প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অরক্ষিত অবহেলিত উপকূল

ডেস্ক রিপোর্ট : অরক্ষিত আর অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে দেশের বিশাল সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল। ২২টি উপকূলীয় জেলায় সাড়ে ৪ কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস। দুর্যোগ-দুর্বিপাক সেখানে বারে বারে আঘাত হানে। উত্তাল দরিয়ার কিনারে ঘরবসতি নিয়ে ‘সিনা’ (বুকের পাটা) দিয়ে ঝড়-তুফান ঠেকানোর জন্য প্রতিনিয়ত প্রাণপণ লড়াই করে বেঁচে আছে উপকূলবাসী। তবে তারা ভালো নেই। ‘মোরা’ ‘রোয়ানু’ ‘সিডর’ ‘আইলা’ ‘নার্গিস’সহ বছর বছর সর্বনাশা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত উপকূল। বর্তমান সময়টাও ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছাস, নিম্নচাপের কারণে দুর্যোগের উচ্চঝুঁকির মৌসুম। চলতি এপ্রিল, আগামী মে ও জুন মাসের প্রথমার্ধ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে ৩ থেকে ৪টি নিম্নচাপ সৃষ্টি এবং সেখান থেকে ঘনীভূত হয়ে শক্তি সঞ্চয় করে অন্তত একটি ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছাসের আশঙ্কার কথা দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। সমুদ্রতলের পানির তাপমাত্রা ও উচ্চতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরফলে দুর্যোগের আলামত তৈরি হচ্ছে এমনটি বিশেষজ্ঞমহলের আশঙ্কা। সমুদ্রের উপরতলে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা অতিক্রম করে গেলে লঘুচাপ-নিম্নচাপ ও সেখান থেকে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হতে পারে।

এদিকে সমুদ্র বন্দর, জ্বালানি স্থাপনা, প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ, পর্যটনকেন্দ্র, লবণশিল্প, চিংড়িসহ মৎস্যসম্পদ, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা স্থাপনা, বিমান বন্দর থেকে শুরু করে ফল-ফসল, ক্ষেত-খামারসহ অজ¯্র প্রাকৃতিক সম্পদরাজির ধারক হচ্ছে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপকূলভাগ। অথচ সম্পদে ভরপুর উপকূলীয় অঞ্চল অরক্ষিত থাকায় কোটি মানুষের ভীতি-শঙ্কা বেড়েই চলেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজারের টেকনাফ-শাহপরীর দ্বীপ, কুতুবদিয়া-মহেশখালী, চট্টগ্রামের বাঁশখালী-আনোয়ারা-সন্দ্বীপ-পতেঙ্গা-সীতাকুন্ড-মিরসরাই, নোয়াখালীর হাতিয়া থেকে ভোলা দ্বীপজেলা পর্যন্ত সর্বত্রই উপকূল, চর, দ্বীপাঞ্চলের প্রধান ‘প্রতিরক্ষা দেয়াল’ প্রায় ৮৭৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অবস্থা নাজুক। অনেক জায়গায় বেড়িবাঁধের চিহ্ন মুছে গেছে। দেশের দ্বীপাঞ্চল ও উপকূলে ৩৮ ভাগ জায়গায় বেড়িবাঁধের চিহ্ন কমবেশি মুছে গেছে। ৪৪ ভাগ বেড়িবাঁধ ভাঙাচেরা ও নড়বড়ে। বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও জোড়াতালির মেরামতের নামে বছর বছর চলছে সীমাহীন দুর্নীতি। সামুদ্রিক নিয়মিত জোয়ার-ভাটার পানিতে ডুবে যাচ্ছে বিধ্বস্ত বাঁধ সংলগ্ন গ্রাম-জনপদ, হাট-বাজার ও ফসলি জমি।

ভাঙাচোরা ক্ষতবিক্ষত ও নড়বড়ে বেড়িবাঁধ শুষ্ক মৌসুমে উপযুক্ত সময়ে সংস্কার ও পুনঃর্নিমাণ করা হয়না। প্রায় সময়ই অভিযোগ পাওয়া যায়, ঘূর্ণিঝড় তথা দুর্যোগের মৌসুম ঘনিয়ে এলেই বাঁধের জোড়াতালি মেরামত কাজ চলে। এতে অনিয়ম, কারচুপি ও শুভঙ্করের ফাঁকি যেন ‘নিয়ম’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেই সুষ্ঠু মনিটরিং ও কাজের মানের তদারকি। অসৎ ঠিকাদার ও পাউবোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সেই পুরনো সিন্ডিকেটের যোগসাজশ যথেচ্ছ সরকারি অর্থেও হরিলুট হচ্ছে। নিম্নচাপ, জলোচ্ছাস ও ঘূর্ণিঝড় এলে ফাঁকিঝুকির বেড়িবাঁধ প্রথম ধাক্কাতেই সাগরে বিলীন হয়ে যায়। শত শত কোটি টাকা যায় পানিতে। এরপর আবার টেন্ডার, আবার বাজেট ও অনিয়মের কৌশলে অর্থ লোপাট। বছর বছর ভাঙছে বাঁধ, তবে ভাঙছে না সেই অসৎ সিন্ডিকেট। স্থায়ী টেকসই বেড়িবাঁধ আজো নির্মিত হয়নি। চট্টগ্রাম শহররক্ষা বাঁধের স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেছে। বর্ষায় বর্ষণ ও জোয়ারে তলিয়ে যাচ্ছে বন্দরনগরীর আগ্রাবাদ, হালিশহরসহ বিরাট অংশ। এ অবস্থায় দেশের ৭১৫ কিলোমিটার সমুদ্র উপকূলীয় তটরেখা বরাবর বঙ্গোপসাগর অশান্ত কিংবা সতর্ক সঙ্কেত দেয়া হলেই চর-উপকূল-দ্বীপাঞ্চলের ২২ জেলায় সাড়ে ৪ কোটি মানুষ চরম উৎকণ্ঠা-আতঙ্কে কাটায়।

