মহাসড়কে অতিরিক্ত পণ্যবাহী যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের উদ্যোগে নির্মাণ করা হচ্ছে ১৭টি ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। এর মধ্যে ১০টির পূর্তকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু কেন্দ্রগুলোর মূল কাজের জন্য প্রয়োজনীয় ওজন মাপার যন্ত্রই এখনো স্থাপন করতে পারেনি সওজ। দুই দফা দরপত্র আহ্বান করেও এ যন্ত্র কিনতে পারেনি সংস্থাটি। এখন তৃতীয়বার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ওজন মাপার যন্ত্র ‘ওয়ে-ইন-মোশন (ডব্লিউআইএম) স্কেল’ ব্যবস্থা না থাকায় অবকাঠামো প্রায় প্রস্তুত অবস্থায় থাকলেও কেন্দ্রগুলো চালু করা যাচ্ছে না। ফলে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের সুফল পাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। সূত্র: বণিক বার্তা প্রতিবেদন
প্রকল্পটি ২০১৯ সালে প্রথমে ১ হাজার ৬৩০ কোটি ২৮ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে অনুমোদন হয়। তবে গত বছরের মে মাসে প্রথম সংশোধনীর মধ্য দিয়ে ব্যয় কিছুটা কমিয়ে ১ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা নির্ধারণ হয়। সেই সঙ্গে মেয়াদ দুই দফা বাড়িয়ে করা হয় চলতি ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। এর মধ্যেও কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাস্তবায়নাধীন এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের আওতায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে ১৭টি স্থায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রতিটিতেই দোতলা নিয়ন্ত্রণ ভবন, নিয়ন্ত্রণকক্ষ, বুথ, গণশৌচাগার, ক্যাফেটেরিয়া, গুদামঘর, সেপটিক ট্যাংক, ওভারহেড ট্যাংক, সাবমারসিবল পাম্প, সীমানাপ্রাচীরের পাশাপাশি অ্যাপ্রোচ সড়কের রিজিড ও ফ্লেক্সিবল পেভমেন্ট, রোড ব্যারিয়ার, মিডিয়ান, আরসিসি ড্রেন ও বক্স কালভার্টের মতো অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১০টি ওজন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের অবকাঠামো নির্মাণকাজের ৯০ শতাংশের বেশি শেষ হয়েছে। এগুলো হলো চট্টগ্রামের দোহাজারী, সীতাকুণ্ডের দুটি কেন্দ্র (ঢাকামুখী ও চট্টগ্রামমুখী), ময়মনসিংহের ত্রিশাল, টাঙ্গাইলের বড় ইশাপুর, সাতক্ষীরার নাওয়াবাদকাঠি, চুয়াডাঙ্গার দুটি কেন্দ্র (চুয়াডাঙ্গা ও দর্শনা সীমানা), নবাবগঞ্জের কয়লাবাড়ি ও পঞ্চগড়ের ভজনপুর। এসব কেন্দ্রে ভবনের মূল কাঠামো, ইটের গাঁথুনি ও প্লাস্টারের কাজ, রাস্তার পেভমেন্ট এবং মাটি ভরাট, ড্রেনেজ ও সীমানাপ্রাচীরের কাজ মোটামুটি সম্পন্ন হয়ে গেছে; শুধু কিছু জায়গায় ভবনের চূড়ান্ত ফিনিশিংয়ের কাজ চলছে বর্তমানে।
অবকাঠামোগত কাজ শেষ হলেও এগুলোর কোনোটিতেই বসেনি যানবাহন চলন্ত অবস্থায় ওজন মাপার যন্ত্র ডব্লিউআইএম স্কেল। ফলে অবকাঠামো গড়ে উঠলেও ওজন নিয়ন্ত্রণের মূল উদ্দেশ্য এখনো পূরণ হচ্ছে না। বিষয়টি স্থবির হয়ে আছে দরপত্র প্রক্রিয়াতেই।
এ বিষয়ে জানতে ‘গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পণ্য পরিবহনের উৎসমুখে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন’ প্রকল্পের পরিচালক কেএম নুর-ই-আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ওয়ে-ইন-মোশন যন্ত্র সংগ্রহের জন্য তৃতীয় দফায় টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে, তবে তা এখনো শেষ
করা যায়নি। বিষয়টি পুরোপুরি আমাদের হাতে নেই, অনুমোদনের জন্য এটি সিজিবি পর্যায় পর্যন্ত যায়। ওয়ার্ক অর্ডার দেয়ার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যন্ত্র স্থাপনের কাজ শুরু করবে। টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই আমরা যন্ত্রগুলো বসাতে পারব বলে আশা করছি।’
প্রকল্পের মেয়াদ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ডিপিপি অনুযায়ী চলতি বছরের জুনেই কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে তা আরো দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ব্যয় বৃদ্ধি রেখে কেবল মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।’
সার্বিক ভৌত অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘বর্তমান ডিপিপি অনুযায়ী আমাদের এখনকার ভৌত অগ্রগতি ৬০ শতাংশ।’ বাকি সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার প্রত্যাশার কথাও জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি জানান, প্রকল্পটি আরেক দফা সংশোধন হতে যাচ্ছে। কেএম নুর-ই-আলম বলেন, ‘আমাদের পিএসসি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব পাঠাব, যেখানে ব্যয় আরো কমবে।’
সওজের প্রকৌশলীরা বলছেন, এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে পণ্য পরিবহনের উৎসমুখে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন করে অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি ওজনের পণ্য পরিবহন ঠেকানো, যাতে সড়কের নির্ধারিত আয়ুষ্কাল ফুরানোর আগেই তা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। পাশাপাশি টেকসই, নিরাপদ ও ব্যয়সাশ্রয়ী সড়ক অবকাঠামো এবং সমন্বিত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য। যদিও বাস্তবায়ন দীর্ঘায়িত হওয়ায় দেশের সড়ক-মহাসড়কে অতিরিক্ত ওজন নিয়ে চলা যানবাহনে যেমন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি প্রকল্পটির উদ্দেশ্যও বিঘ্নিত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।