প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাখাইনে জাতিগত নিধনের প্রেক্ষাপট

অধ্যাপক ড. এম এ মাননান : মিয়ানমার আসলে বার্মা নামক একটি দেশ। মাত্র কয়েক বছর আগে নামটি পাল্টে ফেলা হয়েছে। এটাই নাকি আদি নাম। চলুন, একটু ফিরে তাকাই দেশটির ইতিহাসের দিকে। জানা যায়, ১০০ খৃস্টপূর্ব সময়কাল থেকে বার্মা ছিল ভারত ও চীনের মধ্যে ব্যবসার অন্যতম প্রধান রুট। ঔপনিবেশিক আমলের পূর্বে বার্মার অর্থনীতি ছিল মূলত সাবসিস্টেন্স অর্থনীতি। জনগণ সকলেই কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত এ দেশে কোন ফরমাল মানিটারি সিস্টেম ছিল না। কৃষির পুরোটাই ছিল রাজন্যবর্গের হাতে। খনিজ সম্পদ, বনজ সম্পদ ও রপ্তানির সব কিছু ছিলো তাদেরই নিয়ন্ত্রণে।
১০৫৭ সালে প্রথম মায়ানমার স্টেট অব পাগান প্রতিষ্ঠিত হলেও মঙ্গোলিয়ানদের আক্রমণে পাগান রাজত্বের পতন হয়। ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয় অনেকগুলো যুধ্যমান রাষ্ট্রের। ১৮২৪ সালে বৃটিশরা দখল করে নেয় মায়ানমার রাষ্ট্রটি। রাজত্ব করে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত। এ বছরই স্বাধীন হয় দেশটি। কিন্তু স্বাধীন হলে কী হবে! কোন্দল তাদের পিছু ছাড়েনি। জাতিগত বিরোধ প্রকট আকার ধারণ করে; একটুও কমে নি এখনও। পরিণতিতে সেনাবাহিনী এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা কুিক্ষগত করে নেয় ১৯৬২তে। মিলিটারী জান্তা ক্ষমতায় আসর পর থেকেই দেশটির ওপর পড়ে শণির আছর। সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত দেশটিতে কখনও এরপর শান্তি কায়েম হয়নি। একশ’রও বেশি গোত্রে বিভক্ত দেশটিতে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে ক্ষমতাসীনদের হাতের পুতুল অং সান সু চি’র বাবা (যিনি হলেন দেশটির স্বীকৃত জাতির জনক) আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন বটে, কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেননি। আঁততায়ীর (আসলে মিলিটারি জান্তার) হাতে নিহত হন। ১৯৯০ সালের নির্বাচনে বিরোধী দল, ন্যাশনাল লীগ ফর ডিমোক্র্যাসি (এনডিএল), জয়লাভ করলেও জান্তা ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে। ২০১১ সাল পর্যন্ত চলে মিলিটারী জান্তা শাসন। ২০১৫-এর নির্বাচনে এনডিএল জয়লাভ করে। কয়েক যুগ জেলে বন্দি থাকা অং সান সু চি’র রাজনৈতিক মোর্চা ক্ষমতায় আসে। তবে সেনাবাহিনী আসল ক্ষমতা নিজেদের হাতেই রেখে দিয়েছে আজ অব্দি। রক্তপাতহীন আন্দোলনের মাধ্যমে অনেকটা শান্তিপূর্ণ উপায়ে তথাকথিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বীকৃতিস্বরূপ সু চি পান শান্তিতে নোবেল পুরস্কার। এই শান্তির ’রানী’ এখন রাখাইনবাসী মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনী কর্তৃক ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের ব্যাপারে একেবারেই ভাবলেশহীন।
জান্তÍার আমলে স্বৈরাচারী সরকারের কাজই ছিল বিরোধীদের ধরে ধরে জেলে পুরা, মানবাধিকার লঙ্ঘন করা, জুলুম-নির্যাতনের মাধ্যমে পাহাড়-অরণ্যে ভরা মিয়ানমারের শতধা বিভক্ত দারিদ্র্য-পীড়িত জনগণকে দাবিয়ে রাখা। সংখ্যাগরিষ্ঠ বামারাই (মূল অধিবাসীদের ’বামা’ বলা হয়) প্রায় সব কিছুর মালিক। তাদের দয়ার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হয় অন্য জাতি-গোষ্ঠীর লোকদের। অত্যাচার-নির্যাতনের কারণে জন্ম হয়েছে বহু বিদ্রোহী গোষ্ঠীর।
বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে পাঁচগুণ বড় ৬৭৬,৫৭৮ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত ৫৩ মিলিয়ন জনসংখ্যার এই দেশটির পাহাড়-বনাঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অগণিত সংখ্যালঘিষ্ঠ গোত্রগুলোর মতো রাখাইন রাজ্যটি সে সময থেকেই শাসকগোষ্ঠীর পদদলিত। কোন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা রাখাইনবাসীদের দেয়া হতো না; এখনও দেয়া হয় না। অচ্ছ্যুত হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাদের। তুলনা করা হয় ‘সাপ ও কুকুর’-এর সাথে। নাগরিকত্বও কেড়ে নেওয়া হয় এক সময়। শৃঙ্খল পরিয়ে দেওয়া হয় চলাফেরায়। সরকার আর সংসদে সেনাবাহিনীর অপ্রতিরোধ্য দাপটের কারণে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না। প্রশান্তিময় সাগরের কোল ঘেঁষে বনবনানিতে ছেয়ে থাকা পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘাবৃত আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মনোরম পাহাড়গুলোর মোহনীয়তা কখনও মিয়ানমারের বর্বর শাসকগোষ্ঠীকে ন¤্র-বিনয়ী করতে পারেনি। সামন্তবাদ সর্বত্র। সারা দেশেই নির্যাতিত মানুষের নীরব আর্তনাদ আর গোপন অশ্রুজল মরুর বুকে লুকিয়ে থাকা চলমান ফল্গুধারার মতো চির বহমান। দেখার কেউ নেই। মহান বুদ্ধের অনুসারীরা আজও সেখানে মূর্তিমান আতঙ্ক। সংখ্যালঘুরা শুধুই পিঁপড়াতুল্য। রাখাইনের রোহিঙ্গা মুসলমানেরাও তা-ই। পদতলে লুণ্ঠিত তাদের মান-আব্রু, জীবন, ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি সব কিছু।
লেখক : কলামিস্ট ও শিক্ষাবিদ; উপাচার্য, বাংলাদেশ উ›মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
সম্পাদনা: আশিক রহমান

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