প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দুই দশক ধরে পরিবেশ দূষণের শীর্ষে বস্ত্র ও চামড়া

ডেস্ক রিপোর্ট : বস্ত্র খাতের প্রতিষ্ঠান মায়মুন টেক্সটাইল লিমিটেডের কারখানাটি গড়ে উঠেছে তুরাগের একেবারেই তীরঘেঁষে। গাজীপুরের কাশিমপুরের এ কারখানার বর্জ্য পাইপের মাধ্যমে সরাসরি ফেলা হচ্ছে তুরাগের পানিতে। লালচে রঙের এ পানি নদে পড়েই তৈরি করছে সাদা রঙের ফেনা। কারখানার আরেক পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে নদের সঙ্গে মিশেছে ছোট একটি নালা। তুরাগের পানিতে বর্জ্য আসছে এ নালা বেয়েও।

কারখানার পাশেই একটি চায়ের দোকানে গল্প করছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা আবদুস সবুর। কারখানাটি দেখিয়ে জানতে চাইলে নামাবাজারের এ বাসিন্দার উত্তর, ওটা তো মায়মুন কারখানা। শুরু থেকেই দেখে আসছি, কারখানার পানি সরাসরি তুরাগে ফেলা হচ্ছে।

মায়মুন টেক্সটাইলের মালিক বস্ত্র খাতে দেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠান দুলাল ব্রাদার্স লিমিটেড (ডিবিএল)। যদিও দূষণ নিয়ন্ত্রণের সব প্রতিশ্রুতিই ডিবিএল গ্রুপ রক্ষা করে চলছে বলে দাবি গ্রুপের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও গ্রুপ সিইও মোহাম্মদ আবদুল কাদেরের। তিনি বলেন, আমাদের কারখানা থেকে অল্প একটু দূরে আরো কতগুলো কারখানার লাইন এসে নেমেছে। সেই কারখানাগুলোর পানি হয়তো আপনারা দেখেছেন। আমাদের কারখানার ইটিপি ২৪ ঘণ্টাই সচল থাকে।

তৈরি পোশাক রফতানি থেকে প্রতি বছর প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারের যে আয় হচ্ছে, তাতে পশ্চাৎ শিল্প হিসেবে বড় ভূমিকা রাখছে এ বস্ত্র খাতই। পরিবেশ দূষণেও এগিয়ে আছে তারাই। সবচেয়ে বেশি দূষণকারী শিল্প হিসেবে দুই দশক আগে বস্ত্র খাতকে লাল শ্রেণীভুক্ত করা হলেও এখনো একই শ্রেণীতে আছে শিল্পটি।

দুই দশক ধরে লাল শ্রেণী থেকে বেরোতে পারছে না পরিবেশ দূষণের জন্য বেশি দায়ী আরেক খাত চামড়া শিল্প। যদিও বুড়িগঙ্গা দূষণের ঘটনায় নানা উদ্যোগের পর সাভারের চামড়া শিল্পপল্লীতে স্থানান্তর করা হয়েছে হাজারীবাগের ট্যানারি কারখানা। তার পরও দূষণ থামেনি। বুড়িগঙ্গার পর চামড়া শিল্পে দূষিত হচ্ছে এবার তুরাগ। পরিবেশ দূষণে বড় ধরনের ভূমিকা রাখা এ খাতটি থেকেও প্রতি বছর রফতানি আয় আসছে।

শিগগিরই এ দূষণ নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে জানান বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ। তিনি বলেন, সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের (সিইটিপি) দায়িত্বে আছে একটি চীনা প্রতিষ্ঠান। আমরা বলেছি, কোম্পানি গঠন করে এ দায়িত্ব আমাদের বুঝিয়ে দেয়া হোক। তাহলে আমরা দক্ষতার সঙ্গে সিইটিপি পরিচালনা করতে পারব। তখন ট্যানারির মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে।

পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী শিল্পগুলোকে সবুজ, কমলা-ক, কমলা-খ ও লাল শ্রেণীতে ভাগ করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী পরিবেশ দূষণের মাত্রা বিবেচনায় শিল্পের এ শ্রেণী বিভাজন করা হয়। সবচেয়ে দূষণকারী হিসেবে ওই সময় বস্ত্র ও চামড়া শিল্পকে লাল শ্রেণীভুক্ত করা হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, দেশের শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি দূষিত করছে বায়ু ও পানি। পানিদূষণের জন্য দায়ী মূলত বস্ত্র ও চামড়া শিল্প। অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, শিল্পে উৎপাদিত বর্জ্য পরিশোধনের পর তা নিষ্কাশনের নিয়ম থাকলেও এ দুই শিল্পে সেটি পুরোপুরি মানা হচ্ছে না। অনেক শিল্প ইউনিটে এখনো বর্জ্য পরিশোধন প্লান্টও (ইটিপি) নেই। থাকলেও সবসময় তা সচল থাকে না।

চলতি বছর জুলাই পর্যন্ত পরিবেশ অধিদপ্তরের শনাক্ত করা ইটিপি স্থাপনযোগ্য শিল্প ইউনিট ছিল ২ হাজার ১৭টি। এর মধ্যে ইটিপি স্থাপন হয়েছে ১ হাজার ৫৭১টিতে। এ হিসাবে ২২ শতাংশ শিল্প ইউনিটে ইটিপি নেই। ইটিপি আছে এমন শিল্প ইউনিটগুলোর মধ্যে ১ হাজার ৫৬৫টিতে সেগুলো সচল আছে দাবি করা হলেও তা নিয়ে সংশয় রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের। বস্ত্র ও চামড়া শিল্প নিয়েই বেশি সংশয় তাদের।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অতিরিক্ত সচিব মো. রইছউল আলম মন্ডল বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় শিল্প খাত বস্ত্র ও চামড়া। স্বাভাবিকভাবেই পরিবেশ দূষণও সবচেয়ে বেশি করছে তারাই। এ শিল্পগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি চাহিদা দুই ক্ষেত্রেই অবদান রাখছে।

তবে কেন্দ্রীয় ইটিপি পুরোপুরি কার্যকর হলে চামড়া শিল্পের দূষণ নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে করেন তিনি। যদিও বস্ত্র শিল্প নিয়ে সংশয় থাকছেই। মো. রইছউল আলম মন্ডল এ প্রসঙ্গে বলেন, বস্ত্র খাতের ডায়িং-ওয়াশিংয়ের মতো ক্ষেত্রগুলোয় কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে। সবাই যে কমপ্লায়েন্ট, তা বলা যাবে না। কিন্তু খাতটির দূষণ নিয়ন্ত্রণেও অগ্রগতি হচ্ছে। এ খাতের দূষণের মাত্রা আগের চেয়ে কমেছে। এমন কারখানা আছে, যারা শতভাগ পানি পুনরায় ব্যবহারও করছে। তবে সংখ্যাটা অনেক কম, উল্লেখ করার মতো নয়।

বস্ত্র ও চামড়া শিল্পের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি পানিদূষণের বিষয়টি উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়ও। ২০১১ সালে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডিইউইটি) পানিদূষণে নেতিবাচক ভূমিকা রাখা শিল্পগুলোর একটি র্যাংকিং করে। কারখানা থেকে নিষ্কাশিত পানি পরীক্ষা করে দূষণের মাত্রা অনুযায়ী এ র্যাংকিং করা হয়। তাতে দেখা যায়, দেশের পানির ব্যবহারে চামড়া শিল্প এক্সট্রিম বা চরম সীমায় পরিবেশ দূষণ করছে। র্যাংকিংয়ে শিল্পটি দ্বিতীয় অবস্থানে। আর বস্ত্র শিল্পের পানিদূষণ ছিল উচ্চসীমার। শিল্পটি ছিল র্যাংকিংয়ে প্রথম অবস্থানে।

ডিইউইটির গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রফেসর মো. আবদুল হান্নান মিয়া। গবেষণা বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিল্প থেকে ছেড়ে দেয়া পানি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দূষণের মাত্রা অনুযায়ী শিল্প র্যাংকিং করা হয়েছিল গবেষণায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিবেশদূষণে বস্ত্র ও চামড়া শিল্পই এগিয়ে আছে বলে মনে করি। এখন পরিশোধন সক্ষমতার উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু নানাবিধ কারণে সক্ষমতার শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

পরিশোধন সক্ষমতার শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, এমন তথ্য দাবি করেছে পরিবেশ অধিদপ্তরও। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মতে, খালি চোখে দেখা যায় যে, শিল্পগুলোর সবাই ইটিপি চালায় না। কিন্তু রাতে বিষয়টি যথাযথ নজরদারি ও পরিদর্শনের জন্য যথেষ্ট সক্ষমতা অধিদপ্তরের নেই। আবার ইটিপি চললেও হবে না, ওটা চালাতে হবে। এ কাজের জন্য প্রয়োজন যথাযথ কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী। এ কর্মী পরিশোধনে নির্ধারিত মাত্রার কেমিক্যাল ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারেন। ইটিপি থাকলেও অনেক কারখানায় কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী নেই। এসব কারণেই ইটিপি চললেও নদীর পানি লাল হয়ে যাচ্ছে। আবার ইটিপি সংখ্যায় আছে, তবে বাস্তবে চলছে না।

যদিও আগের চেয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল ডায়িং প্রিন্ডিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ আবু কাসেম। তিনি বলেন, আরো উন্নতির জন্য নজরদারি বাড়াতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা গবেষণায় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে শিল্পগুলোকেও।

সূত্র : বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত