প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হাসপাতালগুলোতে নামেমাত্র চলছে সমাজসেবা র্কাযক্রম

ডা. জাকির হোসেন : বাংলাদেশেদের সরকারি হাসপাতালগুলোতে যে পরিমাণ রোগী চিকিৎসাসেবা পেয়ে থাকে তা বিশ্বের ইতিহাসে একবারেই বিরল দৃষ্টান্ত। বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
আমাদেরে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের লোকসংখ্যাও প্রায় একশো বিশ কোটির ওপরে। কিন্তু সেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম লোক বাস করে। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের দেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে তিলধারণের মতো জায়গা খালি থাকে না। প্রতিটি হাসপাতালেই তার ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত রোগীর ভিড় সবসময়ই লেগে থাকে। এসব রোগীদের একটা বিরাট অংশই আসে সমাজের অতি দরিদ্র স্তরের লোকজন। আরেকটা বিরাট অংশ থাকে একেবারেই সুবিধাবঞ্চিত লোকজন। এসব লোকের প্রায় সকল ধরনের আর্থিকভাবে সহযোগিতা করার জন্য দেশের প্রায় সকল বড় বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় হাসপাতাল সমাজসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। চিকিৎসা পেশার দীর্ঘদিনের আবর্জনা সম্পর্কে যেমন সাধারণ মানুষ অবগত নন, তেমনিভাবে এই পেশার প্রাণ চিকিৎসকরা একবারেই হাল ছেড়ে দিয়ে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা দিয়ে এসব সুবিধাবঞ্চিত লোকদের মানসিক যন্ত্রণা লাঘবের চেষ্টা করে থাকেন। প্রায় সবক’টি হাসপাতালেই নামে মাত্র চলে এসব সমাজসেবা কার্যক্রম। সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘদিনের কাজ করে এ সমাজসেবা কার্যক্রমের প্রতি অনেকটা ঘৃণা জম্মগ্রহণ করেনি এ রকম চিকিৎসক একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। স্বাভাবিকভাবেই নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এই সংস্থাটির কর্মপরিধি জানার জন্য সংস্থাটির সাথে সংশ্লিষ্ট লোকজনের কাছ থেকে খবর সংগ্রহ করা শুরু করলাম।
হাসপাতালে আগত সেবাপ্রার্থীর জন্য এই সংস্থার কর্মপরিধি সম্পর্কে জানার পর কোনোভাবে হিসাব মেলাতে পারছিলোাম না। গত পাঁচ বছরে যতো রোগীকে তাদের অফিসে পাঠিয়েছি সব রোগীকেই তারা নামমাত্র কিছু ঔষধ দিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। অথচ এসব রোগীর এই ধরনের ঔষধের কোনো প্রয়োজনই ছিলো না। রোগীর প্রয়োজন ছিলো অপারেশন করার জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধ কিংবা রোগীর একটি ল্যাবরেটরি টেস্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় নগদ আর্থিক সাহায্য। এসব ঔষধ না এসেছে রোগীর চিকিৎসার কাজে না পেরেছে এসব ঔষধ দোকানে বিক্রি করে একটি সিটি স্ক্যান কিংবা এমআরআই করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে। গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের সবচেয়ে নামি একটি সরকারি হাসপাতালে কাজ করে কোনোদিন হাসাপাতাল সমাজসেবা কার্যালয়ের কোনো কর্মকর্তাকে রোগীর প্রয়োজনে কখনও দেখিনি কোনো চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করেছে।
বরং প্রতিটি অসহায় রোগীর চিকিৎসার প্রয়োজনে তাদের সাড়া না পেয়ে দেখেছি চিকিৎসকরা নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে এসব অসহায় রোগীর পাশে দাঁড়িয়েছে। আমার নিজের ডিপার্টমেন্টের দু’জন অধ্যাপক স্যারকে দেখিছি সবসময় তার নিজের টাকা থেকে একটা বাজেট এসব অসহায় রোগীর জন্য তার পিয়নের কাছে রেখে দিতেন। যেকোনো অসহায় রোগীর জন্য স্যারের কাছে যাওয়ার সাথে সাথে স্যার তার পিয়নকে ডেকে টাকা দিয়ে দিতেন। এই পাঁচ বছরে অসংখ্যবার দেখিছি জুনিয়র চিকিৎসকরা চাঁদা তুলে অসহায় রোগীর চিকিৎসা চালিয়ে যেতে।
ব্যক্তিগত এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই সাধারণ রোগীদের সচেতনতার স্বার্থে হাসপাতাল সমাজসেবা র্কাযক্রম ও কর্মপরিধির একটা ছোট বিবরণ এ কলামে তুলে ধরা হলো। ১. অসহায় ও অজ্ঞ রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসা প্রাপ্তিতে সহায়তা করা, ২. গরিব ও নিঃস্ব রোগীদের বিনামূল্যে ঔষধ, সহায়ক যন্ত্রপাতি, কৃত্রিম অঙ্গ, বিভিন্ন চিকিৎসা সামগ্রী ও পথ্য সরবরাহ বা এসব সংগ্রহের জন্য নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা, ৩.পরিধেয় পোশাক প্রদান ও রক্ত সরবরাহ বা ক্রয়ে নগদ অর্থ সহায়তা করা, ৪. এমনকি রোগ মুক্তির পরও নিঃস্ব রোগীকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা। এসব কাজের পাশাপাশি তাদের আরো অনেক বেশি কর্মপরিধির কথা তাদের নিজস্ব ওয়েব পেজে লেখা আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো সমাজসেবার নামে রোগী কল্যাণ সংস্থার নাম মাত্র কাজের সুফল কোনো অসহায় রোগী পেয়েছে কিনা।
প্রতিদিন পত্রিকার পাতা উল্টালে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অসংখ্য সংবাদ চোখে পড়ে। কিন্তু যেসব অব্যবস্থানার জায়গাগুলোতে চিকিৎসকদের পদায়ন কিংবা ক্ষমতায়ন দরকার ছিলো সেগুলো নিয়ে কেউ কোনো সংবাদ ছাপায় না কিংবা সম্পাদকীয় লিখে না।
যার ফলে চরম অব্যবস্থানা আর দুষ্ট রাহুগ্রাসের দুর্নীতির মোড়কে পরিচালিত এই হাসপাতাল সমাজসেবা কার্যালয়ের নামমাত্র সেবা রোগীর কোনো কল্যাণে কাজে আসে না। লেখক : চিকিৎসক ও কলামিস্ট

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত