, কলোনির মেয়েদের স্কুলে বা বাইরে যেতে হয় না। এর একটা বিশেষ কারণ সামাজিকভাবে মেলামেশা কলোনিতে গ্রহণযোগ্য নয়। যদি মুসলিম ছেলেদের সাথে পালিয়ে যায় এধরনের ভয় এখনো তাড়া করে আমাদের। এরকম ঘটনা হলে তাকে সম্প্রদায় থেকে একঘোরে করা হয়।

সনু রাণী দাস ২০০৮ সালে গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে ব্রিটেনসহ সুইজারল্যান্ড এবং ব্রাজিলেও গিয়েছেন।

একই কলোনি এবং সনুর বান্ধবী মিনাও স্নাতক করেছেন। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে মিনা ছিলেন তৃতীয়। বড় দিদি পঞ্চম শ্রেণি পাসের পর ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হতে চাইলে বাবা-মা’র চেয়ে দাদী বেশি বাঁধা প্রদান করেন। সেক্ষেত্রে মিনা ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হবার সময় দাদীর সাথে দিদিও যোগ দেন। তার (মিনার দিদি) পড়াশুনা বন্ধ করা হলে মিনা কেন পড়বে ? সব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে মিনাও ¯স্নাতক¯ করেছেন। বিয়েও করেছেন একই কলোনিতে।

মিনার ভাই এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে, তার ভাই পুলিশে যোগ দিতে চায়।

পড়াশুনায় ভালো ছিল, আর পরিবার, কলোনি, স্কুলের সকল বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে সনু, মিনা, পূজা শিক্ষিত হলেও শিক্ষা অনিশ্চিত কলোনির বাচ্চাদের। মিনা, সনু নিজ উদ্যোগে কলোনির বাচ্চাদের পড়ান। পড়ানোর বিষয়ে সনু বলেন, বাংলাটাকে হিন্দি করে বাচ্চাদের শেখাই। এতে তারা খুব সহজে এবং আগ্রহ নিয়ে পড়তে আসে।

কলোনির লোকেরা অনাহারে থাকে বা কেউ আগের মত হতদরিদ্র এমন অবস্থা নয়। তবু কেউ পড়াশুনা করাতে চায় না। তাদের মতে পড়াশুনা করাতে প্রচুর টাকা লাগে। তারা উপার্জন ভালো করলেও সেটা কিভাবে কাজে লাগাবে জানে না । এর জন্য সবার আগে জরুরি কলোনির প্রত্যেকটা মানুষকে শিক্ষিত হওয়া। সরকার যদি কলোনির বাচ্চাদের জন্য শিক্ষা উপকরণ দেয় তবে কলোনির বাচ্চা এবং অভিভাবকরা স্কুলে যেতে আগ্রহী হবে।

সনু ও মিনা এভাবেই তাদের কথাগুলো বলেন।

বড় বড় এনজিও থেকে চাকরির প্রস্তাব এলেও তারা রাজি হয় না। পেট যেভাবেই হোক চলছে। কিন্তু আমরা চলে গেলে এই কলোনির বাচ্চারা কখনো পড়ালেখা করতে পারবে না। তাই তারা চান তাদের কলোনির প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে।

এক্ষেত্রে কথা বলতে গেলে মেথরপট্টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা অর্চনা রানী সাহা বলেন, ‘সুইপার কলোনির স্কুলগুলোতে সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্য থেকে উঠে আসা লোকজনকেই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া উচিত। শুধু ভাষা বোঝার কারণেই কলোনির ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ শিক্ষার্থী প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ে। কলোনির বাসিন্দাদের মধ্য থেকে শিক্ষক হলে ভাষার প্রতিবন্ধকতা যেমন দূর হবে, তেমনি শিক্ষক শিক্ষার্থীদের বোঝাপড়া নিবিড় হবে।’

মিনা ও সনু চায় , সুইপার কলোনির স্কুলে পড়াতে। তারা দু’জনই প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের জন্য আবেদন করেছেন।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়