প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আইনের দর্শনে ধর্ষণ অতঃপর করনীয়

জাহিদুল করিম মিয়াজী : সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণ বড় ধরনের যন্ত্রনার একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু দেশ নয়, তা বিশ্ব দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ছত্রাক আকারে। যার দরুন নারী-পুরুষের বিদ্ধেষ ছড়িয়ে পড়ছে মহামারী আকারে , একে অপরের দোষ চাপাচ্ছে নিজের চিন্তা প্রসুত দলিল দিয়ে। কেও ধষিত হলে যত দ্রুত সম্ভব উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতাল/ থানার মাধ্যমে পুলিশের সহায়তায় হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। মেডিকেল টেস্ট পরে করলেও হবে, এই ধারণা নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। যত দ্রুত সম্ভব মেডিকেল টেস্ট করতে হবে, না হলে আলামত নষ্ট হতে পারে বা পরবর্তীতে মামলার ক্ষেত্রে আসামীর অনুকুলে প্রতিবেদন যেতে পারে। ধর্ষনের ডাক্তারী পরীক্ষার জন্য আদালতে অনুমতি বা আদেশের কোন প্রয়োজন নেই। তবে তা সরকারী হাসপাতালে করলে সবচেয়ে ভাল হয়। “লোক জানাজানি হবে” এই ভয়ে ঘরে বসিয়ে থাকা একদম চলবেনা।

নিজের অত্যাচারের শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণে সচেতন হয়ে এগিয়ে যেতে হবে সাহসের সাথে। থানা পুলিশের মতই হাসপাতালে রুগীর গোপনীয়তা রক্ষা করা হাসপাতালের দায়িত্ব, তথা আইনজীবিরও। আগে এফ আই আর করে আসুন এই কথা বলার অধিকার হাসপাতালের নেই, আক্রান্ত মেয়েটি আগে হাসপাতালে এলে পুলিশে খবর দেয়ার দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। মেডিকেল টেস্ট যদি ধর্ষণ প্রমাণ না হয়, এই ভেবে ঘাবড়াবেন না।

ডাক্তারী পরীক্ষার রিপোর্ট এ বিষয়ে চরম প্রমাণ তা নয়। মেয়েটির নিজের বক্তব্য বা সাক্ষীদের বক্তব্যকে বেশি গুরুত্ব দেয় আদালত। যে কোন কারণে শারীরিক , মানসিক ধকল গেলে গোসল করলে অনেকটাই শান্তি পাওয়া যায়, তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই নয়। কারণ, তাতে বহু প্রয়োজনীয় আলামত লোপ পেয়ে যায়। নোংরা কাপড় ধুয়ে ফেলি এতেও অনেক প্রমান নষ্ট হয়ে যায়। জামাক কাপড়ে মাটি বা ময়লার দাগ আছে কিনা, তা কোথাও ছিড়েছে কিনা, তাতে দেহ রস রক্ত বা অন্য কিছুর দাগ আছে কিনা, তা সবই আইনের চোখে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। জামা কাপড়, অর্šÍবাস, কোন কিছুই কাচবেননা, ভাঁজ করে ঢুকিয়ে রাখুন প্লাষ্টিকের প্যাকেটে, পুলিশকে দিন এবং খোঁজ রাখুন, তা ফরেনসিক পরীক্ষায় পাঠানো হলো কিনা ।

এফ আই আর করার সময় পুলিশের কাছে সবকিছু বর্ণনা করুন। পুলিশকে নিজের ইচ্ছামত লিখতে দিবেন না, এতে অনেক তথ্য বাদ থেকে যেতে পারে। প্রয়োজনে আইনজীবির সহায়তা নিন, এটা মামলাকে দুর্বল করে। ঘটনার সময় ঠিক কোথায় ঘটেছে, কি কি ঘটেছে যে সব ধরণের নির্যাতন করেছে সব কথায় নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট বলতে হবে। অভিযুক্তের নাম জানা থাকলে অবশ্যই লিখুন,নইলে যতটা সম্ভব তার বিবরণ দিতে হবে।

লজ্জা ভয় ঝেড়ে ফেলে নির্ভেজাল সত্য কথা লিখুন। বাইরে সাক্ষাত করে নেওয়াই ভাল, এই পরামর্শ পুলিশ কিংবা অনেক পাড়াপড়শিও কখনও কখনও দিয়ে থাকে। নানা ধরনের যুক্তি দেয়া হয়, যেমন রোজ কোর্টে যেতে হবে, কোনদিন প্রমাণ হবেনা, জানাজানি হয়ে যাবে, মেয়ের বিয়ে হবেনা, বরং ক্ষতি পুরণের টাকা নিয়ে নিন। মনে রাখবেন, ধর্ষণ সালিশ ও আপোষযোগ্য নয়, ইহা দন্ডনীয় ও জামিন অযোগ্য। কোর্টে রোজ যেতে হয়না, সবার সামনেও বিচার হয় না, আক্রান্ত মেয়েটি যদি কাউকে সঙ্গে চায় তবে সে থাকে কেবল বিচার কক্ষে, নইলে দুপক্ষের উকিল ও বিচারকই কেবল থাকেন। বিচার হয় বদ্ধ ঘরে (ইন ক্যামেরা) বিপক্ষে উকিল যাতে অশালীন, অস্বস্তিকর প্রশ্ন করতে না পারে তার জন্য বিচারক রয়েছেন ভুক্তভোগী দের পাশে। মেয়েটারও দোষ আছে অভিযুক্ত অনেক সময় দাবি করে, মেয়েটির সম্মতি ছিল। মেয়ের ১৬ এর নিচে হলে তার সম্মতির প্রশ্নই উঠেনা। বালিকা সঙ্গমই ধর্ষণ।

জেনে রাখা ভাল, ধর্ষণের অধিকাংশ মামলায় আদালত রিমান্ড মঞ্জুর করে থাকেন। ৩২ ধারায় মৃত্যুকালীন জবানবন্দী (উুরহম উবপষধৎধঃরড়হ ) নামে পরিচিত । সুতরাং, ধর্ষিতার মৃত্যু হলেও তার জবানবন্দি আসামীর শাস্তির জন্য যথেষ্ঠ। ফৌজদারী কার্যবিধি ১৬৪ এবং ৩৬৪ ধারা অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট আসামীর দোষ স্বীকারোক্তি মুলক জবানবন্দি নিয়ে থাকে। সাক্ষ্য আইনের ৬০ ধারা অনুযায়ী মৌখিক সাক্ষ্য প্রত্যক্ষ হতে হবে।

নাবালিকা হলে তার মামলা তার পরিবার বা দায়িত্বরত গার্ডিয়ান পরিচালনা করতে পারবে। ভিডিও ধারণ ও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া যা আসামীর জন্য আরো কাল হয়ে দাড়াবে। ওঈঞ ধপঃ-২০০৬ ঝবপঃরড়হ-৫৭ যার সাজা ১০ বছর পর্যন্তও হতে পারে। ক্ষেত্র বিশেষ মামলা পরিচালনার স্বার্থে বাদী পক্ষের নিজ জেলায় মামলা স্থানান্তর যোগ্য।

সাধারণত ধর্ষণের ক্ষেত্রে অপহরণ হয়ে থাকে। অপহরণের ধারা (সংজ্ঞা) ৩৫৯, ৬০,৬১,৬২ যা এ সম্পর্কে বিশদ ভাবে বলা আছে। সাধারণত ধর্ষণের ক্ষেত্রে হত্যা একটি কমন বিষয়। ধারা হচ্ছে ৩০২, মামলা করার ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ধারাগুলো উল্লেখ করতে ভুলবেন না।

ধর্ষণ প্রমান হলে অগ্রিম জামিন বাতিল করা হয় এবং অগ্রিম জামিন দেয়না বললেই চলে। মনে রাখবেন ৩৬০ ধারায় বলা হয়েছে- “১৬ বছরের নিচে নিজ সম্মতি থাকলেও তা ধর্ষণ বলে বিবেচিত হবে”।

১৬ বৎসর বয়সের মেয়েকে তাহার সম্মতিতে বিয়ে করলেও তা ধর্ষণ বলে বিবেচিত হবে। সাধারণত ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা করে থাকে অনেকেই। যদি ধর্ষণ নাও হয়, তবে ৩০৬ ধারা অনুযায়ী আত্মহত্যাকরী বা সহায়তাকারী উভয়েই ১০ বছর জেল। এই ক্ষেত্রে আত্মহত্যাকারীর বয়স বিবেচ্চ নয়। আপনার আইজীবিকে এই দ্বারা আরো সহয়তা করে থাকে মামলার অগ্রগতিতে। ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৭ ধারা অনুযায়ী পুলিশ কোন অপরাধের তদন্ত ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করবে। কিন্তু ১২০ দিনের মধ্যে অপরাধের তদন্ত শেষ না হলে এখতিয়ার সম্পন্ন ম্যাজিষ্ট্রেট মৃত্যু দন্ডে দন্ডনীয় অপরাধ এবং যাবৎ জীবন কারাদন্ডে দন্ডনীয় কোন অপরাধ ছাড়া অন্যান্ন ক্ষেত্রে জামিন দিতে পারে। এবার বুঝুন ধর্ষণকারীর মুক্তি কল্পনাও ভাবা যায়না।

ফৌজদারী কার্যবিধির ১৭২ ধারায় পুলিশ ডায়েরী সম্পর্কে বলা হয়েছে, পুলিশের তদন্তের অগ্রগতি যে ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করা হয়, সেটা হল পুলিশি ডায়েরী। যে কোন ফৌজদারী আদালত অনুসন্ধান বা বিচারাধীন কোন মামলায় পুলিশি ডায়েরী চেয়ে পাঠাতে পারেন।

এই ডায়েরী সাক্ষ্য হিসাবে নয়। বরং উক্ত মামলার অনুসন্ধান বা বিচারের সহায়ক হিসাবে ব্যবহার করতে আদালত পুলিশি ডায়েরী তলব করতে পারে। দেখুন ফৌজদারী কার্যবিধি, ১৮৯৮এর ধারা-১৭২ । মনে রাখবেন একজন ধর্ষক কেবল একজনের জীবন নষ্ট কারী নয়, সে পুরো জাতির শান্তি বিনষ্টকারী। একজন ধর্ষক হাজারো বোনের রাতের আধারের আতংক, একাকিত্ব্যে তীব্র মানষিক চাপ আর দুঃসময়ের অবসাধ। উজ্জল সম্ভাবনীয়ময় ভবিষ্যৎ জীবনের কালো ছায়া। পুরুষ জাতির জন্য অভিশাপ, কলংক ও ধিক্কার। তাই আসুন রাজনৈতিক ছত্র ছায়ায় এদের আশ্রয় না দিয়ে, উজ্জ্বল বাংলাদেশ গড়ায় ও শান্তিময় একটি বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় এদেরকে রুখে দিন ।
পরিচিতি : আইন বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট/সম্পাদনা : মাহবুবুল ইসলাম

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত