প্রশান্ত মহাসাগরের গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের চারপাশের জল, এখন যেন আগুন জ্বলছে। মৎস্যজীবীদের কাছে শতাব্দী ধরে পরিচিত ‘এল নিনো’ এখন পুরোপুরি তীব্র আকার ধারণ করেছে। সাধারণ সময়ে বাতাস যেভাবে বয়ে চলে, তার গতি কমে গেলে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল বেয়ে পূর্বদিকে উষ্ণ জল ছড়িয়ে পড়েই এল নিনোর সূচনা হয়। আর এবার এই প্রভাব চলতি বছর থেকে আগামী বছর আরও বাড়বে। বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছরের সাক্ষীও হতে পারে পৃথিবীবাসী।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন বলছে, ২০২৬ যদি সবচেয়ে গরম বছরও না হয়, ২০২৭ নিশ্চয়ই হবে। আর এই জলবায়ু সংকটের ঠিক কেন্দ্রে দাঁড়িয়েছে গ্যালাপাগোস। সাধারণ সময়ে এই অঞ্চলের সমুদ্রজল থাকে শীতল। তাই এখানে মেরু অঞ্চলের প্রাণী যেমন পেঙ্গুইন ও পশমী সীল সহজেই বসবাস করতে পারে। বিশ্বের আর কোথাও এমন দেখা যায় না যে, প্রবাল প্রাচীরের পাশেই পেঙ্গুইন সাঁতার কাটছে।
এল নিনো এলে সবকিছু যেন ওলটপালট হয়ে যায়। জলের তাপমাত্রা হঠাৎ প্রায় ১৮ ডিগ্রি থেকে বেড়ে ৩০ ডিগ্রির ওপরে চলে যায়। ফলে জলের পুষ্টি নষ্ট হয়ে যায়, মাছ মারা যেতে শুরু করে। নাজকা বুবি, নীলপা পাখি আর পেঙ্গুইনের সংখ্যা হু হু করে কমে যায়। সামুদ্রিক টিকটিকিরা প্রচুর পরিমাণে অনাহারে মারা পড়ে। আবার যখন লা নিনা আসে, তাপ কমে যায় তখন সমুদ্র আবার নতুন প্রাণ পায়।
এই ওঠানামার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে গ্যালাপাগোসের প্রাণীরা। এমনকি এল নিনোর সময় টিকটিকিরা নিজেদের হাড়কেও ছোট করে ফেলে বাঁচার জন্য; পরে আবার স্বাভাবিক আকারে ফিরে আসে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনে এখন এল নিনো আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘনঘন আর ভয়াবহ হয়ে আসছে। বিজ্ঞানীরা ভয় পাচ্ছেন, এই ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে অনেক প্রজাতি এ শতাব্দীর মধ্যেই চিরতরে হারিয়ে যাবে।
ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জন উইটম্যান বছরের পর বছর এই দ্বীপ নিয়ে কাজ করছেন। তার কথায়, বিশ্বের যেকোনো জায়গার চেয়ে গ্যালাপাগোসের তাপমাত্রার ওঠানামা সবচেয়ে বেশি। এল নিনো এলে পুরো সামুদ্রিক জীবন প্রায় ভেঙে পড়ে, লা নিনায় আবার ফিরে আসে। কিন্তু কতটা চাপ নিতে পারে একটি বাস্তুতন্ত্র?
এই দ্বীপই যেখান থেকে ডারউইন বিবর্তনের তত্ত্ব দিয়েছেন, সেখানকার জীবনধারা এখন আমাদের শেখাচ্ছে ভবিষ্যতের পরিবর্তনের সাথে প্রাণী কীভাবে মানিয়ে নেবে। ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোতে অনেক মাছের শরীরে ক্ষত রোগ দেখা দিয়েছিল, যা পুরো খাদ্যশৃঙ্খলকে ভেঙে দেয়। ১৯৮২-৮৩ সালের ভয়াবহ এল নিনোর কারণে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু প্রজাতি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এবার ২০২৬-২৭ সালের এল নিনো কী বয়ে আনছে, তা দেখার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন গবেষকরা।
‘আমার ভয় এই ধাক্কা এত ঘনঘন হলে একদিন এমন অবস্থা আসবে, যেখান থেকে আর ফিরে সম্ভব হবে না। হয়তো এখানকার সমুদ্র হয়ে যাবে জীবনশূন্য। তাই বলতেই হয় গ্যালাপাগোসই হলো ভবিষ্যতের প্রাকৃতিক পরীক্ষাগার’, বলছিলেন জন উইটম্যান।
তবে সবটা নিরাশার নয়। যুগ যুগ ধরে প্রাকৃতিক ঝড় সহ্য করে এসেছে এই দ্বীপ। উইটম্যান বলেন, চিন্তার কারণ আছে বটে, কিন্তু গবেষণা করলেই আশা পাই। প্রবাল প্রাচীরের পরিবর্তনে দেখছি পুরোনো প্রজাতি হারাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তাদের জায়গায় নতুন এমন প্রজাতি আসছে, যা এল নিনোর মতো ভয়াবহ অবস্থার পরেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে।