শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১১:২২ রাত
আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ০১:৩৭ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ইডেন কলেজের ঘটনা ও আমাদের নারীবাদী সংগঠনগুলোর ব্যর্থতা

শাহাজাদা এমরান : কুমিল্লা নগরীর একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত আমার এক শুভার্থীর কনিষ্ঠ কন্যা ঢাকা ইডেন মহিলা কলেজে পড়ে। বুধবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকালে এক কাজে তার ব্যাংকে যাই। দৈনিক আমাদের কুমিল্লা ও কুমিল্লার জমিন অনলাইনে সম্প্রতি প্রকাশিত আমার ‘সময়ের কড়চা’র বেশ কয়েকটি লেখা নিয়ে তিনি আলোচনা করলেন। একজন পাঠক হিসেবে সব সময়ই তিনি আমার শ্রদ্ধার পাত্র।

কথার এক পর্যায়ে জানতে চাইলাম, ভাই আপনার মেয়েটা না কোন কলেজে পড়ে? এতক্ষণ হাসি খুশিতে আড্ডা মারা ভদ্রলোক হঠাৎ করে চুপসে গেলেন। লজ্জায় লাল হয়ে গেল তার সুন্দর মুখখানি। তার এই অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে মনে মনে আমিও একটু লজ্জা পেলাম বটে, তবে জানার আগ্রহকে নিবৃত্ত করতে পারলাম না।

ভাই মেয়েটির কি কোন সমস্যা-আমার এই কথায় মনে হলো বোধ ফিরে পেলেন তিনি। জানালেন এমরান ভাই, আমার মেয়ে ঢাকার এক নামকরা কলেজে পড়ে।

যেই কলেজের ছাত্রী ছিলেন স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু গত কয়েক দিন পত্র পত্রিকায় এই ইডেন কলেজ নিয়ে ছাত্রলীগের নেত্রীদের বরাত দিয়ে যে সব সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে তাতে খুব লজ্জা পাচ্ছি এই ভেবে যে, এই কলেজে আমার মেয়ে পড়ে। অথচ এই ইডেন কলেজের রয়েছে গৌরবজনক ইতিহাস।

এত নোংরা যে কিভাবে হয়ে গেল তা বুঝতে পারছি না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজি ও চাপ দাড়িওয়ালা এই ভদ্রলোক এক পর্যায়ে চোখের পানি সংবরণ করতে পারলেন না।

রুমের দরজাটি টেনে দিয়ে বললেন, ভাই যে দিন ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সহসভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌসী কলেজ শাখার ছাত্রলীগের সভাপতি তামান্না জেসমিন ওরফে রিভা ও সাধারণ সম্পাদক রাজিয়া সুলতানার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের সাথে দেহ ব্যবসার অভিযোগ আনলেন, বিশ্বাস করেন, সেদিন মনে হয়েছে একটি কলেজের মেয়ে ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে এ কথা শোনার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভালো ছিল।

এমন জানলে কোনোদিন মেয়েকে ইডেনে ভর্তি করাতাম না। তবে কথার শেষ পর্যায়ে আশার খবর জানালেন, তার মেয়ে কোন রাজনীতির সাথে জড়িত না। তার মেয়ে ইডেন মহিলা কলেজে পড়ে এই পরিচয় দিতে তার ঘৃণা হয়, লজ্জা লাগে, আজ এই কথা শুধু যে এই ব্যাংকার ভদ্রলোকের তা নয়, ইডেনের শত শত অভিভাবককেরই একই কথা।

ইডেন মহিলা কলেজের ছাত্রলীগ দুই গ্রুপে বিভক্ত । ৪৮ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির মধ্যে সভাপতি রিভা সেক্রেটারি রাজিয়া গ্রুপ বনাম সহ-সভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌসী ও সাংগঠনিক সম্পাদক বৈশাখী গ্রুপ এই দুই ভাগে বিভক্ত।

রোববার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সাংগঠনিক সম্পাদক সামিয়া আক্তার ওরফে বৈশাখী বলেন, গতকাল রাত (২৪ সেপ্টেম্বর) সাড়ে ১০টার দিকে সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভা ও সাধারণ সম্পাদক রাজিয়া সুলতানার উপস্থিতিতে তাঁদের অনুসারীরা হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) ছাত্রী নিবাসের সামনে সহসভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌসের ওপর অতর্কিত হামলা চালান।

পরে জান্নাতুল ফেরদৌসের গলায় থাকা স্বর্ণালঙ্কার, হাতব্যাগে থাকা ১৫ হাজার টাকা ও তাঁর ছোট বোনের হাতেথাকা আংটিও আত্মসাৎ করা হয়। তাঁদের অনুসারীদের নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগীরা এ বিষয়ে বারবার প্রশাসনকে জানালেও কোনো স্পষ্ট প্রতিকার পাওয়া যায়নি।

ক্যান্টিনের চাঁদাবাজি, ইন্টারনেট সার্ভিস থেকে চাঁদাবাজি, কলেজের মুদিদোকানে চাঁদাবাজি, অবৈধভাবে শতাধিক কক্ষ দখল করে রাখা, বিভিন্নভাবে ছাত্রীদের কুপস্তাব দেওয়াসহ নানা অভিযোগ আছে তাঁদের (সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের অনুসারী) বিরুদ্ধে।

দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের এসব জানানো হলেও তাঁদের কাছ থেকে নিরপেক্ষ কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি। আমরা অনিরাপদ বোধ করছি। (হামলা-মারধর-হেনস্তার) ঘটনা বারবার ঘটছে।

গণমাধ্যমকর্মীদের তারা আরো বলেন, ইডেন কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি রিভা ও সেক্রেটারি রাজিয়া সুন্দর মেয়েদেরকে রুমে নিয়ে বাজে ছবি তোলে, নেতাদের সাথে অনৈতিক কাজ করতে বাধ্য করে, না করলে নির্যাতন ও উলঙ্গ করে ছবি তোলে। কলেজে প্রতিজন ভর্তি নেয় ৩০ হাজার টাকা করে।

ছাত্রলীগ নারীদের ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগই ভোগ করে, তাদেরকে ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগ ছাড়া জীবনে কেউ বিয়ে করবে না। সভাপতি-সেক্রেটারির বিরুদ্ধে ২৫ জন নেত্রীর পক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনে ৮ দফা দাবি একটি ছিল, জান্নাতুল ফেরদৌসের যেসব অশ্লীল ছবি তোলা হয়েছে, সব নেতার সামনে সব  জায়গা থেকে তা ডিলিট করা (মুছে দেওয়া) ও ছিনিয়ে নেওয়া সব জিনিসপত্র তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়া।

ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ইডেন কলেজের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থগিত ঘোষণা করেছে। সর্বশেষ বুধবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সহসভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌসীকে রুম থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে নির্যাতনের অভিযোগে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মোস্তফা রেজা নুরের আদালতে সভাপতি-সম্পাদকসহ তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি।

বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে রাজধানীর লালবাগ থানাকে তদন্ত করে আগামী ২৩ অক্টোবর প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন আদালত। 

আমরা এত দিন জেনে বা দেখে আসছি যে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে ছাত্রনেতা নামধারী এক শ্রেণির বখাটে ছাত্রীদের সাথে অশালীন আচরণ করে, তাদের কু প্রস্তাব দেয়, সুযোগ বুঝে তাদের ব্ল্যাকমেইলিং করে অশ্লীল ছবি তুলে তাদের হীন কায়েমী স্বার্থ হাসিল করার অপচেষ্টা করে।

কিন্তু অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা হচ্ছে যে, ইডেন মহিলা কলেজের ঘটনার মাধ্যমে জানতে পারলাম, কলেজের ছাত্রলীগের নেত্রীরা তারা নিজেরা নারী হয়েও তাদেরই সহপাঠীদের তুলে দেয় পুরুষদের কাছে।

ভাবতে অবাক লাগে এই ভেবে যে, আমাদের যে মেয়েরা কিংবা বোনেরা উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্য ইডেনে ভর্তি হয়েছে তারা কীভাবে পড়ালেখার নামে এসব নোংরামি করছে! ছি ছি ছি! একজন মেয়ে হয়ে কীভাবে আরেকজন মেয়েকে বিবস্ত্র করে ছবি ওঠায়? হীন রাজনৈতিক স্বার্থে এক মেয়ে কিভাবে তারই সহপাঠীকে রাজনৈতিক নেতাদের হাতে তুলে দেয়। আমরা কি এতই অসভ্য, বর্বর হয়েছি।

একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিভাবে এসব দিনের পর দিন ঘটছে। আজ প্রায় ১৪ বছর ধরে একটানা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রয়েছে ছাত্রলীগের অভিভাবক সংগঠন আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ কি জানে না কি হচ্ছে ইডেনে? ইডেন মহিলা কলেজ থেকে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সেক্রেটারি কোন আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগের নেতার কাছে আমাদের মেয়েদের পাঠাচ্ছে তা খুঁজে বের করতে হবে।

নারীর অপমান বিষয়ক কোনো ঘটনা ঘটলে মাসুদা ভাট্টি বনাম ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন প্রসঙ্গ অবধারিতভাবেই চলে আসে।

কারণ, সেই সময়ে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে যৌক্তিক দাবিতেই আমাদের নারী সংগঠনগুলো যেভাবে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া , রূপসা থেকে পাথুরিয়া একাকার হয়ে গর্জে উঠেছিল, আজ তারা কোথায়?

আমি আমাদের দেশের সকল পর্যায়ের নারী সংগঠনগুলোর কাছে বিনীতভাবে জানতে চাই, ইডেন মহিলা কলেজের ছাত্রলীগের সভাপতি রিভা ও রাজিয়ার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগেরই অপর অংশের নেত্রীরা প্রকাশ্যে যে অভিযোগ এনেছে তা কি মাসুদা ভাট্টি বনাম ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের ঘটনার চেয়ে কম না বেশি? আজ কেন আপনারা চুপ করে আছেন? আপনাদের নেতৃত্বে থাকা নারী সংগঠনগুলোও কি আজ ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে গেছেন?

আজ এত দিন হয়ে গেলো দেশের একজন নারী নেত্রীকেও বলতে শুনি নি যে সকল ছাত্রলীগ নেত্রী চরিত্রহীন কাজের সাথে জড়িত, তারা ছাত্রী নামের কলঙ্ক। তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা হোক।

আমাদের দেশের বর্তমান প্রধান মন্ত্রী নারী, স্পিকার নারী, জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী নারী, রাজপথের প্রধান বিরোধী দলীয় নেত্রীও নারী। এমন কি যে শিক্ষাঙ্গন নিয়ে আজকের এই লেখা সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক হলেন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী।

কোনো পর্যায় থেকেই এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে শুনলাম না। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, আপনি যে মন্ত্রণালয় চালান, ইডেন কলেজ সেই মন্ত্রণালয়েরই একটি প্রতিষ্ঠান। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা আপনার দলেরই ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী। সুতরাং, আপনার সোচ্চার ভূমিকা রাখা খুব জরুরি ছিল বলে দেশের বিবেকবান মানুষ মনে করে। কিন্তু আপনি একেবারেই মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন।

মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়, এটা মানা যায় না।আপনি শুধু মন্ত্রীই নন, আপনি একজন চিকিৎসকও। একজন চিকিৎসক হিসেবে আপনি যেমন রোগীর ভিতরের খবরটা জানেন কোথায় তার সমস্যা রয়েছে, ঠিক তেমনি একজন মন্ত্রী হিসেবেও আপনার অজানা থাকার কথা নয় আপনার কোন সেক্টরে কি হচ্ছে?

শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়, আমি আপনাকে বলছি, আমি ব্যক্তিগতভাবে ছাত্র রাজনীতির পক্ষে। আমি বিশ্বাস করি, আজকের ছাত্রনেতারাই আগামী দিনে জাতিকে নেতৃত্ব দিবে।

কিন্তু কোন ছাত্র নেতারা? যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো একটি পবিত্র প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করতে এসে ছাত্র রাজনীতির নামে নোংরামি করে?

একজন মেয়ে হয়ে আরেকজন মেয়ের ইজ্জত লুটিয়ে নিতে ভূমিকা রাখে, তারা?

প্লিজ, তাদের কঠোর হস্তে দমন করুন । দেশ এবং জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এই কঠোরতা এখনই প্রয়োগ করুন। বহু হয়েছে, আর ছাড় নয়। সম্পাদনা: আল আমিন 

লেখক : শাহাজাদা এমরান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, দৈনিক আমাদের কুমিল্লা ও
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি, কুমিল্লা

  • সর্বশেষ