প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কোন পথে বাংলাদেশ?

লীনা পারভীন : আমাদের দেশে নির্বাচন মানে উৎসব। স্থানীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে যে কোনও নির্বাচনে একটি উৎসব আমেজ থাকে। তবে জাতীয় নির্বাচনে সে আমেজ রূপ নেয় সার্বজনীনে। চারদিকে কেবল রাজনৈতিক আলোচনার ঝড় বয়ে যায়। পাড়ার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে শহুরে অফিস আদালত সব জায়গাতেই চলে একই আলোচনা। কোন দলের কে প্রার্থী হবে, কে গঠন করবে সরকার। প্রার্থীদের জনসংযোগ শুরু হয়ে যায় নির্বাচনের ২/১ বছর আগে থেকেই। সাংবিধানিক নিয়ম অনুসারে প্রতি ৫ বছর পরপর আমাদের দেশে সংসদ নির্বাচন হয়ে থাকে। ২০১৭ সাল প্রায় শেষ পর্যায়ে। নির্বাচনের আর মাত্র ১ বছরের কিছু বেশি সময় বাকি আছে। শুরু হয়ে গেছে আলোচনা। দলীয় দেন-দরবার। কে কতটা জনপ্রিয় বা ক্ষমতাশালী তার উদাহরণ তৈরির জন্য শুরু হয়েছে প্রতিযোগিতা।
নির্বাচন হবে। নিয়ম অনুযায়ী ক্ষমতার পালাবদল হবে। যে দল সর্বাধিক আসনে জয় লাভ করবে সে দলই সরকারে আসবে। শাসন ক্ষমতায় বসবে সামনের ৫ বছরের জন্য। এটা স্বাভাবিক নিয়মেই হয়ে থাকে।

কিন্তু আমাদের দেশে নির্বাচন কি আর সেই সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের পরিক্রমায় আছে এখন? বিশেষ করে গত দুই টার্মের ইলেকশনের পর নাগরিক হিসাবে আমাদের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুবিধার নয়। দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে চালু রাখতে হলে নির্বাচনে অবশ্যই সর্বদলীয় অংশগ্রহণেই হতে হবে। এর কোনও বিকল্প নেই। একনায়কতন্ত্রের জন্যতো আর নির্বাচনের দরকার হয় না।

হিসাবটা এখন খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। একটা বিষয় আজকের এই বাংলাদেশ অস্বীকার করার উপায় নেই যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির ক্ষমতায় আসার কোনও সুযোগ নেই। যে দলই এই পরিবর্তিত বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসতে চাক না কেন তাদেরকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতার ধারক ও বাহক। এটুকু একদম পরিষ্কার। তাহলে সে হিসাবে বিএনপির অবস্থান এখন কোথায় আছে? তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই প্রমাণ করে দেয় তারা কোন পন্থীদের হয়ে কাজ করছে। অন্তত জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধে কেউ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বলে দাবি করতে পারবে না। বিএনপির একটি সামাজিক ভিত্তি আছে এ কথা অস্বীকার করার কোনও উপায় নাই। কিন্তু তারা কি তাদের সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিকভাবেই ক্ষমতায় আসার পথে আছে?

অন্তত গত কয়েকবছরে তাদের যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে তাদের যে টালবাহানার অবস্থান তাদের সুস্থ স্বাভাবিক রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করে না। তারা একের পর এক ষড়যন্ত্রের রাজনীতিকেই প্রশ্রয় ও আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। জামায়াতমুক্ত হওয়ার কোনও সম্ভাবনা এখনও পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। শেখ হাসিনাকে অস্বীকার করে এই মুহূর্তের বাংলাদেশকে কেউ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারার মতো জায়গায় আসেনি। বিএনপির দলীয় দুর্নীতি, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান মামলা এসবকিছু বিএনপির জন্য খুব সুখকর কিছু নয়। আছে তারেক জিয়ার সীমাহীন অর্থপাচার, হত্যা, ষড়যন্ত্রের রাজনৈতিক ইতিহাস।

এই হলো বিএনপির অবস্থা। অন্যদিকে, এই মুহূর্তে যে দলটি ক্ষমতায় আছে সে দলটিও কি সঠিক পথেই এগুচ্ছে? আওয়ামী লীগ সরকার গত প্রায় ৯ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দলটি বাংলাদেশের মুক্ত চিন্তার, প্রগতিবাদী ধারাটির একমাত্র বিকল্প বলেই ধরা হচ্ছে বর্তমানে। আমি একমাত্র বলছি ক্ষমতার হিসাবে। অন্যকোনও দলের এই মুহূর্তে ক্ষমতায় আসার কোনও সম্ভাবনা তৈরি হয়নি। খুব সত্যি বলতে গেলে এই মুহূর্তের জনগণের আস্থার নাম একটাই আর সেটা হচ্ছে– শেখ হাসিনা। কিন্তু দল হিসাবে আওয়ামী লীগ? কোথায় আছে? আওয়ামী লীগের দলীয় লোকজন কি এ নিয়ে চিন্তা করে? উন্নয়নের রাজনীতির স্লোগান দিয়ে যে দলটি ক্ষমতায় আছে সে দলটি কি আসলেই দলগতভাবে উন্নয়নের রাজনীতি করছে? সরকারে থাকা মন্ত্রী এমপিদের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ। দুর্নীতি, দলবাজির পাশাপাশি আছে অযোগ্যতার অভিযোগ। সারাদেশে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যতটা সাংগঠনিকভাবে কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগুনো দরকার সেখানে এখনও পর্যন্ত তেমন কিছু চোখে পড়ছে না। এবারেই ক্ষমতায় থাকার শেষ সুযোগ তাই সময় শেষ হওয়ার আগেই তুলে নিতে হবে এর পুরো ফায়দা– ঠিক তেমনটাই মনে হচ্ছে প্রতিটি মন্ত্রী এমপি থেকে তৃণমূলে ক্ষমতায় থাকা নেতাদের কর্মকাণ্ডে।

দেশের কোনও কিছুই নেই নিয়ন্ত্রণে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারমূল্য আকাশ্চুম্বী কিন্তু মন্ত্রীর গলায় স্বাভাবিকতার সুর। পরিবহন সেক্টরে সীমাহীন অস্থিরতা। রাস্তাঘাটে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার নেই কোনও সুযোগ। জ্যামে বসে নাগরিকের জীবন নাকাল। এগুলো এখন স্বাভাবিক চিত্র।

প্রশাসনিক কাঠামোগুলোও কি খুব একটা সুস্থভাবে চলছে? সম্প্রতি প্রধান বিচারপতির এক রায়কে কেন্দ্র করে বিচারবিভাগের সঙ্গে আইন বিভাগের যে ‘বৈরি আবহাওয়া’ দেশের মানুষ দেখেছে তার প্রভাব কি খুব সামান্য? বুঝলাম, প্রধান বিচারপতি পদত্যাগ করেছেন কিন্তু তারপর? এখন কে আসবেন সে জায়গায়? যিনি আসবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে তার ইতিহাস কি সরকার জানে? তাছাড়া সরকার চালাতে গেলে বিচারবিভাগের আস্থাকে ধরে রাখাটা অত্যন্ত জরুরি। সরকার সে জায়গাটিকে খুব একটা বুদ্ধিমত্তার এবং কৌশলের সঙ্গে ফয়সালা করতে পারেনি বলেই মনে হচ্ছে এবং এটিও একটি বড় অস্বস্তির জায়গা সামনের দিনে।

রোহিঙ্গা ইস্যু যেন আমাদের জন্য এক বিরাট অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। নির্বাচনের ঠিক আগে আগেই এমন একটি সমস্যা আমাদের সরকার প্রধান যত ভালোভাবেই সামাল দিক না কেন এদেরকে কেন্দ্র করে যে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা শুরু হবে–সেগুলো কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা কতটা আছে? রোহিঙ্গা এখন সরকারের বিরোধী পক্ষের জন্য এক বিরাট রাজনৈতিক ইস্যু যদিও খুব একটা সুবিধা করতে পারবে বলে মনে হয় না। কিন্তু এর ধাক্কা এসে লাগছে আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার ওপর।

নাগরিক জীবনের এত সংকটের মাঝে আজকে আমরা উদ্বিগ্ন নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে। সাম্প্রতিক সময় বেশ কয়েকটি ঘটনা শিক্ষিত নাগরিকের মাঝে নিয়ে এসেছে বিরাট প্রশ্ন। এতদিন রাজনৈতিক নেতাদের হারিয়ে যাওয়া দেখলেও এখন সাংবাদিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রেণি পেশার মানুষজনও কোনও প্রকার ক্লু ছাড়াই হারিয়ে যাচ্ছে হুটহাট করে। তাদের খুঁজে বের করতে আপাত ব্যর্থ আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তাকে সরাসরি আইনের আওতায় এসে বিচার করতে হবে। অপরাধীকে আইনি সাহায্য দিতে হবে। এটাই একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাছে আমাদের চাওয়া।

সারা দেশব্যাপী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কয়দিন পরপরই নেমে আসে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস। ধর্মের নামে এসব হামলার একটারও কোনও সুরাহা পাই না আমরা। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি আমাদের সামনের দিনের সুস্থ বাংলাদেশের জন্য বিপদজনক। গুরুত্বপূর্ণ এই জায়গাটিতেও মনে হচ্ছে আমাদের সরকারের কর্তাব্যক্তিরা প্রচণ্ডভাবেই উদাসীন।

দিনে-দিনে দেশের মানুষের মাঝে যে উৎকণ্ঠার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে সেটা অবশ্যই কোনও সরকারের জন্যই সুখকর খবর নয়। সামনের নির্বাচনে তাই হিসাবটা খুব শক্ত হবে। আসলে শেখ হাসিনার মতো নেতাই আমাদের দরকার। এমন নেতৃত্বই পারে বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু তার আগে দেশের মানুষের মাঝে ফিরিয়ে আনতে হবে সেই আস্থা ও বিশ্বাসকে। সেখানে আমাদের সরকার কতটা প্রস্তুত?

লেখা: সাবেক ছাত্রনেতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