মহসিন কবির: উইকিপিডিয়া-যা নিজেকে ‘মুক্ত ও নিরপেক্ষ বিশ্বকোষ’ হিসেবে পরিচয় দেয়, সে প্ল্যাটফর্মেই আজ ইতিহাস বিকৃতি, সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ও রাজনৈতিক প্রচারের ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের ফলে বাংলা উইকিপিডিয়ায় মুসলিমবিদ্বেষী বয়ান, মিথ্যা তথ্য ও একপেশে ইতিহাস চাপিয়ে দেওয়ার একটি সংগঠিত তৎপরতা দৃশ্যমান হয়েছে বলে অভিযোগ করছেন একাধিক অভিজ্ঞ লেখক ও ব্যবহারকারী।
নোয়াখালী দাঙ্গা, কলকাতা দাঙ্গা, চুকনগর গণহত্যা কিংবা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো ঐতিহাসিক বিষয়গুলোতে উইকিপিডিয়ার লেখা পড়লে মনে হতে পারে যে, পৃথিবীর ২২০ কোটি মুসলমানের একমাত্র কাজ ছিল হিন্দু নিধন! এগুলো কেবল কয়েকটি উদাহরণ। বাস্তবে উইকিপিডিয়ার অসংখ্য নিবন্ধজুড়েই ছড়িয়ে আছে পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক মিথ্যাচার। এমন অসংখ্য মিথ্যা সাম্প্রদায়িক বয়ানে ছেয়ে আছে ‘উইকিপিডিয়া’ নামক তথাকথিত মুক্ত বিশ্বকোষ। শুধু এ লেখাগুলোই নয়; বরং ভারত, বাংলাদেশ বা পাকিস্তান যেখানেই হিন্দু-মুসলিমের বিষয় এসেছে, সেখানেই মুসলিমদের ভিলেন ও হিন্দুদের ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপনের একটি অপচেষ্টা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
ভারত ভাগের আগে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা। অধিকাংশ ঐতিহাসিকই একমত যে, এর প্রধান কারণ ছিল ব্রিটিশদের বিভাজনের রাজনীতি। পাশাপাশি কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সংকীর্ণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও সহিংসতা উসকে দেয়। সাধারণ হিন্দু ও মুসলমানরা এই রাজনীতিরই শিকার হয়েছিল।
কিন্তু ২০১৪ সালে ভারতে হিন্দু উগ্রবাদীরা ক্ষমতায় আসার পর ইতিহাস বদলানোর এক নগ্ন রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়। ভারতের পাঠ্যবইয়ের মতোই উইকিপিডিয়াতেও মুসলিমদের ভিলেন এবং হিন্দুদের একমাত্র ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা লক্ষণীয় হয়ে ওঠে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৪ সালের পর পরিকল্পিতভাবে উইকিপিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা শুরু করে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী। কয়েক বছরের মধ্যেই তারা প্রভাব বিস্তারে সফল হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, এসব ঘৃণামূলক বয়ানের বিরোধিতা করলেই লেখকদের অ্যাকাউন্ট ব্লক বা সাসপেন্ড করা হচ্ছে। ফলে নিরপেক্ষ লেখকরা ভয়ে সত্য তথ্য সংশোধনের সাহস পান না।
যারা উইকিপিডিয়ায় নিয়মিত লেখালেখি করেন-এমন বেশ কজন লেখকের সঙ্গে কথা বলে আমার দেশ নিশ্চিত হয়েছে, সাম্প্রদায়িক ও ঘৃণাসূচক এসব লেখালেখিতে হাত দিলেই অ্যাকাউন্ট ব্লক করা হয়। ফলে তারা বাধ্য হয়ে সামগ্রিকভাবে মুসলিমদের অপরাধী সাব্যস্ত করা এবং ইসলাম ধর্মকে বিকৃত করা এসব লেখা এড়িয়ে চলেন।
নোয়াখালী দাঙ্গাবিষয়ক নিবন্ধটি এই ঘৃণা চাষের অন্যতম উদাহরণ। ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত তথ্যে বলা হয়, ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় মোট ২৮৫ জন নিহত হয়েছিলেন—যাদের মধ্যে প্রায় ২০০ জন ছিলেন হিন্দু। ২০১৪ সালে হিন্দুত্ববাদীরা ভারতে ক্ষমতাসীন হলে ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত এসব বিষয়কে আবারও নানা বয়ানে হাজির করতে শুরু করে। আর তাদের সেসব ঘৃণাসূচক বক্তব্য উইকিপিডিয়ায় স্থান করে নিতে শুরু করে। সেখানে নিহত হিন্দুর সংখ্যা বাড়িয়ে কখনো ৫০০, কখনো পাঁচ হাজার, এমনকি ৫০ হাজার পর্যন্ত দেখানো হয়েছে।
অথচ নোয়াখালীর যে অঞ্চলে এই সহিংসতা হয়েছিল, সে অঞ্চলে তখন মোট জনসংখ্যাও ৫০ হাজার ছিল না। সেখানে শুধু সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ৫০ হাজার মানুষ হত্যার মতো মিথ্যাচার বছরের পর বছর উইকিপিডিয়ায় চালিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা সমাজে ভুল বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করেন উইকিপিডিয়ার একাধিক লেখক।
এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিবন্ধটিতে ৮২টি তথ্যসূত্র দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম ১০টি সূত্রের মধ্যে মাত্র একটি (৫নং) নির্ভরযোগ্য। বাকিগুলো হয় অস্তিত্ববিহীন, নয়তো রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট ও অতিরঞ্জিত। উইকিপিডিয়ার লেখক এসএম মামুন হোসেন বিষয়টি বিশ্লেষণ করে প্রশাসকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও তারা তাতে কর্ণপাত করেননি।
কলকাতা দাঙ্গায় নিহতের সংখ্যা নোয়াখালীর চেয়েও বেশিÑপ্রায় চার হাজার। যাদের বড় অংশ ছিলেন মুসলমান। কিন্তু উইকিপিডিয়ার নিবন্ধে সেই দায়ও মুসলমানদের ওপর চাপানো হয়েছে। মুসলমানরা সেদিন আলাদা রাষ্ট্রের দাবিতে ধর্মঘট ডেকেছিলÑএই যুক্তিতে তাদের হত্যা করা ঠিক ছিল আর এমনভাবেই তা প্রকাশ করা হয়েছে।
কলকাতা দাঙ্গারই একটি অংশে ‘নোয়াখালী দাঙ্গা’ নামের একটি অংশ তুলে ধরে মুসলমানদের হত্যাকে দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আরো অনেক জায়গার মতো এখানেও দাবি করা হয়েছে যে, নোয়াখালী দাঙ্গায় ৫০ হাজার হিন্দুকে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া নোয়াখালী দাঙ্গা এবং কলকাতা দাঙ্গা নামক লেখার কোথাও পাঁচ হাজার, কোথাও ১০ হাজার, কোথাও সব মুসলিম ওইদিন এক হয়ে হিন্দু মেয়েদের ধর্ষণ করেছে, জোর করে সব হিন্দুকে ধর্মান্তর করেছেÑএমন মনগড়া গল্পে জগাখিচুড়ি পাকানো হয়েছে।
কিন্তু হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে যায়-এমন এক লাইন লিখলেও সেই লেখককে ব্লক করে দেন উইকিপিডিয়ার বর্তমান প্রশাসকরা। এতে প্রমাণ হয় উইকিপিডিয়া বিশেষ করে বাংলা উইকিপিডিয়ার প্রশাসকরা অধিকাংশই ধর্ম ও রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট। এটি সম্পূর্ণভাবে উইকিপিডিয়ার নিয়মের পরিপন্থী বলেও মনে করেন লেখকরা।
চুকনগর গণহত্যা, যা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী দ্বারা সংঘটিত হয়েছিল; সেটিকেও সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়া হয়েছে। এসব হত্যার সময় তারা হিন্দু-মুসলিম বিবেচনা করেনি। যাদের পেয়েছে, তাদেরই হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু উইকিপিডিয়ায় এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন মুসলিমরা পরিকল্পিতভাবে পাকিস্তানিদের সহযোগিতা করে হিন্দুদের হত্যা করেছে—যা ঐতিহাসিকভাবে অসত্য।
মুসলমানরা যদি ব্যক্তি পর্যায়েরও কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধে যুক্ত হয় এবং তার দ্বারা কোনো হিন্দু যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন, তবে ঘটনা যেখানেই ঘটুক, বাংলা উইকিপিডিয়ার প্রশাসকরা তার মাধ্যমে ‘মুসলিমদের বর্বরতা’ তুলে ধরতে ভীষণ তৎপর হয়ে ওঠেন!
