প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পশুরাও প্রয়োজনে একতাবদ্ধ, লোভে বিভক্ত মানুষ

কাকন রেজা : রোযার মাস যখন আসে, তখন গ্যাস্ট্রিকের রোগি বেড়ে যায়। বেড়ে যায় অন্যান্য রোগও। প্রশ্ন না করলেও উত্তর দেয়, ‘ভাইরে, রোযা রাখার ইচ্ছেটা ছিল, কিন্তু ডাক্তার খালি পেটে থাকতে নিষেধ করেছে, তাই রাখা হচ্ছে না।’ এই কথা, দৃশ্য আমাদের চেনা এবং তা আশেপাশের বলেই। রোযার ফজিলত জানি, সংযমে স্বাস্থ্য রক্ষা হয় এটাও জানি, কিন্তু তারপরও ‘চর্ব-চোষ্য-লেহ’র লোভে রোযাটা রাখা হয় না। আর লোভটাকে আড়াল করতেই অজুহাত ব্যবহার হয়। কথায় বলে, বাঙালদের তিনটা হাত, বাম-ডান আর অজুহাত। শেষোক্তটাই বেশি ব্যবহার করে তারা।

রোযার উদাহরণ দিলাম কোনো ধর্মীয় কারণে নয়, চরিত্র চিত্রায়নে। বাঙালদের লোভের বিষয়টি সামনে আনতে। মাঝখানে বলে রাখি সব বাঙালই এই দোষে দুষ্ট নন, লেখাটা শেষ করলেই লোভীদের চেহারা আপনারাই দেখে নিতে পারবেন। এই লোভী বাঙালদের কাজ হলো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা। বিভ্রান্তি থেকেই আসে বিভেদ। আর বিভেদ সৃষ্টি হলেই এক শ্রেণির সুযোগ হয় লুটেপুটে খাওয়ার। ধর্মের উদাহরণটা ছেড়ে আসি এবার, বলি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের কথা। জানি লক্ষ্যটা কী, কিন্তু ওই যে লোভ। এমন সমাজ নির্মাণে যাদের স্বার্থে আঘাত পড়বে তারা লোভের টোপ ফেলেন, আর গিলে খায় লোভীরা। নির্মাণের পথ নিয়ে, মত নিয়ে সৃষ্টি হয় বিভ্রান্তি, তা থেকে বিভেদ। একজন এক তত্ত্ব দেন, আরেকজন ফাঁদেন অন্য কৌশল। সৃষ্টি হয় দল, উপদল, নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি। সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন পরিণত হয় তামাশায়। আর এই তামাশায় আনন্দ পায় সেই গোষ্ঠী, বৈষম্যহীন সমাজ আকাক্সক্ষা যাদের সমাজচ্যূত করার স্বপ্ন দেখে।

ভারতীয় উপমহাদেশ শাসনে ব্রিটিশরা এই কৌশলের প্রয়োগ করেছিল সফল ভাবে। তারা একটি লোভী সমাজ সৃষ্টি করতে পেরেছিলো। বিভিন্ন খেতাব, উপাধি, নজরানা ছিল ব্রিটিশদের সেই লোভের টোপ। এই লোভীদের কারণেই তিতুমীররা সফল হতে পারেননি। ব্রিটিশ বেনিয়ারা সৃষ্টি করেছিল উমি চাঁদ, জগৎশেঠ গোষ্ঠী, ফলে পতন ঘটেছিল সিরাজের। যেমন, পাকিস্তানীরা সৃষ্টি করেছিল রাজাকারদের। এ ছিল ব্রিটিশ চাতুর্যেরই পুনরাবৃত্তি। কালে-কালে এই ঘটেছে। যখনই প্রয়োজনে, বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হবার চেষ্টা করেছে, তখনই লোভের ফাঁদ পাতা হয়েছে, হয়। আর লোভীরা কীট-পতঙ্গের মতন সেই ফাঁদে গিয়ে পড়ে, পড়েছে। এভাবেই সময়ান্তরে মতভেদের রাস্তা ধরে সৃষ্টি হয়েছে বিভ্রান্তি এবং বিভেদ।  মত-পথ মানুষের প্রয়োজনেই। মানুষের বেঁচে থাকাটাকে নিরাপদ, নিশ্চিন্ত করতেই বিভিন্ন মত-পথের সৃষ্টি। মূল লক্ষ্যটা হলো মানুষের নিশ্চিন্ত জীবনযাপন।

সেই জীবনযাপন যখন বিঘিœত হয়, মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো লঙ্ঘিত হয়, মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, তখন ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না। আর সেই পথটাই হলো মূল লক্ষ্য অর্জনের পথ এবং সেটাই একমাত্র। এটা বুঝেও যারা বিভ্রান্তি ছড়াতে চায়, বিভেদ বাড়াতে চায়, তাদের ইতিহাস চিহ্নিত করে উমি চাঁদ, জগত শেঠ হিসাবেই। আর যারা মানুষের নিশ্চিত জীবনযাপনের পথে সরাসরি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, সে আদেশে হোক আর লোভেই হোক, তারা মীরজাফর। সাম্রাজ্যবাদ তাদের পেছনের শক্তি। ফুটনোট : লেখাটা ততটা বড় নয়, জীবনযাপনের মূল তত্ত্বটাও কিন্তু খুব বড় নয়। নিজে বাঁচো, অন্যকে বেঁচে থাকতে দাও এবং তা মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করে, এর বাইরে কিছু নেই। কিন্তু মুশকিল হলো নিজে বাঁচা এবং অন্যের বেঁচে থাকটাকে লোভীরা দুটো ভাগে ভাগ করে ফেলে।

তারা নিজে বাঁচতে চায় এবং সে বাঁচার প্রক্রিয়ায় অন্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও। নিজে একা বাঁচার চিন্তাই হলো কুচিন্তা। পশুরাও সমাজবদ্ধ হয়ে বাঁচার চেষ্টা করে। প্রয়োজনে এক হয়ে লড়ে শত্রুর বিরুদ্ধে। লোভী মানুষরা পশুদেরও পেছনে ফেলে দেয়, দিয়েছে।

লেখক : সাংবাদিক, কলাম লেখক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