প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দেশের অগ্রগতির ধারা অব্যাহত থাকুক

মোনায়েম সরকার : স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতিতে পঞ্চাশের দশক ছিল অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চেতনা বিকাশের কাল আর ষাটের দশক ছিল গণতন্ত্র অর্জন ও আইনের ভেতর দিয়ে জাতীয় চেতনা বহিঃপ্রকাশের প্রচেষ্টা। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বিরূপতা এবং রবীন্দ্রবিরোধিতা যতো প্রবল হয়েছে, ততোই বাঙালিদের মধ্যে প্রতিবাদী চেতনাও জোরদার হয়েছে। পাকিস্তানের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত জোরালোভাবেই উন্মেষ ঘটতে থাকে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার। স্বায়ত্তশাসনের জন্য ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের পক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬-দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং এর সমর্থনে ৭ জুন দেশব্যাপী হরতাল ডাকেন। পরবর্তীকালে ৬-দফা ছাত্র সমাজের ১১-দফার অন্তর্ভুক্ত হয়ে ’৬৯-এর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দাবির অংশ হয়।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী যতোই ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য সাম্প্রদায়িকতা ব্যবহার করেছে, ততোই বিরোধী দলগুলো অসাম্প্রদায়িক হয়েছে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার যে, আওয়ামী লীগ-আওয়ামী মুসলিম লীগ হিসেবে ১৯৪৯ সালে আবির্ভূত হয়। কিন্তু বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর অভিজ্ঞতার আলোকেই ১৯৫৫ সালে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে দলটি ধর্মনিরপেক্ষতাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব বাঙালির সমর্থন পাওয়ার পথ সুগম হয় এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।

১৯৫২ কিংবা ১৯৪৮ থেকেই যে ভাষা আন্দোলন বিকশিত হতে শুরু করে তা মূলত বাঙালিদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের জন্যÑ সেখানে ধর্মের কোনো প্রাসঙ্গিকতাই ছিল না। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক পরিবেশটা পুরোপুরি পাল্টে যায়। পঞ্চাশ ও ষাট দশকের জনপ্রিয় আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত হলো নতুন রাষ্ট্র। আর সময়ের ধারাবাহিকতায় যোগ হলো সমাজতন্ত্র। জিন্নাহর দ্বিজাতি তত্ত্বের পরিবর্তে এলো জাতি-রাষ্ট্রের ধারণা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামের নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সেই অধ্যায়ের শেষ হলো।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে রাজনীতি খুব দুঃখজনক রূপ ধারণ করে। উগ্র বামপন্থী স্লোগান নিয়ে আওয়ামী লীগের ছাত্র ও শ্রমিক ফ্রন্ট ভেঙ্গে সৃষ্টি হয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। প্রচ- সরকার-বিরোধী ভূমিকা নিয়ে তারা ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেও প্রকারান্তরে তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির উত্থানের পথ প্রস্তুত করে। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে নতুন দেশের সংবিধান প্রণীত হয় এবং ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল গঠনের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম প্রভৃতি রাজনৈতিক দলসমূহের কোনো অস্তিত্ব বা অংশগ্রহণ ছিল না। নির্বাচনে সরকার প্রায় সব ক’টি আসনে জয়ী হয়। আর দ্বিতীয় বৃহৎ সংসদীয় গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হয় স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরাÑ তারা ১১টি আসনে জয়ী হয়। গোটা পাকিস্তান আমল জুড়েই কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকায় প্রকাশ্যে দলীয় কর্মকা- পরিচালনা করতে পারেনি। তবে তারা প্রথমে আওয়ামী লীগ ও পরে ন্যাপ বা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যায়। স্বাধীনতার পর তারা স্বনামে প্রকাশ্যে রাজনীতি শুরু করে। ফলে স্বাধীনতার পর বাস্তব কারণেই কমিউনিস্ট পার্টির তেমন গণভিত্তি ছিল না।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকার যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি খুব ভালোভাবে সামাল দিতে পেরেছেÑ এটা বলা যাবে না। একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ অস্ত্র-গোলা-বারুদ বাইরে রয়ে গেল, অন্যদিকে জাসদ সৃষ্টি হওয়ার পর সরকার দ্রুত রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে থাকে। জাসদ ছাড়াও অন্যান্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চীনপন্থী গোপন দলগুলো চাঙ্গা হয়ে ওঠে। স্বাভাবিকভাবেই এ ধরনের পরিস্থিতিতে বামপন্থী খোলসে বাংলাদেশের বিরোধিতা করা খুব সহজ ব্যাপার হয়ে ওঠে। গোপন সন্ত্রাসী তৎপরতা বাড়তে থাকে। অসংখ্য থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে সশস্ত্র হামলা  ও লুট করা হয়। বেশ কয়েকটি পাটের গুদামে আগুন ধরানো হয়।

আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, রাজনৈতিক সহিংসতা, অর্থনৈতিক স্থবিরতার সাথে ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালের উপর্যুপরি বন্যা এবং আমেরিকার ষড়যন্ত্রের কারণে ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ১৯৭৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা জারি করে। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ তারিখে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি জাতীয় দলের নাম ঘোষণা করেনÑ বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ Ñ সংক্ষেপে ‘বাকশাল’। জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার পর আইন-শৃঙ্খলার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়। থানা লুটের সংখ্যাও কমে আসে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ইতিবাচক উন্নয়ন ঘটতে থাকে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মাধ্যমে যবনিকাপাত ঘটে বাকশালের এবং সাথে সাথে পরিসমাপ্তি ঘটে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনাধারণকারী রাজনৈতিক ধারার।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিদের মধ্যে অনৈক্যের সুযোগের সদ্ব্যবহার করে একাত্তরের পরাজিত শক্তিরা। পঁচাত্তরের পরবর্তী বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করা হয় তার শিরোমণি ছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি পর্যায়ক্রমে সামরিক ফরমান বলে সংবিধান পরিবর্তন করে ধর্মীয় রাজনীতি পুনঃপ্রবর্তন করে জামায়াতসহ নিষিদ্ধ দলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করেন। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতাকারী, চীনপন্থী রাজনৈতিক দল, মুসলিম লীগসহ অন্যান্য ছোট-বড় সাম্প্রদায়িক দল ও ব্যক্তিদের নিয়ে গড়ে তোলেন প্রথমে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট, পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

এটা ঠিক যে, প্রবণতার দিক থেকে ভাবতে গেলে এই প্রবণতা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকেই শুরু হয়। রাষ্ট্রপতি হিসেবে খোন্দকার মোস্তাক আহমেদ প্রথম ভাষণ শেষ করেন ‘জয় বাংলার’ পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ দিয়ে। এ ছাড়াও ‘বাংলাদেশ বেতার’-এর নাম ‘রেডিও পাকিস্তানের’ আদলে ‘রেডিও বাংলাদেশ’ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে সেনাবাহিনী ও তার প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান যখন স্ব-মূর্তিতে আবির্ভূত হন, তখন নতুন উত্থিত রাজনৈতিক সরকারের রাজনীতি ও আদর্শ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ অগ্রগতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বার বার বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি দেশি-বিদেশি অপশক্তি রোধ করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু বাঙালির লড়াকু মনোভাবের কারণে তারা তা পারেনি। বাঙালি ঐক্যবদ্ধ থাকলে কেউ কোনোদিনই বাঙালির অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে পারবে না। সামনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, এই নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত নেতাকর্মী ও দেশবিরোধী শক্তি যত কথাই বলুক না কেন, যত জোট-ফ্রন্ট তৈরি করুক না কেন, এই নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনালালনকারী দল আওয়ামী লীগকে এককভাবে বিজয়ী করে বাংলাদেশের অগ্রগতির ধারা অটুট রাখতে আজ আমাদের সবাইকে সচেষ্ট থাকতে হবে।

লেখক : রাজনীতিবিদ ও কলামিস্ট

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত