সমকাল প্রতিবেদন: প্লটের দাম সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাচ্ছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। পূর্বাচলে যে প্লটের কাঠাপ্রতি দাম ছিল দুই লাখ, সেটা এখন নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। আবার উত্তরায় যে প্লটের কাঠাপ্রতি দর ছিল ছয় লাখ, সেটা করা হয়েছে ৭৫ লাখ টাকা।
রাজউকের অধীন সব আবাসিক, বাণিজ্যিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্প প্রকল্পের প্লটের দামেও বড় উল্লম্ফন ঘটিয়েছে সেবা সংস্থাটি। গত ২১ জানুয়ারি রাজউকের বোর্ড সভায় এসব দাম প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। এখন বিষয়টি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সম্মতির জন্য পাঠানো হয়েছে।
যদি এই দাম কার্যকর হয়, তা হলে নতুন করে কোনো প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলে নতুন দামেই গ্রাহককে নিতে হবে। বেচাবিক্রির সময়ও এই দামের ওপর রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হবে। ২০০৭ সালে সর্বশেষ প্লটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল।
নগর পরিকল্পনাবিদরা প্রশ্ন তুলেছেন, রাজউকের কাজ প্লটের ব্যবসা করা– নাকি পরিকল্পিত নগরী উপহার দেওয়া। রাজউককে বরাবরই পরিকল্পিত নগর উপহার দেওয়ার চেয়ে আবাসন প্রকল্প নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী দেখা গেছে। মূল কাজ বাদ দিয়ে আবাসন ব্যবসায়ীর ভূমিকায় না নেমে কীভাবে রাজধানীকে বাসযোগ্য করা যায়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজউক এতদিন জমির অধিগ্রহণ করা মূল্য ও উন্নয়ন খরচ মিলিয়ে আবাসিক প্লটের দাম নির্ধারণ করত। অন্য ক্যাটেগরির প্লটের দাম ধরা হতো আবাসিকের চেয়ে বেশি। তবে বাস্তবে দেখা যায়, ওইসব প্রকল্পের প্লট বরাদ্দের পরপরই অনেক বেশি দামে কেনাবেচা হয়। মালিকানা বদলের সময় রাজউক নির্ধারিত দরে সেগুলোর লিজ দলিল সম্পন্ন হয়। এতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয় সরকার।
২০২১ সালে বাজারমূল্যের চেয়ে কিছুটা কম রেখে জমির দর সমন্বয়ের প্রস্তাব করেছিল রাজউক। তখন রাজউকের প্রস্তাবে সরকার সম্মতি দেয়নি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্লটের নতুন মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে রাজউককে নির্দেশ দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২১ জানুয়ারি রাজউকের বোর্ড সভায় নতুন মূল্য প্রস্তাব করে তা অনুমোদন করা হয়।
রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, এখন আর রাজউক প্লট দিয়ে কাউকে কোটিপতি বানানোর সুযোগ করে দিতে চায় না। নতুন দামের বিষয়ে মন্ত্রণালয় সম্মতি দিলে যেসব প্লট এখনও বরাদ্দ বাকি আছে, সেগুলোতে নতুন দর কার্যকর করা হবে। তিনি বলেন, প্লটের দর বাড়ানোর এখতিয়ার রাজউকের আছে। এখানে কোনো আইনি সমস্যাও নেই। এর আগেও বিভিন্ন সময় প্লটের দর পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, বাজারমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে রাজউক এটা করতে চাইছে। এতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে, রাজউকেরও লাভ হবে। তবে রাজউকের উদ্দেশ্য কি ব্যবসা করা, না পরিকল্পিত নগরী উপহার দেওয়া– সে প্রশ্নও এখানে আসে।
কোন প্লটের কত দাম
রাজউক নির্ধারিত প্লটের দাম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এলাকাভেদে বিভিন্ন দর নির্ধারণ করা হয়েছে। উত্তরা ও বারিধারায় ব্লকভিত্তিক ভিন্ন দাম ধরা হয়েছে। এটাও বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করা হয়েছে বলে দাবি রাজউকের।
গুলশানে আবাসিক প্লটের রাজউক নির্ধারিত প্রতি কাঠার বর্তমান দর ৫০ লাখ টাকা। সেটা বাড়িয়ে তিন কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। একইভাবে বনানীতে ৫০ লাখ থেকে করা হয়েছে আড়াই কোটি। বারিধারা কে ব্লকে ৫০ লাখ থেকে করা হয়েছে তিন কোটি, বারিধারা জে ব্লকে ৫০ লাখ থেকে এক কোটি; বাড্ডা-গেণ্ডারিয়া-শ্যামপুর-জুরাইন-আইজি বাগানে ১০ লাখ থেকে ৫০ লাখ, নিকুঞ্জ উত্তর ও দক্ষিণে ১০ লাখ থেকে দেড় কোটি, উত্তরা ১ নম্বর থেকে ৭ নম্বর সেক্টর পর্যন্ত ১৫ লাখ থেকে এক কোটি ২৫ লাখ, ৮ থেকে ১৪ নম্বর সেক্টর পর্যন্ত ১৫ লাখ থেকে এক কোটি, ১৫ থেকে ১৭ নম্বর সেক্টরে ৬ লাখ থেকে ৭৫ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
পূর্বাচলে তিন কাঠার প্লটের বর্তমান দাম আছে কাঠাপ্রতি দুই লাখ টাকা। সেটা করা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা। পাঁচ কাঠার প্লটের কাঠাপ্রতি বর্তমান দাম সোয়া দুই লাখ থেকে করা হয়েছে ৬০ লাখ, সাড়ে সাত কাঠার প্লট আড়াই লাখ থেকে করা হয়েছে ৭৫ লাখ এবং ১০ কাঠার প্লটের দাম তিন লাখ থেকে করা হয়েছে ৮০ লাখ টাকা।
ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পে সোয়া দুই কাঠার প্লটের বর্তমান কাঠাপ্রতি দর তিন লাখ টাকা। এটা করা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। তিন কাঠার প্লটের ক্ষেত্রে চার লাখ থেকে করা হয়েছে ৩০ লাখ এবং পাঁচ কাঠার প্লটের ক্ষেত্রে কাঠাপ্রতি পাঁচ লাখ থেকে ৩৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাণিজ্যিক প্লট
গুলশানে বাণিজ্যিক প্লটের কাঠাপ্রতি বর্তমান দর এক কোটি ৮০ লাখ থেকে করা হয়েছে ১০ কোটি, বনানীতে এক কোটি ৮০ লাখ থেকে আট কোটি, দিলকুশা-নর্থ সাউথ রোড-মতিঝিল-মহাখালীতে এক কোটি ৮০ লাখ থেকে সাত কোটি, কারওয়ান বাজার-শাহবাগ-বাংলামটর-পান্থপথ-কারাইলে এক কোটি থেকে তিন কোটি টাকা করার প্রস্তাব পাস হয়। সায়েদাবাদ-পোস্তগোলা-গেণ্ডারিয়া-নারায়ণগঞ্জ-বাড্ডায় করা হয়েছে ৬০ লাখ থেকে দেড় কোটি। নিকুঞ্জ উত্তরে পাঁচ কোটি ১০ লাখ থেকে সাড়ে পাঁচ কোটি, উত্তরার ১ থেকে ৯ নম্বর সেক্টরে ছয় কোটি থেকে আট কোটি, ১০ থেকে ১৪ নম্বর সেক্টরে সাড়ে তিন কোটি থেকে পাঁচ কোটি, পূর্বাচলে ৫০ লাখ থেকে করা হয়েছে দেড় কোটি টাকা।
শিল্প প্লট
শিল্প প্লটের ক্ষেত্রে শ্যামপুর, পোস্তগোলা, জুরাইনে কাঠাপ্রতি আট লাখ থেকে করা হয়েছে ৭৫ লাখ। টঙ্গীতে ১০ লাখ থেকে করা হয়েছে দুই কোটি টাকা। এভাবে প্রাতিষ্ঠানিক প্লটের দামও বর্তমান দরের চেয়ে দ্বিগুণ থেকে চার গুণ বাড়ানো হয়েছে।
বেড়েছে ফ্ল্যাটের দামও
হাতিরঝিল অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে প্রতি বর্গফুট আট হাজার থেকে করা হয়েছে ১০ হাজার টাকা, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য চার হাজার থেকে করা হয়েছে পাঁচ হাজার, লালমাটিয়ায় ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার, মোহাম্মদপুরে সাত হাজার থেকে ১২ হাজার, ধানমন্ডিতে ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার, গুলশান ৩১ নম্বর রোডে ১৩ হাজার ৫০০ থেকে ১৬ হাজার, ৩৫ নম্বর রোডে ১৩ হাজার ৫০০ থেকে ১৭ হাজার ৫০০, ১৮ নম্বর রোডে ১১ হাজার থেকে ১৪ হাজার, ১১৫ নম্বর রোডে ১০ হাজার থেকে ১৩ হাজার ও মোহাম্মদপুরে ৯ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকা প্রতি বর্গফুটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন দাম নির্ধারণের ব্যাপারে অ্যাপার্টমেন্ট ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, এ বিষয়ে রিহ্যাব কিছু জানে না। তবে এই দাম বাড়ার ফলে আবাসন ব্যবসায়ীদের কোনো সমস্যা হবে কিনা, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না।