শিরোনাম
◈ মি‌ডিয়ার বিরু‌দ্ধে এমন সিদ্ধান্ত কে‌নো? বিসিবির কোন নিরাপত্তা ব্যাহত হয়েছে, জানতে চান সাংবাদিকেরা  ◈ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নির্বাচনের ৩ দিন আগে শুল্ক চুক্তি করবে অন্তর্বর্তী সরকার ◈ রাজশাহীতে মাদকাসক্ত ছেলের হাতে মায়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ◈ কুখ্যাত এপস্টেইন নথিতে বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ◈ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা কেন শঙ্কিত? ◈ জানুয়ারিতে রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড, এলো ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার ◈ কুৎসা রটিয়ে, বিভ্রান্তি ছড়িয়ে এবং ধাপ্পা দিয়ে জনগণের ভোট নেওয়া যায় না : মির্জা আব্বাস  ◈ প্রতারক চক্রের ফোনকলে সাড়া না দিতে নির্বাচন কমিশনের আহ্বান ◈ কিশোরগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে দালালচক্রের বিরুদ্ধে র‍্যাবের অভিযান, ২০ জনের কারাদণ্ড ◈ নোয়াখালীতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুর

প্রকাশিত : ০১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৬:৩৯ বিকাল
আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৮:১৮ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ফরিদপুর সুগার মিলের বিষাক্ত বর্জ্যে বিপন্ন চন্দনা নদী: দুর্গন্ধে দমবন্ধ, ভেসে উঠছে মৃত মাছ

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি: ফরিদপুর সুগার মিলের অপরিশোধিত ও বিষাক্ত তরল বর্জ্যের কারণে চন্দনা নদী ক্রমেই ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটে পড়ছে। বছরের পর বছর ধরে আখ মাড়াই মৌসুম এলেই মিল থেকে নির্গত রাসায়নিক বর্জ্য একটি খালের মাধ্যমে সরাসরি নদীতে গিয়ে মিশছে। এতে মধুখালী পৌরসভার শ্মশান ঘাট এলাকা থেকে শুরু করে নদীর ভাটির বিস্তীর্ণ অংশে পানি দূষিত হয়ে পড়েছে, নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য এবং চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন হাজারো মানুষ।

সরেজমিনে মধুখালী থানা গেটসংলগ্ন শ্মশান ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ফরিদপুর সুগার মিল থেকে নির্গত কালচে ও তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত তরল বর্জ্যপানি একটি সরু খাল বেয়ে চন্দনা নদীতে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর উজানে মাত্র ৩০০ মিটার দূরে অবস্থিত মিলটি দীর্ঘদিন ধরেই এই খাল ব্যবহার করে বর্জ্য নিষ্কাশন করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। মিল এলাকা অতিক্রম করার সময় বাতাসে এমন তীব্র রাসায়নিক দুর্গন্ধ ছড়ায় যে পথচারীদের অনেককেই নাক-মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে চলাচল করতে দেখা যায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মধুখালী পৌরসভার ভাটির চারটি গ্রামের অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ এই দূষণের সরাসরি শিকার। আখ মাড়াই মৌসুমজুড়ে বাতাসে ভেসে বেড়ানো দুর্গন্ধে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে। নদীর পানি ব্যবহারের সুযোগ তো নেইই, এমনকি নদীর ধারে দাঁড়ানোও কষ্টকর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

খালটি মধুখালী আইডিয়াল একাডেমি ও ফরিদপুর চিনি কল উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মিল গেট বাজার অতিক্রম করেছে। ফলে প্রায় দেড় হাজারের বেশি শিক্ষার্থী প্রতিদিন এই দুর্গন্ধের মধ্যেই ক্লাস করতে বাধ্য হচ্ছে। ফরিদপুর চিনি কল উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, “ক্লাস চলার সময় এত বাজে গন্ধ হয় যে মাথা ব্যথা করে। মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করা যায় না। বাড়িতে ফিরলেও সেই গন্ধ যেন পিছু ছাড়ে না।”

আইডিয়াল একাডেমির গভর্নিং বডির সদস্য মো. মাসুদুল ইসলাম বলেন, “অপরিশোধিত বর্জ্যপানির দুর্গন্ধে আমাদের প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। অভিভাবকেরা সন্তানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন। ফলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমছে। বিষয়টি একাধিকবার মিল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোনো কার্যকর সাড়া পাইনি।”

শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন চরম বিপাকে। চর মহিষাপুর গ্রামের বাসিন্দা ও মিল গেট বাজারের ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান মুন্সি (৫৬) বলেন, “আখ মাড়াই মৌসুমজুড়ে খাল দিয়ে বিষাক্ত পানি বয়ে যায়। দুর্গন্ধে ক্রেতারা দোকানে দাঁড়াতে চান না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই চলে যান। এতে আমাদের ব্যবসায় বড় ক্ষতি হচ্ছে।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, যেখানে মিলের বর্জ্য নদীতে মিশছে, সেখানে মাঝেমধ্যেই পানিতে মৃত মাছ ভেসে উঠতে দেখা যায়। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, নদীর পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গিয়ে জলজ প্রাণীর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ছে। একসময় যে চন্দনা নদী ছিল মাছ ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ, আজ তা দূষণের ভারে ধুঁকছে।

ফরিদপুর সুগার মিল সূত্রে জানা যায়, সরকারি উদ্যোগে ১৯৭৪ সালে মিলটি স্থাপন করা হয় এবং ১৯৭৬ সালে পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হয়। কয়েক দশক ধরে মিলটি আখভিত্তিক শিল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষার ঘাটতির কারণে এটি এখন আশপাশের জনপদ ও নদীর জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।

এ বিষয়ে ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিব হোসেন বলেন, তিনি সম্প্রতি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং মিলের বর্জ্যপানির কারণে চন্দনা নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে—এমন প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছেন। তিনি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে মিল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছেন।

ফরিদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাসরিন জাহান জানান, চন্দনা নদী এই এলাকার মৎস্যসম্পদ, কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ২০২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জেলা সমন্বয় সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন। পরিদর্শনের সময় মিলের বিষাক্ত পানির কারণে নদীতে মাছ মারা যেতে দেখেছেন বলেও তিনি জানান।

পরিবেশ অধিদপ্তর ফরিদপুরের উপ-পরিচালক সাঈদ আনোয়ার বলেন, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একজন পরিদর্শককে দ্রুত ঘটনাস্থলে পাঠানো হবে। পরিদর্শন শেষে মিল কর্তৃপক্ষকে পরিবেশ আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হবে।

মধুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রওশনা জাহান জানান, মিল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে তাদের ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) রয়েছে এবং বর্জ্যপানি নিজস্ব পুকুরে ফেলা হয়। তবে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত সমাধানের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

এ বিষয়ে ফরিদপুর সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক ফারহাদ বলেন, “চুন ও সালফার ডাই-অক্সাইড পানির সঙ্গে মিশে তীব্র দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে। আমরা মূলত মিলের নিজস্ব পুকুরের পানি ব্যবহার করি। তবে তরল হওয়ায় কিছু পানি মাটির নিচ দিয়ে চুঁইয়ে নদীতে যেতে পারে। ভবিষ্যতে যাতে কোনোভাবেই পানি নদীতে না যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কেবল আশ্বাস নয়—দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ, আধুনিক বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা এবং নিয়মিত নজরদারি ছাড়া চন্দনা নদী ও মানুষের জীবন রক্ষা সম্ভব নয়।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়