এর বিপরীতে হিন্দু সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের দ্বারা শত-সহস্র মুসলিম, কখনো আমিষ খাওয়ার অপরাধে, কখনো ‘জয় শ্রীরাম’ না বলায়, কখনো গরু বিক্রির অপরাধে, পিটিয়ে হত্যা, নারীদের সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, বাড়ি-মসজিদে আগুন, বুলডোজার দিয়ে সরকারি উদ্যোগে মুসলিমদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিলেও তা নিয়ে কোনো লেখা পাওয়া যাবে না। কেউ লেখার কোনোরকমের চেষ্টা করলে তাৎক্ষণিকভাবে তার অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড করা হয়।
একইভাবে কলকাতা দাঙ্গার সময় বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ‘কলকাতার কসাই’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ ব্রিটিশ সরকারি প্রতিবেদন ও নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি দাঙ্গা থামানোর চেষ্টা করেছিলেন, যদিও সফল হননি। কিন্তু হিন্দু উগ্রবাদী সংগঠন হিন্দু মহাসভা তাদের চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী এটির জন্য সোহরাওয়ার্দীকে দায়ী করে। যার একমাত্র কারণ ছিল সোহরাওয়ার্দী ছিলেন একজন মুসলমান। কিন্তু ভারতের অন্যান্য স্থানে যেখানে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল ছিল এবং মুসলিমরা হত্যার শিকার হয়েছিলেন, সেখানে সরাসরি সরকারপ্রধানকে এমন ন্যক্কারজনকভাবে আক্রমণের কোনো তথ্য চোখে পড়ে না।
১৯৪৬ সালের ২৪ আগস্ট পূর্ব কমান্ড (ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রশাসনিক অঞ্চল) থেকে দিল্লিতে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘১৬ আগস্ট সকালে (প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস) ১৯৪৬ তারিখে হিন্দুরা কালা সেতু, বেলগাছিয়া ব্রিজসহ বিভিন্ন স্থানে মুসলিমদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলা শুরু করলে মুসলিমরাও পাল্টা হিন্দুদের দোকানপাটে হামলা শুরু করে। এর জেরে ১৬ আগস্ট দুপুরের পর থেকে ১৭ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত ভয়ঙ্কর দাঙ্গা সংঘটিত হয়। যেখানে হিন্দুদের হাতে শত শত মুসলিম নিহত হন এবং মুসলিমদের হাতেও অসংখ্য হিন্দু নিহত হন।’
তৎকালীন ব্রিটিশ প্রতিবেদন বলছে, তখনকার বাংলার প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী শহরে ঘুরে ঘুরে দাঙ্গা থামানোর চেষ্টা করেছেন এবং পুলিশকেও এ কাজে মোতায়েন করেছেন। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। তবে দাঙ্গা থামাতে তার আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি ছিল না। তৎকালীন স্টেটসম্যান পত্রিকা কলকাতা দাঙ্গাকে পারস্পরিক প্রতিহিংসার ফল এবং কোনো একক ব্যক্তি এটির জন্য দায়ী নয় বলে স্বীকার করেছিল।
ঐতিহাসিক সুগত বোস তার ‘মডার্ন সাউথ এশিয়া : হিস্ট্রি, কালচার, পলিটিক্যাল ইকোনমি’ বইতে এ বিষয়ে দাবি করেন, ‘সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা ছিল বিভাজনের উত্তাপের মধ্যে ফেঁসে যাওয়া একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে, অপরাধী হিসেবে নয়।
তারপরও উগ্রপন্থি হিন্দু মহাসভা তাদের চিরাচরিত মুসলিমবিদ্বেষ অনুসারে সোহরাওয়ার্দীকে ‘কলকাতার কসাই’ সাব্যস্ত করে। উইকিপিডিয়াতেও হিন্দু মহাসভার ওই বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ও অন্য নিরপেক্ষ সূত্রের বক্তব্য এখানে লিখতে চেষ্টা করলেই পক্ষপাতদুষ্ট অ্যাডমিনরা তাদের থামিয়ে দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে উইকিপিডিয়া বাংলার নিয়মিত লেখক মামুন হোসেন বলেন, ‘যদি লক্ষ করেন, তাহলে দেখা যাবে ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক গোষ্ঠী মীমাংসিত ঐতিহাসিক বিষয়গুলোকে নিয়ে আবারও নতুন করে বিতর্ক তৈরি করছে। মিথ্যা তথ্যকে সামনে এনে তা সাধারণ মানুষকে জোর করে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করছে।
এর প্রভাব তাদের পাঠ্যবই বা ইতিহাস বইতেই তারা সীমাবদ্ধ রাখছে না। বরং এটাকে উইকিপিডিয়াসহ বিভিন্ন অনলাইন, অফলাইন মিডিয়ার মাধ্যমে তারা বিশ্বজনমত বদলে দেওয়া চেষ্টা করছে। উইকিপিডিয়ায় এখন মুসলিমদের বিরুদ্ধে যেসব ধারাবাহিক মিথ্যা তথ্যের ছড়াছড়ি দেখতে পাচ্ছেন, তা সেই ষড়যন্ত্রেরই অংশ।’
মামুন হোসেন আরো বলেন, ‘এটা যে শুধু তারা ধর্মীয় বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে-বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। বিষয়টিকে তারা নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শের লড়াইয়েরও অংশ বানিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশে তাদের অনুগত হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ঘটনা এ দেশের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ঐতিহাসিক ঘটনা।
কিন্তু এটি ভারতের ‘প্রতিবেশীদের নতজানু করে রাখার নীতি’র বিরুদ্ধে গেছে। তাই জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ইতিহাস সৃষ্টি করা শহীদ, যোদ্ধা ও সংগঠনগুলোর ক্ষেত্রেও তারা একই পথ বেছে নিয়েছে। তাদের পেজ মুছে ফেলা বা বিতর্কিত করার চেষ্টাও লক্ষণীয়, যা স্পষ্টতই উইকিপিডিয়ার নীতির লঙ্ঘন। ফলে বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া এবং উইকিপিডিয়ার আন্তর্জাতিক প্রশাসকদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাদের এসব অপতৎপরতা বন্ধ করা।’
সাম্প্রতিক সময়ে জুলাই শহীদদের পক্ষে লেখালেখি এবং ধর্মকেন্দ্রিক মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে আপত্তি উত্থাপনের কারণে বেশ কিছু উইকিপিডিয়া অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড করার অভিযোগ উঠেছে উইকিপিডিয়ার অ্যাডমিন ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে। উইকিপিডিয়ার প্রশাসকদের যেহেতু কোনো সরাসরি যোগাযোগের ফোন নম্বর থাকে না, তাই ইমেইলের মাধ্যমে তার কাছে জানতে চাওয়া হয় কেন জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও নেতাদের পেজ মুছে ফেলা হচ্ছে এবং কেন উইকিপিডিয়াকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক মিথ্যাচার করা হচ্ছে। যারা এসব পেজ তৈরি করছেন বা মিথ্যা তথ্য সরানোর চেষ্টা করছেন, তাদের অ্যাকাউন্টই বা কেন সাসপেন্ড করা হচ্ছে? কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বরং ইমেইল পাঠানো বা আলাপ পাতায় প্রশ্ন করা থেকে বিরত রাখতে প্রশ্নকারীর অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড করা হয়।
এ ছাড়া অভিযোগের বিষয়ে জানতে আরো দুজন অ্যাডমিনকে ইমেইল করে আমার দেশ। কিন্তু এক মাস পার হতে চললেও তারা ইমেইলের প্রত্যুত্তর দেননি। ফলে এ বিষয়ে উইকিপিডিয়ার পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে অনলাইন বিশ্বকোষ হিসেবে খ্যাত উইকিপিডিয়া থেকে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক মুছে ফেলা হচ্ছে জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও নেতাদের পাতা। ‘নি৭’ ধারা (অগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের নীতিমালা) ব্যবহার করে পেশাদারভাবে লেখা ও তথ্যসূত্রযুক্ত পাতাগুলো মুছে ফেলার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে প্ল্যাটফর্মটির নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে।
চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরাম ও ফয়সাল আহমেদ শান্তের স্মরণে তৈরি পাতাগুলো যথাযথ তথ্যসূত্রসহ সম্পাদনা করা হলেও ‘নি৭’ ধারা বলে মুছে ফেলা হয়েছে। জুলাই শহীদ ইমতিয়াজ আহমেদ জাবিরের পাতাও একই পন্থায় অপসারণ করা হয়েছে।
জুলাই বিপ্লবের প্রায় সকল শহীদের পাতাই একইভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। কেবল আবু সাইদ ও মুগ্ধের পাতা এখনো টিকে আছে, যদিও সেগুলোও নিয়মিত মুছে ফেলার চেষ্টার মুখে।
পাতাগুলোর লেখক দীর্ঘ ৬ বছরের অভিজ্ঞতাসহ শতাধিক কনটেন্ট সম্পাদনাকারী। তিনি জানান, পাতাগুলোতে বাংলাদেশের ইতিহাস বদলে দেওয়া শহীদদের জীবনী সূত্রসহ উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রশাসকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া সত্ত্বেও কোনো জবাব মেলেনি। বরং পাতাগুলো দ্রুত অপসারণ করে লেখককে ‘বিরক্ত না করতে’ হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা দল, সংগঠন ও নেতাদের পাতাও একই রকম টার্গেটের শিকার- জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পাতা বিতর্ক তৈরি করে অপসারণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
সাদিক কায়েম, শরীফ ওসমান হাদি, আলী আহসান জুনায়েদ, রাকিবুল ইসলাম রাকিব, নাছির উদ্দিন নাছির, নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী, জাহিদুল ইসলাম, রাশেদ খান, আব্দুল হান্নান মাসুদসহ বহু নেতার পাতা একাধিকবার মুছে ফেলা হয়েছে ‘নি৭’ ধারার অজুহাতে। ইনকিলাব মঞ্চের শরীফ ওসমান হাদির পাতা তার শাহাদাতের পর ফিরিয়ে আনা হলেও আগে বারবার মুছে ফেলা হয়েছিল। ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের পাতা কমপক্ষে ১৩ বার মুছে ফেলার পর সম্প্রতি ফিরে এসেছে।
জুলাই বিপ্লবের অন্যতম সংগঠক ও ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, ১৫ বছর আওয়ামী লীগ যে কাজ করে গেছে, সেটা ব্যক্তিউদ্যোগে মোকাবিলা করা কঠিন। সরকারের দায়িত্ব ছিল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া। অন্তর্বর্তী সরকার যদি উদ্যোগ নেয়, তাহলে যেসব আইডি থেকে এই কাজ করা হয়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, উইকিপিডিয়া ব্যক্তিবিশেষের দ্বারা পরিচালিত, সরকার দ্বারা নয়। তাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো হবে উইকিপিডিয়া কমিউনিটির সঙ্গে কথা বলে একটি করণীয় নির্ধারণ করা। এ বিষয়ে করণীয় নিয়ে আমাদের উপদেষ্টাদের সঙ্গে কথা বলব।
২০১৪ সালের পর থেকে ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মতো উইকিপিডিয়াতেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালানো হয়। তখন থেকেই বাংলা উইকিপিডিয়ার প্রশাসকদের মধ্যে ভারতীয়, আওয়ামী লীগ-সমর্থক ও ইসলামবিদ্বেষী ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ ঘটে। তাদের কারণেই মাধ্যমটির নিরপেক্ষতা নিয়ে ক্রমাগত প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে।