মানবদেহের এক রহস্যময় সম্পদ হলো রক্ত। আর এর মধ্যে সবচেয়ে বিরল হলো ‘আরএইচ নাল’ (Rh-null) নামে পরিচিত এক বিশেষ রক্তের ধরন, যা পৃথিবীতে মাত্র ৫০ জনের শরীরে দেখা যায়। বিরলতা এতটাই যে চিকিৎসকরা একে ‘গোল্ডেন ব্লাড’ বা ‘সোনার রক্ত’ হিসেবে ডাকে।
প্রতি ৬০ লাখ মানুষের মধ্যে মাত্র একজনের শরীরে এই রক্ত থাকে। বিশেষত্ব হলো—এই রক্তে আরএইচ পরিবারের ৫০টি অ্যান্টিজেনের কোনোটি নেই। ফলে ‘আরএইচ নাল’ রক্তকে সার্বজনীন রক্ত হিসাবে ব্যবহার করা সম্ভব, অর্থাৎ প্রায় সব মানুষকে দেওয়া যাবে।
ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেল বায়োলজির অধ্যাপক অ্যাশ টোয়ে বলেন, “আরএইচ অ্যান্টিজেন শরীরে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিন্তু যার রক্তে এগুলো নেই, তার রক্ত সবার জন্য নিরাপদ। বিশেষ করে জরুরি মুহূর্তে, যখন রোগীর রক্তের গ্রুপ জানা না থাকে, তখন এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।”
কৃত্রিমভাবে ‘সোনার রক্ত’ তৈরির চেষ্টা
জিনগত পরিবর্তনের কারণে এই বিরল রক্ত মানুষের শরীরে তৈরি হয়। অধ্যাপক টোয়ে এবং তার দল ২০১৮ সালে ল্যাবে ‘ক্রিসপার’ জিন এডিটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই রক্ত কৃত্রিমভাবে তৈরি করতে সক্ষম হন। তারা অপরিণত লোহিত রক্তকণিকায় পাঁচটি প্রধান রক্ত গ্রুপের জন্য দায়ী জিন সরিয়ে ‘আল্ট্রা-কম্পিটিবল’ রক্ত তৈরি করেন, যা প্রায় সবার শরীরেই মানিয়ে যায়।
অধ্যাপক টোয়ে স্কারলেট থেরাপিউটিকস নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এখানে বিরল রক্তের দাতা থেকে রক্ত সংগ্রহ করে ল্যাবে নতুন রক্তকণিকা তৈরি করা হচ্ছে, যা জরুরি মুহূর্তে ব্যবহার করা যাবে। আমেরিকা, কানাডা এবং স্পেনের বিজ্ঞানীরাও স্টেম সেল ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে এই বিরল রক্ত তৈরির চেষ্টা করছেন।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা
যদিও কৃত্রিম রক্ত তৈরি সম্ভব, জিন এডিটিং নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক ও কঠোর নিয়মকানুন থাকায় এটি সাধারণ রোগীর জন্য সহজলভ্য হতে আরও অনেক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন।
অধ্যাপক টোয়ে বলেন, “এখনও মানুষের শরীর থেকে রক্ত নেওয়াই সবচেয়ে সহজ ও সস্তা উপায়। তবে যাদের রক্তের গ্রুপ বিরল এবং দাতা পাওয়া যায় না, তাদের জন্য ল্যাবে রক্ত তৈরি করা গেলে সেটি হবে এক বিরাট সাফল্য।”
‘সোনার রক্ত’ শুধু বিরল নয়, এটি ভবিষ্যতে অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।
সূত্র: জনকণ্ঠ