ট্রেন ভ্রমণ অনেকে পছন্দ করেন। কিন্তু সময়মতো ট্রেন চলাচল না করায় অনেকে ভোগান্তিতে পড়েন। এই ভোগান্তির কথা ভেবেই বিডি ট্রেন ট্র্যাকিং (BD Train Tracking) নামে একটি অ্যাপ উদ্ভাবন করেছেন মো. আল আমিন নামের এক তরুণ।
কাঙ্ক্ষিত ট্রেন এখন কোথায় আছে, কখন স্টেশনে আসবে, কত গতিতে এগোচ্ছে কিংবা গন্তব্যে পৌঁছাতে কত সময় লাগতে পারে—এসব জানতে যাত্রীদের এখন আর শুধু স্টেশনের ডিজিটাল বোর্ড বা রেলওয়ের এসএমএসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। স্মার্টফোনে BD Train Tracking অ্যাপ ব্যবহার করেই ট্রেনের অবস্থান, যাত্রার অগ্রগতি ও সময়সূচিসহ বিভিন্ন তথ্য জানা সম্ভব।
অ্যাপটির বিশেষ আকর্ষণ হলো থ্রিডি (3D) ম্যাপ ভিউ। এই সুবিধায় মানচিত্রের ওপর ট্রেনের অবস্থান দেখা যায়। প্রয়োজনে ম্যাপ জুম ইন, জুম আউট ও প্যান করে আশপাশের রেলপথ এবং অন্যান্য ট্রেনের অবস্থানও পর্যবেক্ষণ করা যায়। ফলে ট্রেনের চলাচল সম্পর্কে সাধারণ মানচিত্রের তুলনায় আরও দৃশ্যমান ধারণা পাওয়া যায়।
যারা ট্রেনে ভ্রমণ করছেন, কাউকে স্টেশন থেকে নিতে যাবেন কিংবা স্টেশনে অপেক্ষা করছেন, তাদের জন্য অ্যাপটি বেশ কাজে আসতে পারে। তবে এর লাইভ লোকেশন ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অ্যাপটির পরিকল্পনা, নকশা ও নির্মাণের কাজ করেছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবং গতিশীল ভেঞ্চারসের প্রতিষ্ঠাতা আল আমিন।
অ্যাপটি তৈরির পেছনের কারণ হিসেবে আল আমিন নিজের ট্রেনভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। ট্রেনের দেরি হলে স্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা অনেক সময় জানতেই পারেন না ট্রেনটি কোথায় আছে বা কখন পৌঁছাবে। এই অনিশ্চয়তা কমাতে ট্রেনে থাকা যাত্রীরাই যদি নিজেদের অবস্থান অন্যদের সঙ্গে ভাগাভাগি করেন, তাহলে অপেক্ষমাণ ব্যক্তিরা সে অনুযায়ী সময় পরিকল্পনা করতে পারবেন—এমন ভাবনা থেকেই অ্যাপটির যাত্রা শুরু।
এটি মূলত যাত্রীদের অংশগ্রহণে পরিচালিত একটি কমিউনিটি-ভিত্তিক ট্রেন ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম। অ্যাপটির ব্যবহারকারী পাঁচ লাখের বেশি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ হাজার চ্যাট বার্তা আদান-প্রদান হয়। অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোন—দুই প্ল্যাটফর্মেই অ্যাপটি পাওয়া যাচ্ছে। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় ব্যবহার করা যায়। এরই মধ্যে ১০ হাজার ১০০-এর বেশি মানুষ গুগল প্লে স্টোরে অ্যাপটির ব্যাপারে রিভিউ দিয়েছেন। অ্যাপটির রেটিং পয়েন্ট ৪ দশমিক ৮।
থ্রিডি ম্যাপে ট্রেনের অবস্থান দেখবেন যেভাবে
প্রথমে গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপলের অ্যাপ স্টোরে BD Train Tracking অ্যাপ লিখে সার্চ দিয়ে তা বের করুন এবং ইনস্টল করে চালু করুন।
আপনি অ্যাপটি গুগল দিয়ে চালাবেন নাকি অতিথি হিসেবে ব্যবহার করবেন তা নির্বাচন করুন। অতিথি হিসেবে চালালে সব সুবিধা ব্যবহার করতে পারলেও কিছু সুবিধা পাবেন না। তাই গুগল দিয়ে অ্যাপটি ব্যবহার করতে পারেন।
সাম্প্রতিক আপডেটে থ্রিডি ভিউয়ের ফ্লাই-ইন অ্যানিমেশন যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি ম্যাপ জুম বা প্যান করার সময় অন্যান্য ট্রেনের অবস্থানও দৃশ্যমান রাখার সুবিধা যোগ করা হয়েছে। ফলে একটি ট্রেনের অবস্থান দেখার পাশাপাশি আশপাশের রেলপথে অন্য ট্রেনের চলাচল সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়।
ট্রেনের লাইভ লোকেশন ও গতিবেগ জানবেন যেভাবে
শুধু থ্রিডি ম্যাপ নয়, অ্যাপটির মাধ্যমে চলন্ত ট্রেনের অবস্থান, গতিবেগ, পরবর্তী স্টেশন এবং নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কতটা দেরি হচ্ছে, সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়।
সেখানে ট্রেনের সর্বশেষ পাওয়া অবস্থান, গতিবেগ, পরবর্তী স্টেশন এবং আনুমানিক পৌঁছানোর সময় দেখতে পারবেন। সেই সঙ্গে মোট যাত্রাপথের কত শতাংশ অতিক্রম করেছে এবং কতটুকু পথ বাকি রয়েছে, তা জানা যাবে।
