শিরোনাম
◈ ইনোভেশন কনসাল্টিংয়ের জরিপ: ৪৭% মানুষের মতে তারেক রহমানই ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী ◈ জাতিসংঘ শান্তি কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত বাংলাদেশ ◈ সংবিধান সংস্কার পরিষদ কী, সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে বিতর্ক কেন? ◈ হুমকি, হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতায় নির্বাচনী প্রচারণা থেকে বিরতি নিচ্ছেন মেঘনা আলম ◈ রাজধানী থেকে অপহৃত ৩ বছরের শিশুকে ২৪ ঘণ্টায় উদ্ধার, মূল হোতা গ্রেপ্তার ◈ ঘুম থেকে উঠে মানুষ আল্লাহর নাম নেয়, একজন আছে জেগেই আমার নাম নেন : মির্জা আব্বাস ◈ নির্বাচনে নিষিদ্ধ, হাসিনা পলাতক, আওয়ামী লীগ কি টিকবে?: আল জাজিরার বিশ্লেষণ ◈ আল্লাহ সুযোগ দিলে দেশ ও মানুষের সেবায় নিয়োজিত হতে চাই—তারেক রহমান ◈ ম‌্যান‌চেস্টার সি‌টির কোচ পেপ গা‌র্দিওলা ফিলিস্তিন ইস্যুতে বিশ্ব নেতাদের ‘কাপুরুষ’ বললেন  ◈ আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ–কয়লার দাম নিয়ে বিরোধ: ব্রিটিশ আইনি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ বাংলাদেশের

প্রকাশিত : ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:৪৯ বিকাল
আপডেট : ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

নির্বাচনে নিষিদ্ধ, হাসিনা পলাতক, আওয়ামী লীগ কি টিকবে?: আল জাজিরার বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের রাজবাড়ী জেলার পদ্মা নদীর তীর। ভোরবেলা মাছ ধরা শেষে সেখানে পা ধুয়ে নিচ্ছিলেন মাঝি রিপন মৃধা। আশপাশের বাজারের দোকানের দেয়াল ও শাটারের দিকে তাকিয়ে তার চোখে পড়ে এক অদ্ভুত শূন্যতা। কিছুদিন আগেও যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের পোস্টার ও ব্যানারে ভরে ছিল এলাকা, এখন সেখানে তার কোনো চিহ্নই নেই। ১৫ বছর ক্ষমতা ধরে রাখা দলটি এখন প্রায় অনুপস্থিত।

চব্বিশ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসে এক নাটকীয় মোড়। হাসিনা দেশ ছেড়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ভারত পালিয়ে যান। এরপর আওয়ামী লীগকে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। হাসিনারই প্রতিষ্ঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তার অনুপস্থিতিতে গণহত্যার নির্দেশ দেয়ার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।

এই প্রেক্ষাপটে ১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি শেখ হাসিনার পতনের পর প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে এই নির্বাচনে থাকছে না আওয়ামী লীগ। অথচ এই দলটি স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে দেশ শাসন করেছে।

আজীবন আওয়ামী লীগ সমর্থক রিপন মৃধা বলছেন, দল নিষিদ্ধ হওয়ায় নির্বাচনের প্রতি তার আগ্রহ কমে গেছে। তবু ভোটকেন্দ্রে যেতে হতে পারে। তার পরিবারের শঙ্কা ভোট না দিলে তাকে আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে। নৌকা না থাকলে কাকে ভোট দেব, সেটাই এখন প্রশ্ন।

শেখ হাসিনার শাসনামলে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী কঠোর দমন-পীড়নের শিকার হয়। জামায়াত নিষিদ্ধ হয়, শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি ও কারাদণ্ড দেয়া হয়। গ্রেপ্তার হন বিএনপির হাজার হাজার নেতা-কর্মী। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কারাবন্দি অবস্থায় গুরুতর অসুস্থ হন। শেষ পর্যন্ত সেই অসুস্থতা নিয়েই গত ডিসেম্বরে মৃত্যু হয় তার। তারেক রহমান ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসনে থাকার পর সম্প্রতি দেশে ফিরে এসেছেন। হয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান।

নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতা দেখা যাচ্ছে। বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীরা হামলা ও হত্যার শিকার হচ্ছেন। তবে এবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সমর্থকরাও আর নিরাপদ নন। হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন, নির্যাতন ও দমন-পীড়নের দায়ে দলটির বিরুদ্ধে জনরোষ তীব্র।

গোপালগঞ্জের রিকশাচালক সোলায়মান মিয়া স্পষ্ট ভাষায় বলেন, নৌকা ছাড়া নির্বাচন নির্বাচনই না। তার পরিবার এবার ভোট দেবে না বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই মনোভাব গোপালগঞ্জের বহু বাসিন্দার।

ঢাকার গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এখন পরিত্যক্ত। গণঅভ্যুত্থানের সময় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পর ভবনটি আশ্রয়হীন মানুষের থাকার জায়গা ও অস্থায়ী শৌচাগারে পরিণত হয়েছে। আশপাশের ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাসের পর মাস কোনো আওয়ামী লীগ কর্মী চোখে পড়েনি। এখন কেউ আওয়ামী লীগ সমর্থক বলেও পরিচয় দেয় না।

তবে দলের ভেতরে এখনও কেউ কেউ আশাবাদী। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আরমান মনে করেন, আওয়ামী লীগ কৌশলগতভাবে নীরব রয়েছে। এই দল রাজনীতি থেকে মুছে যাওয়ার মতো নয়। আওয়ামী লীগ ফিরবে, আর সেটা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জবান পত্রিকার সম্পাদক রেজাউল করিম রনি অবশ্য ভিন্নমত পোষণ করেন। তার মতে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন টিকে যাওয়াই আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের সমর্থকরা স্থানীয় বাস্তবতায় নিজেদের মানিয়ে নেবে। ধীরে ধীরে তারা অন্য প্রভাবশালী শক্তির সঙ্গে যুক্ত হবে। এতে দলটির পুরোনো সমর্থনভিত্তিক পুনর্গঠন কঠিন হয়ে পড়বে।

রনির মতে, হাসিনাকে ছাড়া ভবিষ্যৎ কল্পনা করা যায় কি না তা নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেতরেই বিভাজন স্পষ্ট। তার দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনে অনেক সমর্থকও হতাশ। এই অবস্থায় আগের জায়গায় ফেরা প্রায় অসম্ভব।

অন্য বিশ্লেষকেরা মনে করেন, জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান আওয়ামী লীগের জন্য এক ধরনের দৃষ্টান্ত হতে পারে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়ার কারণে দলটি বহুবার নিষিদ্ধ ও দমন-পীড়নের শিকার হলেও টিকে গেছে। বর্তমানে জরিপ অনুযায়ী, জামায়াত তাদের ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফলের দ্বারপ্রান্তে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মতে, আওয়ামী লীগের আবেদন শুধু দলীয় কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে গভীরভাবে প্রোথিত। পুরোপুরি মুছে যাওয়া কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের জরিপে এখনও প্রায় ১১ শতাংশ সমর্থন রয়েছে আওয়ামী লীগের।

তবে বাস্তবতা হলো- নির্বাচনী মাঠে দলটি অনুপস্থিত। ভারত থেকে আওয়ামী লীগ নেতাদের ভার্চুয়াল তৎপরতা ঢাকায় ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশ সরকার প্রকাশ্য অসন্তোষ জানায়।

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন পূর্ণ গণতান্ত্রিক নয়। তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, দমন-পীড়নের কারণে দলটি অনেকের চোখে বৈধতা হারিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বংশানুক্রমিক দলগুলো সহজে মরে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পরিস্থিতি বদলালে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন অসম্ভব নয়, তবে আপাতত দলটি কার্যত অচল।

রাজবাড়ীর মাঝি রিপন মৃধার কাছে এই অনিশ্চয়তা গভীর বেদনার। তিনি বলেন, বাবার মুখে শুনেছি বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগের সংকটের কথা। কিন্তু এবছর যা হচ্ছে, তা যেন পুরো রাজনৈতিক নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মতো। অনুবাদ: মানবজমিন।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়