শিরোনাম

প্রকাশিত : ০৪ এপ্রিল, ২০২৪, ০৩:২২ রাত
আপডেট : ০৪ এপ্রিল, ২০২৪, ০৩:২২ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

একজন অবসর প্রেমিকের কড়চা

আহসান হাবিব

আহসান হাবিব: [১] জীবনে ব্যস্ততা কি বুঝে উঠতে পারলাম না। যতদূর মনে পড়ে আমি একজন দীর্ঘমেয়াদি অবসরে থাকা মানুষ। আমার সারাদিন অবসর। খুব ভোরে উঠে আমি রেয়াজ করি কয়েক ঘণ্টা। এসময় কেউ ফোন করলে এমনভাবে কথা বলি যেন আমি তার ফোনের জন্যই অনন্তকাল ধরে অপেক্ষা করছি। হয়তো কেউ জিজ্ঞেস করলো কি করছি, বলি কিছু নয়, রেয়াজ। তাহলে পরে কথা বলি?-না না, এখনই বল। -তুমি না রেয়াজ করছো?-তাতে কি? আবার করবো।

কথা চললো কয়েক মিনিট থেকে হয়তো ঘণ্টা। কথা শেষ হলে আবার রেয়াজ। কেন আমার এমন মনে হয়? কেন আমি রেয়াজকে এমন গুরুত্ব দিই না বলে মনে হয়? কারণ রেয়াজ করে কণ্ঠ সেধে একজন গায়ক হয়ে উঠতে হবে- এমন তাড়া আমার নেই। আমি গান করি মনের আনন্দে। তার মানে এই নয় গানের জন্য যা যা লাগবে তার প্রতি কোন অবহেলা করি, একদম নয়। গানে আমি সিরিয়াস কিন্তু শিল্পী হওয়ার জন্য আমার কোন দৌড়ঝাঁপ নেই। ফলত আমি সব সময় অবসরে থাকার মুডে থাকি।

[২] আবার আমি লিখি এবং পড়ি। লিখি বিবিধ বিষয়, তবে সাহিত্যে আমি কথাসাহিত্যের লোক। আমি উপন্যাস লিখি। যখন লিখি তখন কি আমি ব্যস্ত থাকি? একদম না। লিখতে আমার কোন চাপ নাই। মনের আনন্দে লিখি। তার মানে এই নয়, সাহিত্য করি হেলাফেলা করে, মোটেই না। সাহিত্যে আমি খুবই সিরিয়াস, কিন্তু ব্যস্ত নই। আমাকে কোন উপন্যাস নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে- এমন দিব্যি নেই। আমি যখন লিখি তখনো লেখায় থাকি, যখন লিখি না, তখনো লেখায় থাকি। লিখতে লিখতে আমি অন্য কাজ করি, রান্না করি, ঘর মুছি, ফোনে তো কথা বলি। আবার প্রেমিকাদের সংগে আড্ডাও দিই। হয়তো দেখা গেলো আমি লিখছি, তখন ঘরে প্রবেশ করলেন প্রিয় কোন কবি, ব্যস,মলেখা লাটে উঠলো, জমে উঠলো নরক গুলজার আড্ডা। আর আড্ডা মানেই ভদকা, কবিতা আবৃত্তি, গান গাওয়া, বাংলা ছেড়ে ইংরেজিতে ননস্টপ কথা বলা। কবি চলে গেলেন, আবার লিখতে বসে গেলাম। কেন আমার এমন মনে হয়? কেন আমি লেখাকে গুরুত্ব দিই না বলে মনে হয়? আসলে সাহিত্যে-আগেই বললাম- আমি সিরিয়াস, কিন্তু আমি ব্যস্ত নই। কারণ আমি সাহিত্যজীবী নই, আমি সাহিত্য করি মনের আনন্দে, আমার চিন্তাগুলির নিষ্ক্রমণ পথ হিসেবে। তার মানে সাহিত্যে যা তা লেখা আমার আদৌ পছন্দ নয়। আমি সাহিত্য করি একটি সুনির্দিষ্ট দর্শমনে অন্যের সামনে তুলে ধরার জন্য। এটা করার জন্য আমার কোন দৌড়ঝাঁপ নেই, কোন প্রকাশক ধরা নেই, রয়ালটির জন্য বার্গেইনিং নেই। এই রয়ালটির জন্য কোন জোরাজোরি নেই মানে এই নয়, সাহিত্য করি ফেলনাভাবে। লেখার মধ্য দিয়ে চিন্তাগুলি রেখে দিই মহাকালের খাতায়, ব্যস।

[৩] তাহলে আমার পেশা কী? পেশা একটা আছে বটে, আমি চিকিৎসক হিসেবে নিজের একটা চেম্বারে বসি, সময় দিই তিন ঘণ্টা। এখানেও আমি একফোঁটা ব্যস্ত নই। হয়তো দেখা গেলো কোনোদিন আমি কোনো রোগী না দেখেই টেনিস খেলতে চলে গেলাম। দেড়ঘণ্টা টেনিস খেলে বাসায় চলে আসলাম। একটা চমৎকার স্নান দিয়ে আবার বসে পড়লাম রবীন্দ্রসংগীত গাইতে। হয়তো পুরনো গান গাইলাম কিংবা নতুন গান স্বরলিপি দেখে তুলতে শুরু করলাম। চললো রাত দুটো পর্যন্ত।
কেন আমি প্রাইভেট প্র্যাকটিসে ব্যস্ত নই? তাহলে কি আমার পেশাকে গুরুত্ব দিই না? একদম ভুল, আমার পেশা আমার খুব প্রিয়। একজন বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষ হিসেবে আমি চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাছে প্রভূত ঋণী। আমি যখন শরীরের বিজ্ঞানের দিকে তাকাই, আনন্দে শিহরিত হই। ডিএনএ তে থরে থরে সাজানো জিনগুলি কিভাবে কাজ করে, তা যখন জানি, তখন বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ি। কিন্তু ব্যস্ত হই না কেন? কারণ আমাকে এই পেশা দিয়ে একজন ধনী ব্যক্তি হতে হবে, বাড়ি গাড়ি ব্যাংক ব্যালান্স করতে হবে এই বাসনা নাই। আমি দিনে আনি দিন খাই। ফলে আমি ক্রমেই এই সমাজে মিসফিট হয়ে পড়ি, হয়ে পড়ি একলা। আমি আমার এই অবসরময় জীবনে বিন্দাস আছি। কোন দুঃখ নেই। দুঃখই যেন সুখের পূর্বাভাষ, আসে না, কিন্তু আসবে বলে ইশারা রাখে।

[৪] অবসর আমার ভাল লাগে। আমি সবসময় অবসরের গান গাই। ব্যস্ততা আমার ভাল লাগে না, তার মানে ব্যস্ততা মন্দ তা নয়, বরং ভাল। যদি পৃথিবীতে ব্যস্ত মানুষ না থাকতো, সভ্যতা গড়ে উঠতো? গড়ে উঠতো না। তাই আমাকে প্রায়ই অযোগ্য মানুষ মনে হয়। আবার সান্ত্বনা পাই এই ভেবে যে পৃথিবীতে হরেক রকম মানুষ। কে ভাল কে ঠিক- এটা বলা বা ঠিক করার আমি কে? আমি শুধু বলছি আমি অবসরপ্রেমিক একজন শূণ্যের ওপর দিয়ে হাঁটা মানুষ যার কোন ভবিষ্যৎ নেই, আছে ঝুঝঝুরে বর্তমান। তথাপি আমি কি সুখি? একটাই উত্তর- হ্যা, হ্যা, হ্যা...। লেখক: ঔপন্যাসিক

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়