অ্যাপটির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ আন্তনগর ও গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনের তথ্য পাওয়া যায়। তবে কিছু লোকাল ট্রেনের তথ্য সম্পূর্ণ নাও থাকতে পারে।
নিজের অবস্থান শেয়ার করে অন্যদের সহায়তা করুন
বিডি ট্রেন ট্র্যাকিং অ্যাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো যাত্রীদের অংশগ্রহণে ট্রেনের অবস্থান শনাক্ত করা। অর্থাৎ, ট্রেনে থাকা কোনো যাত্রী নিজের অবস্থান শেয়ার করলে অন্য ব্যবহারকারীরা সেই তথ্যের ভিত্তিতে ট্রেনের অবস্থান জানতে পারেন। এ জন্য রয়েছে ‘আমি এই ট্রেনে আছি’ বা ‘I'm Inside Train’ সুবিধা।
‘আমি এই ট্রেনে আছি’ বা লোকেশন শেয়ারের অপশন নির্বাচন করুন। আপনি ওই ট্রেনে না থাকলে তা শেয়ার করবেন না। নইলে অন্যরা ভুল অবস্থান দেখবে। ভুল শেয়ারে আপনার রিওয়ার্ড পয়েন্ট বাতিল এমনকি বারবার ভুল হলে আপনার অ্যাকাউন্ট ব্লক হতে পারে।
তাই আপনি ওই ট্রেনে থাকলে প্রয়োজনীয় লোকেশন পারমিশন দিয়ে শেয়ারিং চালু করুন।
যাত্রার সময় জিপিএস ও ইন্টারনেট সংযোগ সচল রাখুন।
অ্যাপটির গোপনীয়তা নীতি অনুযায়ী, লোকেশন শেয়ারিং চালু থাকলে কয়েক সেকেন্ড পরপর অবস্থান, গতিবেগ ও লোকেশনের নির্ভুলতাসংক্রান্ত তথ্য সার্ভারে পাঠানো হয়। ব্যবহারকারী চাইলে যেকোনো সময় লোকেশন শেয়ারিং বন্ধ করতে পারেন। অন্য ব্যবহারকারীরা ব্যক্তির পরিচয় বা ব্যক্তিগত অবস্থান নয়, ট্রেনের অবস্থান দেখতে পান।
স্টেশনে আসন্ন ট্রেনের তথ্য পাবেন
কোনো স্টেশনে অপেক্ষা করার সময় পরবর্তী কোন ট্রেন আসছে, সেটি জানারও ব্যবস্থা রয়েছে অ্যাপটিতে।
যেভাবে দেখবেন—
কোনো ট্রেনের যাত্রার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোন কোন স্টেশনে থামার কথা এবং প্রতিটি স্টেশনে সম্ভাব্য পৌঁছানোর সময় জানতে পারবেন অ্যাপটির সময়সূচি সুবিধা থেকে।
যাত্রীদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ট্রেন চ্যাট
অ্যাপটির আরেকটি আকর্ষণীয় ফিচার হলো ট্রেন চ্যাট। একই ট্রেনে থাকা যাত্রী কিংবা স্টেশনে অপেক্ষমাণ ব্যক্তিরা এর মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারেন। যেমন: ট্রেন কতক্ষণ দেরিতে চলছে? ট্রেনটি সর্বশেষ কোন স্টেশনে পৌঁছেছে? প্ল্যাটফর্ম পরিবর্তন হয়েছে কি না? কোন বগিতে ভিড় তুলনামূলক কম? ট্রেন কোথাও আটকে আছে কি না? ইত্যাদি।
এ ছাড়া যাত্রীরা পরস্পরের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন। অ্যাপটির নির্মাতার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ হাজার চ্যাট বার্তা আদান-প্রদান হয়। আপত্তিকর বার্তা রিপোর্ট ও ব্যবহারকারীকে ব্লক করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
অন্যান্য সুবিধা
ট্রেনযাত্রীদের প্রয়োজন বিবেচনায় অ্যাপটিতে আরও কিছু সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।
হারানো বা পাওয়া: ট্রেনে বা স্টেশনে কোনো জিনিস হারিয়ে গেলে কিংবা কুড়িয়ে পেলে অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য জানানো যায়। এতে হারানো জিনিসের মালিকের কাছে সেটি ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
পুরস্কার: নিজের অবস্থান শেয়ার করে অন্য যাত্রীদের সহায়তা করলে পয়েন্ট পাওয়া যায়। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে এসব পয়েন্টের মাধ্যমে পুরস্কার বা প্রিমিয়াম সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বগির অবস্থান: এই অপশনে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কোন বগি কোথায় থামবে, সে সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যাবে। এই ফিচারটি এখনও উন্নয়নাধীন।
স্টেশন অবস্থা: এই অপশনে বিভিন্ন রেল স্টেশনে কী কী সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, যাত্রীরা নিজেরাও সে সম্পর্কে তথ্য দিতে পারেন।
রেল নিরাপত্তা: ট্রেনে, প্ল্যাটফর্মে ও রেললাইনের পাশে নিরাপদ থাকার বিভিন্ন পরামর্শ রয়েছে এই অপশনে।
ট্রেনসংক্রান্ত খবর, ভ্রমণ টিপস ও অভিজ্ঞতা পড়ার জন্য রয়েছে ট্রেন ব্লগ অপশন। কোনো সমস্যা বা পরামর্শ থাকলে ‘অভিযোগ’ অপশনে জানানো যায়।
বিনামূল্যে নাকি প্রিমিয়াম?
বিডি ট্রেন ট্র্যাকিং অ্যাপটি অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোনে বিনামূল্যে ইনস্টল করা যায়। তবে অ্যাপটিতে বিজ্ঞাপন রয়েছে এবং কিছু সুবিধার জন্য প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন নেওয়ার ব্যবস্থা আছে।
প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশনে লাইভ লোকেশন শেয়ার, বিজ্ঞাপনমুক্ত ব্যবহার, প্রিমিয়াম নোটিফিকেশন ও অগ্রাধিকারভিত্তিক সহায়তার কথা উল্লেখ রয়েছে।
অ্যাপটির সীমাবদ্ধতা ও সতর্কতা
অ্যাপটিতে বেশ কিছু সুবিধা থাকলেও ব্যবহারের আগে কয়েকটি বিষয় জানা জরুরি।
প্রথমত, এটি বাংলাদেশ রেলওয়ের সরকারি অ্যাপ নয়। গতিশীল ভেঞ্চারসের তৈরি একটি স্বতন্ত্র প্ল্যাটফর্ম। প্রতিষ্ঠানটির গোপনীয়তা নীতিতেও বলা হয়েছে, অ্যাপটি বাংলাদেশ রেলওয়ে বা সরকারের সঙ্গে পরিচালনাগতভাবে সম্পৃক্ত নয়।
দ্বিতীয়ত, লাইভ লোকেশন যাত্রীদের অংশগ্রহণের ওপর নির্ভরশীল। ট্রেনে থাকা কোনো যাত্রী অবস্থান শেয়ার না করলে প্রকৃত সময়ের ট্র্যাকিং পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই অ্যাপে দেখানো অবস্থান সব সময় শতভাগ নির্ভুল নাও হতে পারে।
তৃতীয়ত, ইন্টারনেট ও জিপিএস প্রয়োজন। নেটওয়ার্ক দুর্বল হলে কিংবা লোকেশন পারমিশন বন্ধ থাকলে তথ্য হালনাগাদে সমস্যা হতে পারে।
চতুর্থত, ব্যক্তিগত তথ্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাপটির গোপনীয়তা নীতিতে লোকেশন, বিজ্ঞাপন, অ্যাপ ব্যবহারের তথ্যসহ বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ট্রেনের অবস্থান দেখানোর জন্য নেওয়া সুনির্দিষ্ট লোকেশন বিজ্ঞাপনে ব্যবহার বা তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করা হয় না। ব্যবহারকারীর নিজের লোকেশন শেয়ারিং চালু বা বন্ধ করার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
ট্রেনের অবস্থান জানতে স্টেশনে ফোন করা, পরিচিত কারও মাধ্যমে খবর নেওয়া কিংবা বারবার এসএমএসের অপেক্ষায় থাকার বদলে বিডি ট্রেন ট্র্যাকিং একটি বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করেছে। বিশেষ করে থ্রিডি ম্যাপ, লাইভ লোকেশন, গতিবেগ, সম্ভাব্য পৌঁছানোর সময়, স্টেশনভিত্তিক তথ্য এবং যাত্রীদের মধ্যে যোগাযোগের সুবিধা অ্যাপটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
অ্যাপটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো যাত্রীদের পারস্পরিক সহযোগিতা। একজন যাত্রী নিজের অবস্থান শেয়ার করলে সেই তথ্যের মাধ্যমে অন্য অনেক যাত্রী উপকৃত হতে পারেন। তবে অ্যাপের তথ্যকে বাংলাদেশ রেলওয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা শতভাগ নির্ভুল অবস্থান হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে রেলওয়ের সরকারি তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়াই ভালো।
সূত্র : জাগো নিউস ২৪