শতাব্দীর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসের আজ (রোববার) সেই ২৯ এপ্রিল। ১৯৯১ সালের এই কালোরাতে সর্বনাশা গর্কির আঘাতে ব্যাপক জানমালের ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। উপকূলীয় অঞ্চল পরিণত হয় বিরানভূমিতে। যার ক্ষত আজও পুরোপুরি শুকায়নি। অথচ দীর্ঘ ২৭ বছর পর এখনও দেশের মূল্যবান সম্পদের আধার উপকূল সুরক্ষার তেমন কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। চিরদূর্গত ও বঞ্চিতই রয়ে গেছে উপকূলবাসী। শুধু বেড়িবাঁধের ক্ষেত্রেই নয়; উপকূলজুড়ে ‘গ্রিন বেল্ট’ বা ‘সবুজ বেষ্টনি’ সৃজনের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও মাঠ পর্যায়ের কতিপয় ‘বনের রাজা ওসমানে’র নয়-ছয় করে অনিয়ম-দুর্নীতি আর বনদস্যুদের কারণে তা অনেক জায়গায় উজাড় হয়ে যাচ্ছে। একদিকে বনায়ন হচ্ছে আরেকদিকে সাবাড় হয়ে যাচ্ছে। সুষ্ঠু সমন্বয়ের অভাব প্রকট। অবশ্য বর্তমান প্রধান বনসংরক্ষকের একনিষ্ঠতা ও বলিষ্ঠ সততার ফলে উপকূলীয় বনায়নে দুর্নীতি-ফাঁকিরোধ করে দেশের বনজসম্পদ সুরক্ষা ও বৃদ্ধির প্রয়াস এগিয়ে চলছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে উপকূলীয় কেওড়া, বাইন, সুন্দরী, গেওয়াসহ বনাঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে ব্যাপক। এতে করে সিডরের মতো বিভিন্ন দুর্যোগে প্রাকৃতিক ঢাল বা প্রতিরক্ষাব্যুহ রূপে বনভূমির শক্তি-সামর্থ্য ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে।

দুর্যোগে উপকূলবাসীর জানমালের ঝুঁকি প্রসঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, রেডক্রিসেন্ট ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির সাবেক আঞ্চলিক পরিচালক এজেএম গোলাম রাব্বানী গতকাল ইনকিলাবকে জানান, বেড়িবাঁধের সংস্কার কাজ এখনও শেষ হয়নি। নিয়মিত সামুদ্রিক জোয়ারের পানি উপকূলীয় জনপদে প্রবেশ করে ও বের হয়। সাইক্লোন শেল্টারের সংখ্যাও অপ্রতুল। নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্কেত দেয়া হয় ঠিকই, কিন্তু এত মানুষ কোথায় নিরাপদ আশ্রয় পাবে? বিপদের ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে অনেকেই। স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, এরজন্য সরকারি কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। উপকূলে বনায়ন আরও জোরদার করে সবুজ বেষ্টনি গড়ে তোলা অপরিহার্য।

এদিকে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ের পরই দুর্যোগ-প্রবণ সমুদ্র উপকূল, চর ও দ্বীপাঞ্চলে জানমাল রক্ষায় অগ্রাধিকার পরিকল্পনার ভিত্তিতে অবকাঠামো সুবিধাদি গড়ে তোলার জন্য সরকার একটি পদক্ষেপ নেয়। এর আওতায় ‘সচিব এম মোকাম্মেল কমিটি’র দীর্ঘ প্রতিবেদন ও সুপারিশমালায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় উপকূলে নিরাপত্তায় পরিকল্পিত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ। আরও ছিল বহুমুখী সুবিধাসম্পন্ন সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ, সহজ ও বোধগম্য আবহাওয়া সতর্ক সঙ্কেত ব্যবস্থা প্রচলন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, উপকূলে এনজিও কার্যক্রমের সমন্বয়, দুর্যোগকালীন খাদ্যশস্য ও গবাদিপশু রক্ষার ব্যবস্থাসহ খাতওয়ারি সমস্যা চিহ্নিত করে সুষম উন্নয়ন। কিন্তু ২৭ বছরেও এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। কাটেনি উপকূলবাসীর আতঙ্ক। বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধের অবস্থা খুবই বেহাল। তবে এবছর

আনোয়ারায় আড়াইশ’ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ায় নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন উপকূলবাসী। পাউবো সূত্র জানায়, উপকূলে ৪০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এতে সিসি ব্লক, বেড়িবাঁধ সংস্কার ও নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজ চলছে। বছরজুড়ে বাঁধহীন অরক্ষিত থাকা বার আউলিয়া, ধলঘাট, বাছা মিয়া মাঝির ঘাট এলাকায় নির্মিত হয়েছে বেড়িবাঁধ। তবে এখনো খোলা রয়েছে ফকিরহাট এলাকার ৫শ’ মিটার বাঁধ। রায়পুর ইউনিয়নের পূর্ব গহিরার ফকিরহাটের বাসিন্দা আবদুর রহিম বলেন, ২৯ এপ্রিল মানে আমার জীবনে অসহনীয় শোকের দিন।

সূত্র : ইনকিলাব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত