প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আধ্যাত্মিক খাদ্যের মূলে রয়েছে খাদ্যের মাধ্যমে ভাব পরিবর্তনের সূত্র জানা

ড. এমদাদুল হক : দেহ মন ও আত্মার ওপর খাদ্যের প্রভাব অনস্বীকার্য। খাদ্য এমন একটি গতিশীল প্রক্রিয়া যা শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক স্তরে রূপান্তর সাধন করে। জৈবিক স্তরে খাদ্য দেহকে সুস্থ রাখে এবং দেহের ভারসাম্য রক্ষা করে। মানসিক স্তরে খাদ্য মেজাজ, আবেগ ও অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। সামাজিক স্তরে খাদ্য পারস্পরিক সংযোগ দৃঢ় করে। আত্মা পুষ্টি লাভ করে খাদ্যের আধ্যাত্মিক শক্তি ও পবিত্রতা দ্বারা।

প্রত্যেক খাদ্যে যেমন দেহের জন্য ভালো-মন্দ উপাদান আছে তেমনি আত্মার জন্যও ভালো-মন্দ উপাদান আছে। দেহের জন্য ভালো হলো খদ্যের পুষ্টি উপাদান, মন্দ হলো দুষ্পাচ্য উপাদান। আত্মার জন্য ভালো হলো পবিত্রতার স্ফূলিঙ্গ, আর মন্দ হলো অপবিত্রতার স্তূপ।

ঈশ্বরনিষ্ঠ হওয়ার প্রথম এবং প্রধান অনুষঙ্গ হলো অন্ননিষ্ঠ হওয়া। যে যা খায় তা-ই তার দেহ নির্মাণ করে, চিন্তা গঠন করে ও সংবেদন তৈরি করে। খাদ্যগুণই মানবগুণে রূপান্তরিত হয়। বিশেষ খাদ্য গ্রহণের তীব্র আকাক্সক্ষা জানান দেয়, ওই খাদ্যটির আবেগীয় প্রয়োজন তীব্র। খাদ্য ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ধর্মের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত তাই খাদ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আবেগ।

তবে একই ঔষধ যেমন একই রোগের জন্য প্রায় সকলের ক্ষেত্রে একই রকমভাবে ক্রিয়াশীল হয়, তেমনি কিছু খাদ্য প্রায় সকলের ক্ষেত্রে একই ক্রিয়া করে। জাতিগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী খাদ্য দেহে শক্তি উৎপন্ন করে। ইতিবাচক শক্তির মধ্যে থাকে সৃজনশীলতা, নেতিবাচক শক্তির মধ্যে থাকে বিনাশকারিতা। তামসিক খাদ্যে থাকে নেতিবাচক শক্তি। সাত্ত্বিক ভোজনে চিন্তাজগতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে, সংবেদনশীলতা ও দরদ বৃদ্ধি পায়, কাউকে আঘাত করার প্রবণতা হ্রাস পায় এবং সমন্বয় করার প্রয়াস বৃদ্ধি পায়, স্বাস্থ্যও ভালো থাকে।

খাদ্য হিসেবে ভাত অতি উত্তম। ধানের চাষ হয় পর্যাপ্ত সূর্যালোক ও জলের মধ্যে। অন্য কোনো শস্য উৎপাদনে এতো জল ও সূর্যালোকের প্রয়োজন হয় না, যতোটা প্রয়োজন হয় ধান চাষে। ধান সিদ্ধ করা হয়, সিদ্ধ ধান রোদে শুকানো হয়। তার মানে চাল আরো একবার জল ও সূর্যালোকে শোধিত হয়। রান্না করার সময় চাল পানিতে রাখার সঙ্গে সঙ্গেই নিজের মধ্যে পানি ধারণ করতে থাকে। অগ্নির সংস্পর্শে এসে ধারণ করে অগ্নি। নিজের মধ্যে অগ্নি-জল ধারণ করে প্রতিটি চাল শক্তির আঁধার হয়ে উঠে। ফলে এর মতো উত্তম খাদ্য দ্বিতীয়টি হয় না। তবে ‘ভরা ভাতে রসাতল’ কথাটি আক্ষরিক অর্থেই সত্য। শুকনো, কুড়কুড়ে, মচমচে খাদ্যগুলো ক্রোধ উৎপাদনশীল। এ জাতীয় খাদ্য গ্রহণের ইচ্ছা বার্তা পাঠায় যে, সেসব পরিস্থিতি ও লোকজন এড়িয়ে চলা উত্তম যাদের সংস্পর্শে ক্রোধ উৎপন্ন হয়।

লবণাক্ত খাদ্যগুলো ভয়ের প্রতীক। নোনতা খাদ্য যাদের পছন্দ তারা ‘কিছু একটা’ করতে চায় কিন্তু ভয়ে পিছিয়ে যায়। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ ভয় তাদের তাড়া করে। ভাত, রুটি, আলু ইত্যাদি কার্বোহাইড্রেটে ভরপুর খাদ্যগুলো রক্ষণশীলতা, আরাম ও নিরাপত্তার প্রতীক। চিনি ও মিষ্টি জাতীয় খাদ্য উত্তেজনা বৃদ্ধি করে। শান্ত প্রকৃতির মানুষও মিষ্টি খাওয়ার পর কিছুটা উত্তেজনা অনুভব করে। প্রায় সব সংস্কৃতিতে সুসংবাদে মিষ্টি বিতরণের ঐতিহ্যটি এসেছে এ কারণেই। আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য মিষ্টি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যদি আনন্দ ভাগাভাগি করার কেউ না থাকে, তবে নিজেই কিছু মিষ্টি খেয়ে নেয়া উত্তম।

দুগ্ধ ও দুগ্ধজাতীয় খাদ্য প্রেমের প্রতীক। মনুষ্যের প্রথম খাদ্য মাতৃদুগ্ধ। দুগ্ধ জাতীয় খাদ্যের প্রতি তীব্র আকাক্সক্ষা জানান দেয় যে, ভালোবাসা প্রয়োজন, অথচ সে তা খুঁজে পাচ্ছে না। প্রেমের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য এ ধরনের খাদ্যের প্রতি ঝোঁক থাকে।

চকলেট জাতীয় খাদ্যগুলো যৌনতার প্রতীক। যারা চকলেট পছন্দ করে- সোজা পথে হাঁটার ইচ্ছা তাদের আছে, কিন্তু হাঁটে বাঁকা পথে। খাদ্যের মাধ্যমে কামনা নিবৃত্তির বিকল্প হিসেবেও এগুলো কাজ করে। দানাদার খাদ্য সাফল্যের প্রতীক। জীবনে সফলতা প্রত্যেকেই চায়। ব্যর্থতাবোধ দূর করতে এবং নতুন উদ্যমে এগিয়ে যেতে এ জাতীয় খাদ্যগুলো উপকারী। চর্বি জাতীয় খাদ্য লজ্জার প্রতীক। এসব খাদ্য আমাদের দুর্বলতাগুলো আড়াল করে রাখে এবং মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য একটা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে।

মাংসাহার সংবেদনশীলতা হ্রাস করে এবং সূক্ষ্মতর কম্পনে সাড়া দেয়ার ক্ষমতা কেড়ে নেয়। মাংস খেলে পরমাপ্রকৃতির সঙ্গে দূরত্ব বৃদ্ধি পায় এবং প্রকৃতির কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণে অনীহা উৎপন্ন হয়। কোনো সন্দেহ নেই, সাত্ত্বিক খাদ্যই আধ্যাত্মিক খাদ্য। প্রাণী হত্যা করে মহাকালের সিঁড়িতে ওঠা মানে মাথায় পাথরের বোঝা নিয়ে সিঁড়ি বাওয়া। মাথায় ভারি বোঝা নিয়ে শিখরে আরোহন করা অসম্ভব না হলেও দুরূহ তো অবশ্যই।

আত্মোন্নয়নের জন্য জীবিকা দ্রোহবর্জিত হওয়া চাই। প্রাণী হিংসা যুক্ত জীবিকাগুলো দ্রোহবর্জিত নয়। খাদ্যের ভিত্তি যদি হয় হত্যা ও সহিংসতা, তবে ঊর্ধ্বারোহন অসম্ভব ব্যাপার।

খাদ্য যতো হালকা হবে ঊর্ধ্বারোহন ততো সহজ হবে, এটাই স্বাভাবিক। খাদ্যের পরিমাণ, উপাদান ও সময় নির্দিষ্ট থাকা চাই। আহারের প্রতি আকর্ষণ প্রত্যেকেরই আছে। সেই আকর্ষণের বিরূদ্ধে সংগ্রাম করে পরিমিত স্তরে আহার হ্রাস করলে আধ্যাত্মিক বল লাভ হয়।

পক্ষান্তরে অনাহারে থেকে প্রবৃত্তির শ্বাসরোধ করা আধ্যাত্মিক আলস্যের একটি কৌশলমাত্র। আধ্যাত্মিক খাদ্যের মূলে রয়েছে খাদ্যের মাধ্যমে ভাব পরিবর্তনের সূত্রটি জানা। ‘কী খাই’ যতোটা গুরুত্বপূর্ণ ততোটাই গুরুত্বপূর্ণ কীভাবে খাই এবং কার সঙ্গে খাই। কীভাবে খাই, কার সঙ্গে খাই- তা দ্বারাই ভোজন, ভজনে রূপান্তরিত হয়। ফেসবুক থেকে

 

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত